সুলতানা কামালের সাহস ও হেফাজতের ২৪ ঘন্টার আলটিমেটাম


টকশোতে সুলতানা কামাল

সুলতানা কামালকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। হুমকিটি এসেছে জুম্মার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে। যে স্থানটিকে হেফাজত তাদের অস্থায়ী কার্যালয় বানিয়ে ফেলেছে বলা যায়।

সুলতানা আপার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। তিনি না কী সুপ্রিমকোর্ট থেকে মসজিদ সরিয়ে ফেলার কথা বলেছেন!!!

৬ বছর আমরা একসাথে কাজ করেছি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। লঞ্চে, বাসে, গাড়িতে, রিসেপশনে, খাওয়ার টেবিলে, সী বিচে কোথায় হয়নি কথা। এসবই মধুর স্মৃতি। আপার স্মার্টনেস, মেধা, বিচক্ষণতা, অভিজ্ঞতা অনুকরণীয়, অনুসরণীয়। এসবকিছু ছাপিয়ে তাঁর যে বিষয়টি আমাকে অভিভূত করে সেটি তাঁর সাহস। সে যতবড় কেউকেটাই হোক না কেনো মুখের উপর ঠাস করে উচিৎ কথা বলতে তিনি কাউকেই ছাড়েন না। এমন বোল্ড এন্ড বিউটিফুল নারীর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ খুববেশি হয়নি আমার।

সাহসটা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন বলা চলে। তাঁর বিখ্যাত জননী কবি সুফিয়া কামালকে চেনে না এমন হতভাগা বাঙালি পৃথিবীতে আছেন বলে বিশ্বাস হয় না। সুফিয়া কামালকে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি একটি বিশেষ কারণে। কবিত্ব শক্তির চেয়ে যে কারণটি আমার কাছে অনন্য হয়ে ওঠে সবসময়। এটি তাঁর প্রবাদপ্রতিম সাহস! মহাপ্রতাপশালী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানকে যে নারী ‘ জানোয়ার ‘ বলতে পারেন তাঁরই মুখের উপর সেই নারীর সাহস – স্পর্ধা, নির্ভীকতা নিয়ে দ্বিতীয় উক্তি চলে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী যে মানুষটি সামাজিক – সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে তরান্বিত করেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ছিলেন সাহসে অবিচল, মেধা ও মননে প্রাতঃস্মরণীয়। তাই তো তিনি আমাদের জননী সাহসিকা।

এমন নারীর সন্তান আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা আপা। হেফাজত কোন ছার? উচিৎ জবাব থেকে ওই অন্ধকারের অপশক্তি পার পাবে কেনো? তিনি তো মেরুদণ্ড বন্ধক রাখেননি! আদতে শক্তিটা আসে ওই শক্ত মেরুদণ্ড থেকে, মুখ থেকে নয়। মুখ দিয়ে তো সবাই কথা বলে, মেরুদণ্ড ঠিক রেখে আর ক’জন কথা বলতে সক্ষম এই অভাগা দেশে?

কি বলেছেন সেদিন তিনি?


টকশোতে তিনি যা বলেছিলেন

টকশোর আলোচনার প্রসঙ্গে সুলতানা কামাল বলেন, ‘‘সে দিনের টকশোতে হেফাজতের একজন ছিলেন। সেখানে প্রশ্ন উঠেছিল, সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ভাস্কর্য থাকলে আপত্তিটা কিসের? তিনি (হেফাজতের প্রতিনিধি) বলেছিলেন, ‘এটা মূর্তি, ধর্মীয় স্থাপনা। কোর্ট এলাকায় কেন ধর্মীয় স্থাপনা থাকবে?’ এটি ছিল তার কথা। তখন তার জবাবে বলেছি, ‘আমিও আপনার কথায় একমত। আমিও মনে করি, কোর্ট এলাকায় কোনও ধর্মীয় স্থাপনা থাকা উচিত না। মূর্তি যেমন ধর্মীয় স্থাপনা, তেমনি মসজিদও। আপনার কথা অনুযায়ী সেখানে মসজিদও তো থাকা উচিত না। এটা আমি বলে ফেলেছি ঠিকই। কিন্তু তার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই। কথাটা এভাবেই হয়েছে।’’

হেফাজতের বক্তার বক্তব্যের সূত্রধরে তিনি বলেছেন, ভাস্কর্য যদি ধর্মীয় স্থাপনা হওয়ার কারণে অপসারণ যোগ্য হয় তাহলে মসজিদওতো ধর্মীয় স্থাপনা, এটি থাকে কোন যুক্তিতে?

তথাপি যদি কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয় তবে দাঁড় করানো উচিৎ টকশো করতে আসা হেফাজতের ওই নির্বোধটাকে। ভাস্কর্যকে ধর্মীয় স্থাপনা বলে সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের দাবী তারই। সুলতানা কামাল যুক্তির খাতিরে কথাটি বলেছেন।

এখন কথা হচ্ছে মসজিদ ধর্মীয় স্থাপনা কী না, যদি ধর্মীয় স্থাপনা হয় তবে ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের কথা কে বললো সুলতানা কামাল না কী ওই বদমাশ হেফাজটিটা?

যুক্তি, পালটা যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা গ্রহণ করতে যদি অনিচ্ছুক কিংবা অপারগ হবে তাহলে এই আকাট মূর্খগুলোকে মিডিয়ায় ডেকে এনে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের অসম্মান, অপদস্ত করা হবে কেনো?

এখনো বোধগম্য নয়, এই ঘটনাকে হেফাজত কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু করে তুলবে। এ কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, এই ডিস্টার্বিং এলিমেন্ট একটার পর একটা ঝামেলা পাঁকিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণে ক্রমশ অগ্রসর হবে। এবং এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে করার জন্য সরকারের প্রশ্রয়, মদত আগের মতোই অটুট থাকবে। আর আমরা তখনো ভুলে থাকতে চাইবো ক্ষমতায় আসীন কারা, তাদের তথাকথিত আলোকিত সময়ে এদেশকে কেনো গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে হবে।

তথাপি ন্যায়সঙ্গত দাবী জানাতে হবে। হেফাজতি আস্ফালন, সাম্প্রদায়িক জিগির, মৌলবাদী জিঘাংসা বন্ধ করতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের কাছেই দাবী জানাতে হবে, তাকে বাধ্য করতে হবে। সেইসাথে রাজনীতির হিসেবটাও বুঝে নিতে হবে।

বর্তমানে কোন দল ক্ষমতায় আছে এটি নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। বিকল্প নেই বলে যে রাজনৈতিক দলকে মন্দের ভাল সার্টিফিকেট দিয়ে ক্ষমতায় দেখতে চান সেই দলটির ভেতরে যদি এক তিল পরিমাণ ভাল’র দেখা না পান তবে কীসের তাড়নায় আপনার সমর্থন বহাল রাখেন? আবারো বলছি ঠিক যে যে কারণে বিএনপি-জামায়াতকে অপছন্দ করেন সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আওয়ামী লীগের ভেতরে মূর্ত হতে দেখে কী করে এখনো আপনার ‘ ভরসা ‘ রাখতে পারেন? অন্তত দৃঢ়তার সাথে, সৎ সাহস নিয়ে প্রতিবাদটুকু জানান। সরকারের কিংবা আপনার প্রিয় নেত্রীর বিরুদ্ধে গেলেও ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের স্বার্থে আপনার পবিত্র ঘৃণাটুকু সোচ্চার কণ্ঠে প্রকাশ করুন।

ওই হায়েনারা কাউকেই ছাড়বে না। সুলতানা কামাল যা-ই বলুক তাঁর কথা বলার অধিকারটুকু সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন না করলে নাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য রাষ্ট্রের পাহারাদার সরকারকে বাধ্য করা যাতে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে। বাক স্বাধীনতা আমাদের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। মতের বিরুদ্ধে ভিন্নমত চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকে। যারা সেই পরিবেশ তৈরি করতে অনিচ্ছুক, অপারগ তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই – এই কথাটি জোর দিয়ে বলতে হবে। এবং কথা বলার সঠিক সময় এখনোই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *