নিজের অজান্তেই শহীদস্মৃতি হয়ে গেল পহেলা প্রভাতে

রাতে স্লিপিং পিলটা খাওয়ার সময়ই ঠিক করে রেখেছিলাম বৈশাখের প্রভাতটা দেখব একটু হাটব বৈশাখস্নাস্ধ ভোর দেখব। টের পাওয়া নিয়ে অাশংকায় ছিলাম।কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কি অপার মহিমায় ভোর সাড়ে চারটেই ঘুম ভাংলো।
ময়লা প্যান্ট, ছেড়া টিশার্ট পরে রুম থেকে বের হলাম। হলগেটে গার্ডকে ডাকতেই অাঁকে ধতমত খেয়ে গেলেন। কত যন্ত্রণা ই না দিই এই মানুষগুলোকে।রাতবেরাত হঠাৎ ডাকাডাকি। ঠিকমত ঘুমুতেই পারেন না।বললেন এত রাতে কোথায় যাবেন!
যেন চোখেমুখে বিষ্ময়ভাব।প্রাতভ্রমনে যাব। উনি বল্লেন এত রাতে।

এখন রাত সাড়ে চারটা বাজে।বেরিয়ে পড়লাম সোনারূপোভরা দেশের ভোরের প্রকৃতির অন্তস্থলে ঠুকে বৈশাখের ভোর নিষ্পলক অবলোকন করব বলে।

হাঁটছি অামি হাঁটছি।হেটে চলেছি শহীদ মিনার পাশ দিয়ে। কয়েকশো পুলিশ অাছে এসময় ক্যাম্পাসে। নিরাপত্তার স্বার্থে অাজকের ক্যাম্পাসের দায়িত্ব তাদের উপর ন্যস্ত। এই বাংলাদেশ চেয়েছিল মুক্তিফৌজরা! বিশ্ববিদ্যালয় কারো কাছে বিক্রি করে দেয়া।

হাঁটতে হাঁটতে কখন যে জুবেরীর মোড়ে পৌঁছেছি টেরই পায়নি। মোবাইলের স্ক্রিন টাচ করতেই দেখি পাঁচটা বাজব বাজব ভাব। ওপাশদিয়ে মেয়েদের হলের পিছনটা। হাঁটি হাঁটি পায়ে পায়ে রোকেয়া হলের পাশে উন্মুক্ত বসে জিরিয়ে নিলাম একটু।বেশ তেষ্টা পেয়েছে। এসময় রোকেয়া কিংবা তাপসী রাবেয়া থেকে কোন সুন্দরীশ্রেষ্ঠা এসে যদি একগ্লাস জল দিয়ে বলত নাও অনেক প্রাতভ্রমন হয়েছে এখন রুমে যাও। কিংবা রহমতুন্নেসা বা অন্য কোন হল থেকে। সে এসেছে শাড়ি পরে। শাড়ী পরলে প্রতিটি বাঙালী মেয়েকে যেন বেসম্ভব সুন্দর লাগে। লোভ সামলানো দায়।

ওখানকার গার্ড বোধহয় মানুষের পদচারণা টের পেয়ে উঠে বসল। তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।কথা বলিনি;ইচ্ছে হচ্ছিল না।

অাপন মনে স্বচ্ছ প্রভাতস্নিগ্ধ সরলগতির প্রভাতের প্রকৃতিটা অামাকে অাপন করে নিল।৫.২০ মিনিট।টুকিটাকি পেরিয়ে এসেছি।কত কিছুই না হবে অাজ ক্যাম্পাসে।কত মঙ্গলশোভাযাত্রা।গান বাজনা অারো কতকি।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে পাশের রাস্তাদিয়ে হুঁস করে চলে যাওয়া পুলিশ জিপ টপ করে দাড়িয়ে পড়ল।অামাকে দেখেই।খালি পা,ময়লা টিশার্ট,উদাসীন মনোজ্ঞতা এসব দেখেই ক্যাম্পাসের কোন পাগল ভেবে ঠুস করে জিপটি অাপন গন্তব্যপথে ছুটে পালাল।

পাঁচটা চল্লিশ। শহীদ মিনারে দাড়িয়ে।হুট করে “একাত্তরের ডায়েরি ” বইটার কথা মনে পড়তে বুকটা কেন জানি একটা ধাক্কা খেল।এই এপ্রিলে কত হত্যা,লুটপাট, ধর্ষন ই না করেছিল রাজাকার, অালবদর।অমানবিক নির্যাতন যেন ছিল শান্তি কমিটির নেতাদের স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট।এপ্রিল যত এগুচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধও ততটাই গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে রুপ নিচ্ছে।কি ভয়াভহময় যন্ত্রনাকাতর ক্ষোভ ঝরানো দিনগুলিই গিয়েছে তখন।অাচ্ছা একাত্তরে কি পহেলা বৈশাখ ছিল! পালন করার কথা ভুলে গেছিল না ত অামাদের বিচ্ছুর দল।

শহীদ মিনার বেদির সামনে দাঁড়িয়ে।এক মিনিট নয়, দু মিনিট নয় প্রায় দশ মিনিটের মত।নিরব নিথর পাথর হয়ে দাড়িয়ে অাছি।হে বীর যোদ্ধা, হে বিচ্ছুর দল তুমি তোমরা মরনি। হৃদয়ে অাছো।তোমরা স্বর্গে বোধহয় ভালই অাছে।নিরব সময় পার করে নেমে এলাম।ভাবতেই চোঁখে জল এসে গেল এই এত্ত এত মঙ্গলশোভাযাত্রা,গান,বাজনা,নাটক হবে যারা এটি সৃষ্টি করে অমর হয়ে অাছেন স্মৃতিপটে,কেউ কেউ বেঁচে অাছেন এখনও তাদের জন্য দশমিনিট অজান্তেই নিরবতা পালন করেছি।নিজের উপর গর্ভবোধ হল।প্রভু দয়াময়ের কৃপায় তারা হয়ত সবাই অাজ সর্গে বসে পহেলা বৈশাখ পালন করছে। অার অামাদের দেখছে,মজা নিচ্ছে।একে অপরকে বলছে দেখ এই বাংলাদেশ! বলছে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় অাজ কি হচ্ছে।এসব বকছে অার হেসে কুটি কুটি হচ্ছে।

সকাল অাঁটটায় তোমার অাসার কথা।পরিচয় বেশিদিন না হলেও একটা শক্তপোক্ত বন্ধনে জড়িয়ে গেছি।তুমি অাসবে শাড়ি পরে।তোমাকে অাজ হয়ত সুন্দরের চেয়েও সুন্দরীশ্রেষ্ঠা লাগবে দেখতে।অপেক্ষায় অাছি তোমার ফোনের।

অাজ কেন জানি প্রানপ্রিয় বন্ধুটির কথাও জোরেশোরে মনে পড়ছে। প্রথম পহেলা বৈশাখ ওর সাথেই কাটিয়েছিলাম।কত যে মজা হয়েছিল।ও শাড়ি পরেছিল।ছোটখাট মেয়েটিকে শাড়ি পরাতে অারো কিউট লাগবে।অাজ নতুনত্ব এসেছে তুই কাউকে পেয়েছিস অামি বেশ হারিয়েছি জীবনপাতা মোড় নিয়েছে।তোর জাইগায় অাজ তোরমত একটি ছোঁট্ট মেয়ে অাসবে শাড়ি পরে।ওর এলেই বেরুবো।তোর মতই কিউট লাগবে।কতদিন তোর সাথে কথা হয়না হয়ত অার পসিবল না।তবে ভাল থাকিস।অাজ সুন্দর কিউট এইটুকু মেয়েকে দেখে ভেবে বসিস না ও অামার গার্লফ্রেন্ড।তবে হ্যাঁ ওর মনটা খুব ভাল রে।ক্রিটিকাল না।ভাবছি একটি মাটির গয়না কিনে দিব।সে অামার স্বঘোষিত গার্লফ্রেন্ড।ও অাসবে। বসে অাছি অধীর অাগ্রহে।এসো হে প্রভু দেখা দাও দয়াময়।দুঘন্টা এখনও দুঘন্টা।

শুভ নববর্ষ। অনেক অনন্দঘন ও সৃতির পাতায় ধরে রাখার মত কাটুক সকলের অনন্ত দিনগুলো।কালবৈশাখীর শুভেচ্ছা।সকল শহীদ সর্গবাসী হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *