পাঠ প্রতিক্রিয়া : বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল



বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে মূল উপজীব্য করে ফরাসি ভাষায় লিখিত প্রথম গ্রন্থটির নাম বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল। বইটি লেখা হয়েছে অবিকশিত জাতীয়তাবাদ ও অঙ্কুরে বিনষ্ট বিপ্লবের পটভূমিতে। লেখক বের্নার-অঁরি লেভি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠনের ডাক দিয়েছিলেন লেখক অঁদ্রে মালরো। তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়া প্রথম দিককার একজন অঁরি লেভি। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ডামাডোলে বসে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি দেখেছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। বইটির ফরাসি নাম : Les Indes Rouges (আক্ষরিক অনুবাদ : ‘লাল উপমহাদেশ’)। বাংলা ভাষায় অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন শিশির ভট্টাচার্য্য।

Combat (যুদ্ধ) নামক ফরাসি পত্রিকার সংবাদদাতার কাজ করতে করতে কলকাতা থেকে লেখক ঢুকে পড়েছিলেন বাংলাদেশে। যশোর-খুলনা এলাকায় মুক্তিবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে কিছুদিন ছিলেন। যুদ্ধে বাঙালিদের বিজয়ের পর কিছুদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। বইটিকে তিনি তিনটি পর্বে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম পর্ব : সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ। দ্বিতীয় পর্ব : সাম্যবাদ ও জাতীয়তাবাদ। তৃতীয় পর্ব : মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্যে।

Divide and Rule, বিভাজনের মাধমে শাসন। এই তত্ত্ব কেবল ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের বেলায় প্রয়োগ করা হয়েছিল বিষয়টা তেমন নয়। ১৭৫৭ সালে পলাশির প্রান্তরে সিরাজউদদৌলার পরাজয়ের অব্যবহিত পর ইংরেজরা প্রশাসনিক ক্ষমতা পাকাপাকিভাবে হাতে নিয়ে প্রথমেই ভারতের শাসনকাঠামোয় স্থানীয় শাসক পরিবর্তনে মনোযোগী হয়। বিভাজনের রাজনীতির সূত্র প্রয়োগ করে মুসলিম শাসকদের অপসারণ করে তদস্থলে হিন্দু শাসকদের বসানো হয়। বঞ্চিত মুসলমানের এই পুঞ্জিভূত ক্ষোভকে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠনের মাধ্যমে কাজে লাগায় ইংরেজ বেনিয়া। অবশ্য তত দিনে সাম্প্রদায়িকতার চারা গাছটি মহিরুহ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হিসেবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে প্রধান করে তোলা হয়েছে এবং হিন্দু-মুসলমান দুটি ভিন্ন জাতি এই কৃত্রিম সাম্প্রদায়িক জাগরণ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করেছে পাকিস্তান কায়েম হলে তার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তি আসবে।

অঁরি লেভির মতে, ‘পাকিস্তানের বিখণ্ডীকরণ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানকে তৃতীয় বিশ্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি যথার্থ উদাহরণ বলা যেতে পারে। আন্দোলনের উৎস ও আদর্শের দিক থেকে এটা যথার্থ উদাহরণ।’ তাঁর মতে, ‘এই বই লেখার উদ্দেশ্য যতটা না বাংলাদেশের যুদ্ধকে একটি সংকট হিসেবে দেখানো, তার চেয়ে অনেক বেশি বৃহত্তর কোনো সমস্যার উপসর্গ হিসেবে দেখানো। একটি ঘটনার বর্ণনা দেওয়া বা ধারা বিবরণী দেওয়াটা যতটা না এর উদ্দেশ্য ছিল, তার চেয়ে অনেক বড় উদ্দেশ্য বিশেষ কিছু চিহ্নের, লক্ষণের ব্যাখ্যা দেওয়া।’

লেভির মতে, চীন ও সোভিয়েত রাশিয়া-এই দুই সমাজতন্ত্রী দেশ, ভারত ও পাকিস্তান কেউই চায়নি, উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল লাল পতাকায় ছেয়ে যাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলাবাহুল্য। তারা লাল ঝাণ্ডাকে ঠেকাতেই বাংলাদেশের জন্ম ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশে যা হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। যা হয়েছে, বামপন্থীদের একটা অংশ তা চাননি।’


– অরি লেভি

লেভি বাংলাদেশের নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামকে (২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর) দুই পর্যায়ে ভাগ করেছেন। মার্চ-সেপ্টেম্বর প্রথম পর্যায় এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়। প্রথম পর্যায়ে সবগুলো পরাশক্তি : যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ভারত পাকিস্তানের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে ছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে কমিউনিজম ঠেকানোর প্রয়োজনে ভারত ও সবগুলো পরাশক্তি পাকিস্তান ভাঙার পক্ষে রায় দেয়, তখন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ছিল শুধু সময়ের ব্যাপার।

বইটি পাঠ করতে করতে একপর্যায়ে পাঠকের মনে একটা প্রশ্ন অবধারিতভাবে আসবে, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও আধিপত্যবাদী ভারত নাহয় কমিউনিজম ঠেকাতে চাইবে কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন-চীন কেন পূর্ব বাংলায় কমিউনিজমের বিপক্ষে অবস্থান নেবে?

এই প্রশ্নের ব্যাখ্যাও লেভি দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুসারে, চীনপন্থী মাওবাদীদের হাতে বাংলার নিয়ন্ত্রণ চলে যাক, তা রাশিয়ার পছন্দ ছিল না, অন্যদিকে রুশপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হোক, তা চীনের কাম্য ছিল না। এ ছাড়া ভারতের ওপরে ছিল এক কোটি শরণার্থীর প্রবল চাপ।

ওপরে বর্ণিত বক্তব্যের সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে। আমরা সবাই অবগত আছি যে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে আনিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিপক্ষে একাধিকবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে আমেরিকা-চীন পাকিস্তানের অখ-তা রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পিছপা হয়নি। কে বলতে পারে ওই সময় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে হয়তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আরো প্রলম্বিত হতে পারতো। তা ছাড়া পাকিস্তানের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছে এবং চীন পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে গেছে। সুতরাং এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ কোনো একটা পর্যায়ে এসে অভিন্ন হয়ে পড়েছিল।

বইটির প্রকাশ করেছে অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকা। প্রচ্ছদ করেছেন সৈয়দ ইকবাল।

সূত্রঃ লেখাটি সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল পত্রিকায় বর্ষ ৪, সংখ্যা ৮, বৃহস্পতিবার, ২৫ মে ২০১৭ প্রকাশিত হয়।

প্রচ্ছদ
প্রথম পাতা
মুক্তকথা
আন্তর্জাতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *