আমি বাঁচবো তো?

পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছি আমরা। আমরা বৌচি,লুক,হা-ডু-ডু খেলায় উদগ্রীব ছিলাম। বিকালে স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসে ব্য্গ,স্কুল ড্রেস পরিবর্তন করে সবাই আসতাম জয়দের উঠানে। কিন্তু, খেলাধুলায় সবাই আমার চাইতে জোহরাকে দলে ভিড়ানোর জন্য আগ্রহ করত। জোহরা ছিল খুবই বুদ্ধিমতি , তীক্ষ্ণ মেধাবী এবং ডানপিটে। স্কুলের শিক্ষক, পাড়ার প্রতিবেশী হতে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের প্রিয়মুখ জোহরা।

আমি বাঁচব তো?
মকছুদ ওসামা

.
পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছি আমরা। আমরা বৌচি,লুক,হা-ডু-ডু খেলায় উদগ্রীব ছিলাম। বিকালে স্কুল ছুটির পর বাড়িতে এসে ব্য্গ,স্কুল ড্রেস পরিবর্তন করে সবাই আসতাম জয়দের উঠানে। কিন্তু, খেলাধুলায় সবাই আমার চাইতে জোহরাকে দলে ভিড়ানোর জন্য আগ্রহ করত। জোহরা ছিল খুবই বুদ্ধিমতি , তীক্ষ্ণ মেধাবী এবং ডানপিটে। স্কুলের শিক্ষক, পাড়ার প্রতিবেশী হতে শুরু করে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনের প্রিয়মুখ জোহরা।
তারই প্রতিফলন ঘটে সমাপনী পরীক্ষার রেজাল্টে। রেজাল্টের পূর্বেও স্কুলের শিক্ষকরা বলাবলি করত, জোহরা এ-প্লাস পাবে। আমাদের রেজাল্টের চাইতে জোহরার রেজাল্ট শুনে আমরা বেশি আহ্লাদিত হয়েছিলাম।
আমরা মাধ্যমিক পর্যায়ে পা দিয়েছি। তারপরও আমাদের নিত্যদিনের রুটিনের খেলাধুলায় কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই।দাদা,দাদি,চাচীমা’রা চোখভরা আগ্রহ নিয়ে আমাদের খেলা দেখত। আমরাও তাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে সেরাটা দিতে ব্রত থাকতাম।
সপ্তম শ্রেণীতে পদার্পণ করেছি আমরা। জোহরা স্কুল ফার্স্ট হয়েছে আর আমি দ্বিতীয়। লেখাপড়ায় আমরা দু’জন দু’জনের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলাম। স্কুলে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমত। এরজন্য আবার ইষৎ রাগারাগিও হত। আমাদের রাগারাগি কখনো সর্বোচ্চ মাত্রা অতিক্রম করতে পারত না। দু’জনের দেখা মিললেই একটি মুচকি হাসি আমাদের সব রাগারাগি,ক্রোধ শ্রাবণের ধারার মত ধুয়ে মুছে নিয়ে যেত। কখনো মৌনতা কখনো মিটমাট দেখে স্কুলের বন্ধুদের হাসির খোরাক হত।
.
এবার আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে জেএসসি পরীক্ষার। স্কুলপ্রথম জোহরা আর আমাকে স্যাররা ভীষণ ভালোবাসত। জোহরার সাথে আমার খুব গভীর বন্ধুত্ব। আমরা জেএসএসি পরীক্ষায় অংশ নিলাম। দু’জনই এ-প্লাস পেলাম। জোহরাকে উপহারস্বরুপ একটি উপন্যাস দিলাম,জোহরাও আমাকে।

বাড়িতে শোনা যাচ্ছে, আমাকে আর গ্রামে পড়াবে না। শহরের সরকারি স্কুলে ভর্তি করাবে। কিন্তু, সবুজ-শ্যামল গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়ালেখার জন্য আসার তেমন আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে না। বাবা একদিন গিয়ে ভর্তির কার্যক্রম সম্পন্ন করে আসল। আমার আগ্রহ না-থাকা সত্ত্বেও আমাকে শহরে যেতে হবে। কিন্তু, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম জোহরাকে এসব সম্পর্কে জানাবো না।
চলে যাওয়ার পূর্বের রাতে আমি জোহরার বাড়িতে গেলাম। জোহরা টেবিলে বসে পড়ছে। আমাকে দেখামাত্রই জোহরা কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বসতে দিল।
-ওসামা তুমি নাকি শহরে চলে যাচ্ছ? ভাঙা ভাঙা গলায় জোহরা জিজ্ঞেস করল। আমি উত্তর দিতে গিয়ে আমতা আমতা করে আর উত্তর দিতে পারলাম না।
.
সব ধরনের প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে একপর্যায়ে শহরে চলে আসলাম। কিন্তু,আমার মন পড়ে থাকত সবুজ-শ্যামল গ্রামের কায়ায়,স্কুলের প্রতিদ্বন্দ্বীতায়,বিকেলের খেলাধুলায়। কিছুতেই আমার মনকে শহরে টিকিয়ে রাখতে পারতাম না।
গত দু’দিন পূর্বে মা ফোন করে জানাল,জোহরা মারা গেছে। আমি আর দু’মিনিটের জন্যও শহরে থাকতে পারলাম না। জোহরার ঘরে গিয়ে দেখি,জোহরার মা গগনবিদারী আর্তনাদ করছে। জোহরার বাবা একপাশে খুঁটি ধরে বসে আছে। জোহরার পড়ার কক্ষে প্রবেশ করে দেখলাম, আমার উপহার দেওয়া উপন্যাসটি জোহরা খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখেছে।
গত ঈদে আমি যখন বাড়িতে গেলাম তখন জোহরার সাথে আমার শেষ দেখা হয়। জোহরা কলস নিয়ে পাশের নলকূপ থেকে পানি আনতে যাচ্ছে। জোহরা আমাকে দেখামাত্রই প্রফুল্লচিত্তে জিজ্ঞেস করত,কেমন আছিস?
এরকম কোনো কিছুই করল না। আমি অবাক হলাম। জোহরার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। আমি নির্বিকার ভঙিমায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম,-কি হল?
জোহরা ওড়না দিয়ে দু’চোখ মুছে কিছু বলতে চেষ্টা করতে লাগল। ভাঙা ভাঙা কান্নাজড়িত গলায় বলতে আরম্ভ করল,
-আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। ডাক্তার বলছে আমার আর পৃথিবীতে বেশিদিন থাকা হবে না। আমার স্বপ্নকে কখনো অতিক্রম করতে পারবো না। আমার মা-বাবা গর্বের সাথে কখনো বলতে পারবে না, আমার মেয়ে ডাক্তার হয়েছে।
জোহরার কন্ঠে চক্রবৃদ্ধিহারে জড়তা কাজ করতে থাকায় আমি সান্তনা দিতে চাইলাম।
জোহরা আমাকে শেষবারের মত জিজ্ঞেস করেছিল,আমি বাঁচবো তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *