ধর্ম থেকে মানবধর্ম

প্রথমে মহাপুরুষ মানবধর্মের অমর প্রচারক লালন সাঁইজীর দুটি ছত্র দিয়ে শুরু করছি–“গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়, তাতে লধর্মের কি ক্ষতি হয়। লালন বলে জাত কারে কয় এ ভ্রম তো গেল না।”
কথাটি আসলেই সত্যি।
হুমায়ুন অাজাদ স্যার যথার্থই বলেছেন-
” মন্দির ভাঙ্গে আস্তিক, মসজিদ ভাঙ্গে আস্তিক, যারা এই ভাঙ্গা ভাঙ্গিতে নেই তারা নাস্তিক” ।

কথাটি এতটাই সত্যি যার তা অবলীলায় সবাই স্বীকার করবে।

কবিগুরু রবিঠাকুর বলেছেন- “ধর্মের বিকারেই গ্রিস মরিয়াছে,ধর্মের বিকারেই রোম লুপ্ত হইয়াছে এবং অামাদের দূর্গতির কারন ধর্মের মধ্যে ছাড়া কোথাও নাই” একথাটিও অকপটে সবাই স্বীকার করবে।তাদের ধর্মের প্রতি যদি এতই মায়া-মহব্বত থাকত তাহলে এই মন্দির, মসজিদ ভাঙা-ভাঙি খেলায় মাতত না। আবার তারাই নিজেদের শান্তির দূত বলে প্রচার করে বেড়ায়। এক ধর্ম অন্য ধর্মকে ধর্মের মানুষকে প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করতে শেখায়। যেখানে ঘৃণা এত প্রখর সেখানে ভালোবাসা কিভাবে থাকে। ধর্ম কি পুস্তক সর্বস্ব, পুস্তকে কি আছে সেটাই কি বড় , নাকি মানুষ যা পালন করে সেটা ধর্ম। ধৃ ধাতু থেকে ধর্মের উৎপত্তি। ধৃ অর্থ ধারন করা, অর্থাৎ মানুষ যা ধারন করে তাই মানুষের ধর্ম। তাই পুস্তকে কি আছে সেটা বড় নয়, বরং আমি কি করছি সেটাই বড়।পাশের বাড়ির না খেতে পারা ছেলেটার পেটে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়াই ধর্ম।মন্দির,মসজিদ, পীর অাউলিয়ার দরবারে শয়ে শয়ে ফুল,চাদর,টাকাকড়ি নাদিয়ে পথের ধারে যারা বাস করে তার একটা গেঞ্জি কিনে দেওয়ায় ধর্ম।রেললাইনে পাশে পথশিশুদের একবেলা খাবার জুটানো;স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করায় ধর্ম।অাসল ধর্ম মানুষ বা মনুষত্ব।অাগে মানুষ তারপর ধর্ম।দেখবেন সৎ ব্যক্তিগুলো খুবই একা এবং সকলের অাক্রমনের লক্ষবস্তু।অাপনি যদি অাপনার অাপন ভাষায় কারো সাথে কথা বলেন তবে তার নিকটে যেতে পারবেন কিন্তু যদি তার ভাষাটি রপ্ত করে সঠিক প্রয়োগ করতে পারেন তবে তার হৃদয়ে প্রবেশ অনিবার্য।

মাঝে মাঝে কিছু কিছু লোককে নিজেদের মানবতাবাদী বলে পরিচয় দিতে দেখা যায়, অথবা ধর্মের কথা বললে বলে মানবতাবাদ বা মানবধর্ম। এটা প্রচলিত ধর্মগুলোকে প্রতিস্থাপন করছে বুঝা যায়। মজার ব্যাপার হল, ধর্মবিমূখ, নাস্তিক, ধর্মবিদ্বেষী সবারই সাধারণ ধর্ম হয়ে গেছে এই মানবধর্ম। নামের বহর ছাড়া এর স্বরূপটা যে কী তা বুঝার কোন উপায় নেই, বুলি আওড়ানো ছাড়া তারা নিজেরাও জানে না।
মহাপুরুষ গুরু লালন সাঁইজীর গান দিয়ে এই লেখা শেষ করছি,

” এবার মানুষ খোঁজে পাই না তারে, মানুষ লোকাইলো কোন শহরে, ন ছেড়ে ন দে এলো…., কোথায় গেলো যে জানো বলো মোরে, মানুষ লোকাইলো কোন শহরে” ॥ লালন যে মানুষের সন্ধান করছেন সারা জীবন, সেই মানুষের সন্ধান করা আমাদের সমাজের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে ॥ লালন যে বলেছিলেন-

মানুষ ভজলে তুই সোনার মানুষ হবি॥ আজ সমাজে মানুষ মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মানবোধ ভালোবাসা না থাকার কারণে সমাজে এতো অনাচারে আর নোংরামিতে ভরপুর হয়ে গেছে।
তাই আমাদের কে লালনের মানবতাবাদের দীক্ষা গ্রহণ করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *