সুলতানা কামালের মেরুদণ্ড দেখে ভীত অমেরুদণ্ডী সরকার ও পরজীবী হেফাজত

তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। ইয়াজউদ্দিনের স্বেচ্ছাচারিতা মেনে নিতে পারেননি তাঁর স্বল্পকালীন মেয়াদ সীমায়। তিনি দেখেছেন মেরুদণ্ডহীন প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে খালেদাকে ফোন দিচ্ছেন, খালেদার ধমককে আদেশ হিসেবে গ্রহণ করছেন। এসব হজম করা মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা কামালের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পদত্যাগ করতে সেকারণে দ্বিধা করেননি।

ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ নিতে চাইলে সুলতানা কামাল খুব সহজে সেটা নিতে পারতেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সুফিয়া কামালকে শেখ মুজিব শ্রদ্ধা করতেন।

শেখ পরিবারের সাথে এমন আত্মিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সুলতানা কামাল কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বলার সৎ সাহস দেখিয়েছেন সবসময়। আর তাই কেবল সাম্প্রদায়িকতা ইস্যুতেই তিনি ভোকাল হয়েছেন এমন নয়, প্রাণ – প্রকৃতি ধ্বংসকারী রামপাল প্রোজেক্ট বাতিলের পক্ষে এবং সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে তিনি সদা সোচ্চার।

বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট ও দৃঢ়। র‍্যাব কর্তৃক এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং, নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেন। পাহাড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর চলমান ধারাবাহিক নিপীড়নের প্রতিবাদে তিনি উচ্চকণ্ঠ। রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিদের উপর আক্রমণ, নির্যাতন, তাদের উপসানলয় পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ছুটে গেছেন ঘটনাস্থলে। বরিশালের লিমনের উপর র‍্যাবের আক্রমণের পর তিনি ছুটে গেছেন, সরেজমিনে জেনে এসেছেন আসল ঘটনা। লিমনের পক্ষে তিনি মামলা লড়েছেন, র‍্যাবের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। দেশের যেখানে যে প্রান্তে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর উপর হামলা হয়েছে সেখানে তিনি ছুটে গেছেন, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কেবল টকশোতে ভারি ভারি কথা বলেন না, প্রায় সত্তুর ছুঁই ছুঁই বয়স নিয়ে এখনো চষে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। তাঁর জীবন কর্মময়।

তাঁর এই কর্মচঞ্চল জীবনের প্রায় প্রতিটি স্টেপ সরকারের স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। আপোষ করেন না বিধায় তিনি সরকারের মাথা ব্যথার কারণ। তাছাড়া তিনি এমন একজন মানুষ যাকে না পারা যায় দেশদ্রোহী, রাজাকার বানানো; যাকে দুর্নীতির দায়েও আটক করা সম্ভব নয়; যার বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলাও দেওয়া যায় না, যাকে প্রলোভন, ভয়-ভীতি, ধমক দিয়েও বশে আনা যায় না।

সমাজে তাঁর অবস্থান এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে তাঁর পতন ঘটানো সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। এটা তাঁরা খুব ভালই অবগত। তাই তুরুপের একটা তাসই অবশিষ্ট থাকে। ওটি ধর্মের। সুলতানা কামালের বিপক্ষে ওই তাসটিই খেলা হয়েছে। এসব বুঝতে রকেট সায়েন্স জানা লাগে না। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে বিষয়টি সাদা চোখে ধরা পড়ে।

তিনি ইচ্ছে করলে শিরদাঁড়াহীন, দলদাস লেজুড় বুদ্ধিজীবী হয়ে ‘ ইয়া সরকার, ইয়া সরকার ‘ করে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন। যেমনটি শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন, আনিসুজ্জামান, রামেন্দু মজুমদার, নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, মামুনুর রশিদ, নির্মলেন্দু গুণ, আরেফিন সিদ্দিকীরা জীবন পার করছেন।

কিন্তু তিনি ওই ব্যক্তিত্বহীন জীবন বেছে নেননি। তিনি খুব ভাল করে জানেন রাজনীতির নোংরা খেলাটা কারা খেলছে, কেনো খেলছে। তিনি বোঝেন দেশটাকে কারা মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ধাপেধাপে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি দিব্য দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করছেন কারা এই রাষ্ট্রের সেক্যুলার হওয়ার সব সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। তিনি অনুভব করতে পারেন কারা এদেশের নতুন প্রজন্মের বুদ্ধিজীবী, লেখক, ব্লগারদের হত্যা করেছে, কারা মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে, কারা খুনীকে গ্রেফতার করার অঙ্গিকার ব্যক্ত না করে, নিহত ভিকটিমের লেখার দোষ খতিয়ে দেখতে চেয়েছে।

তিনিই তো প্রথম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, একজন ধর্মপ্রাণ বিশ্বাসী আস্তিকের যেমন মত প্রকাশের অধিকার আছে তেমনি একজন অধার্মিক অবিশ্বাসী নাস্তিকেরও তাঁর বক্তব্য প্রকাশের অধিকার আছে। একজন অবিশ্বাসীর স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার, লেখার, বলার, চিন্তা করার অধিকার সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে – একথা তিনি একাধিকবার বলেছেন।

এরকম স্পষ্টভাষী, অকপট, অবিচল মানুষ এ দেশের সম্পদ। আজকে যদি প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে দু’জন করে মোট ছয়জন মানুষ সুলতানা কামালের বক্তব্যকে সমর্থন করে দ্বিধাহীনভাবে মিডিয়ার সামনে হেফাজতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগতে থাকা ওই ভীতুর ডিমগুলো গর্তে গিয়ে লুকোবে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য বরাবরের মতোই ওইসব স্বনামখ্যাত, বিশিষ্টদের একজনকেও পাওয়া যাবে না সুলতানা কামালের পাশে। কেউ বলার সাহস রাখবে না; মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার প্রশ্রয় এবং আশকারা পেয়ে পেয়ে ওরা আজকের অবস্থানে এসেছে; ওদেরকে এখনই থামান; নতুবা আপনার বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে নামবো।

এই ঘোষণা দেওয়ার মতো মেরুদণ্ড নেই বলেই, আগামী শুক্রবারে জুম্মার নামাজ শেষে সুলতানা কামালের বিরুদ্ধে মিছিল বের হবে। মিছিল পরবর্তী সমাবেশ থেকে আবারো উচ্চারিত হবে, ‘ সুলতানার হাড্ডি-মাংশ আলাদা করা হবে, তসলিমার মতো তাকেও দেশ ছাড়া করা হবে….। ‘ হয়তো তসলিমা নাসরিনের মতো সুলতানা কামালেরও মাথার দাম ঘোষিত হবে। হাটহাজারি থেকে নয়া ফরমান আসতে পারে, ওকে কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে।

এরকম হত্যার হুমকি প্রকাশ্যে দেওয়ার পরও হেফাজতের বিরুদ্ধে কোনো একশান নেওয়া হবে না। কারণ, কলুষিত রাজনীতির দুষ্ট খেলায় হেফাজত এখন জরুরী।

তবে এই খেলায় আমাদের ভূমিকা নির্ধারণের সময় এসে গেছে। আমরা কি নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে গ্যালারিতে বসে বাদাম চিবুবো না কী ওই আসন্ন পাতানো খেলার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াব? আমাদের অবস্থান নির্ণয় করে দেবে আমরা একযোগে পরাজিত হতে যাচ্ছি না কী বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরছি।

১ thought on “সুলতানা কামালের মেরুদণ্ড দেখে ভীত অমেরুদণ্ডী সরকার ও পরজীবী হেফাজত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *