শুক্র থেকে শনি: ইতিহাস ও শঙ্কা


ধরাযাক আজ মঙ্গলবার। আপনি শুক্রবার সকাল ১০টায় আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে অভিসারে যাবেন বলে ঠিক করেছেন। যথারীতি শুক্রবার সকাল ১০টায় আপনারা দেখা করলেন, সারাদিন দুজন দুজনের সান্নিধ্য উপভোগ করলেন। সুখের অনুভূতি বয়ে গেলো আপনাদের শিরাউপশিরায়।

এবার ধরাযাক, ৫০০০ বছর আগে একদিন।
আপনারা দুজন দেখা করতে চাইলেন পাশের মালভূমিতে। তিনদিন পর দেখা করবেন, সকাল দশটায়।

থামুন!
ওই সময়ে দেখা হবে না। কারণ ‘তিনদিন পর’ ব্যাপারটা বোঝানোর মতো কৌশল তখন ছিলো না। সময় হিসেব করা মানুষ আবিষ্কার করেছে মাত্র ৩৫০০ বছর হলো । তাই সকাল ১০টা বোঝানোর মতো কৌশলও ছিলো অসম্ভব। (আরেকটি পোস্টে সময়ের ইতিহাস নিয়ে কথা হবে)

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্ভবত সময়ের হিসেব রাখার পদ্ধতী। অর্থাৎ দিন মাস বছর ইত্যাদি বৃহৎ একক এবং সাথে সাথে ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ড ইত্যাদি ছোট একক গুলো যদি আবিষ্কৃত না হতো তাহলে অনেক কিছুই সম্ভব হতো না। জন্মদিনের পার্টি হতো না, বাস ট্রেন প্লেন চলতো না বা চললেও অহরহ দুর্ঘটনা ঘটতো। শুধু সূর্য উঠত আর অস্ত যেতো। উন্নত মস্তিষ্কের যেই মানুষটি বা মানুষেরা সময়ের হিসেব রাখার কৌশলটি আবিষ্কার করেছেন তাঁদের প্রতি সভ্যতার পক্ষ থেকে অসীম কৃতজ্ঞতা

চন্দ্র সূর্য আর আকাশের তারা দেখে মানুষ কিছুটা সময়ভাগ করা শিখেছিলো। আবার শীত গ্রীষ্ম বর্ষার মতো প্রকৃতির রূপগুলোর পরিবর্তনক্রম থেকেও সময়ভাগের কিছু কৌশল রপ্ত করেছিলো। আজকে আমাদের হাতে যেই ঘড়িটি আছে, এতে পৌঁছুতে মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার বছর সময় লেগেছে। দিন সপ্তাহ মাস বছর দশক ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করার পর অনেক সহজ হয়েছে জীবন।

প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে চলেছে শুরু থেকেই। সময় গণনা আবিষ্কারের আগেও পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে সূর্যের ২৪ ঘণ্টা লাগতো; ৩৬৫ দিনে ঘুরে আসতো কক্ষপথ ঘিরে; দশমাস পরেই শিশুর জন্ম হতো! সময়ের এককগুলো শুধু প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে গণনার রিদম ঠিক করে দিয়েছে চমৎকার ভাবে। জ্যোতির্বিদ্যার অবদান এক্ষেত্রে পুরোটাই বলা যায়। দিনরাত আকাশের দিকে চোখ রেখে জ্যোতির্বিদগণ ভেদ করেছেন সময়ের রহস্য।

যাইহোক, আজ শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে সপ্তাহের দিনগুলোর নামকরণের উৎস নিয়ে আলোচনা করবো। উপমহাদেশে শনি, রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র – এই সাতটি নামে সপ্তাহের সাতদিনকে ডাকা হয়। নাম গুলো ঠিক করেছেন উপমহাদেশের সনাতন মতাবলম্বী আর্য জ্যোতির্বিদগণ। তাই অবধারিতভাবেই তার নামগুলো ধার করেছেন সনাতন দেবদেবীদের নাম থেকে।

শনিবার
হিন্দু পুরাণে বর্ণিত দেবতা ‘শনি’র নামানুসারে শনিবার নামকরণ করা হয়েছে। শনি দুর্ভাগ্যের দেবতা। রগচটা শনিদেবতার অবয়ব কালো, হাতে ধারালো অস্ত্র এবং তার বাহন মহিষ বা কাক বা শকুণ। দুর্ভাগ্য বোঝাতে বাংলা বাগধারা ‘শনির দশা’ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হিন্দুগণ শনিবারে শনি দেবতার পূজা করে থাকেন তাকে তুষ্ট রাখার অভিপ্রায়ে।

রবিবার
সূর্যদেবের আরেক নাম ‘রবি’ থেকে নেয়া হয়েছে রবিবারের নাম। রংধনুর সাতরং এর সাতটি ঘোড়া টেনে নিয়ে যায় দেবতা রবির রথ।

সোমবার
সোমবার নামটি এসেছে দেবতা ‘সোম’ এর নাম থেকে। হিন্দুপুরাণ মতে ‘সোম’ চন্দ্রের দেবতা। শাদা ঘোড়ায় টানা রথে চড়ে সমস্ত আকাশে ঘুরে বেড়ায় ‘সোম’। দেবতাদের অমরত্ব লাভের পানীয় ‘অমৃত’র নামও সোম। চাঁদ সেই অমৃতের ভাঁড়ার। দেবতারা মাঝে মাঝে সেই অমৃত পান করে করেন। ফলতঃ চাঁদ ছোট হয়ে আসে। কেউ কেউ মনে করেন, চাঁদে একটি শাদা খরগোশ বাস করে। তাই সকল খরগোশকে দেবতা সোম এর অবতার ভাবা হয়।

মঙ্গলবার
যুদ্ধ ও অকৃতদারের দেবতা মঙ্গলের নামানুসারে মঙ্গলবার নামকরণ করা হয়েছে। কখনো কখনো দেবতা কার্তীকের সাথে মঙ্গলকে মেলানো হয়। কোনো কোনো সাহিত্যে তাকে ভূমিদেবী ‘ভূমি’ ও বিষ্ণুর সন্তান বলা হয়েছে; কোথাও বলা হয়েছে তার জন্ম হয়েছে দেবতা শিবের ঘাম বা রক্তের ফোঁটা থেকে। তার গায়ের রং রক্তবর্ণ বা অগ্নিবর্ণ। আর বাহন ভেড়া।

বুধবার
দেবতা ‘বুধ’ এর নামানুসারে বুধবারের নামকরণ করা হয়েছে। দেবতা সোম বা চন্দ্র ও দেবতা বৃহস্পতির স্ত্রী ‘তারা’র সন্তান দেবতা বুধ। তার শরীর কিয়দ পিঙ্গল বর্ণের কিংবা সবুজাভ, পিঙ্গল পোশাক পরিহিত। আগুন ও বাতাসের তৈরি তার রথ টেনে নেয় আটটি বাতাসের তৈরি ঘোড়া।

বৃহস্পতিবার
সপ্তাহের ষষ্ঠ দিন বৃহস্পতিবারের নামটি নেয়া হয়েছে দেবতা বৃহস্পতির নাম থেকে। হিন্দু সাহিত্য অনুসারে বৃহস্পতি হলেন দেবতাদের উপদেষ্টা ও গুরু। তিনি বাগ্মিতার দেবতা। ঋগবেদে বলা হয়েছে, পৃথিবীর প্রথম উজ্জ্বল ও পবিত্র মহাআলোক থেকে বৃহস্পতির জন্ম যিনি সকল আঁধার দূরীভূত করেন।

শুক্রবার
শুক্রবার নামটি দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের নামানুসারে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন পুস্তকে শুক্রকে ভৃগু’র ছেলে বলা হয়েছে। শুক্রাচার্যের আরেক নাম অসুরাচার্য। মহাভারতের বর্ণনা অনুসারে, শুক্র নিজেকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। একভাগ দেবতাদের জ্ঞানের উৎস। আরেকভাগ অসুরদের জ্ঞানের আধার। ভীষ্মের রাজনৈতিক জ্ঞানের গুরু শুক্র।

আশাকরা যায়, সনাতন ধর্মের দেবদেবীর নামানুসারে প্রচলিত সাতবারের নামকরণের সুসংবাদটি যদি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কূপমণ্ডূক মৌলবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে পৌঁছে, তাহলে অচিরেই তারা হাজার বছর ধরে চলে আসা সাতবারের নাম পরিবর্তনের জন্য পথে নামবে, আন্দোলন করবে, হুমকি দিবে এবং আমাকে ধন্যবাদ দিবে। তাদেরকে অগ্রিম ‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম’।

৮ thoughts on “শুক্র থেকে শনি: ইতিহাস ও শঙ্কা

  1. শুক্র বারকে বাঙ্গালী
    শুক্র বারকে বাঙ্গালী মুসলমানরা কিন্তু ইতিমধ্যে জুমা বার বা জুম্মা বার হিসেবে চিনতে শুরু করে দিয়েছে। বাকীগুলোও আয়ত্ম করে নেবে। আপনার পোষ্ট পড়েই হয়তো ওদের ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত হতে শুরু করবে। আমি একটু এগিয়ে দিই।
    ১। ইয়ম স্যাবত (শনিবার)
    ১। ইয়ম ওহেদ (রবিবার)
    ৩। ইয়ম এছনিন (সোমবার)
    ৪। ইয়ম ছালাছা (মঙ্গলীবার)
    ৫। ইয়ম আরবায়া (বুধবার)
    ৬। ইয়ম খামিস (বৃহস্পতিবার)
    ৭। ইয়ম জুমা (শুক্রবার)
    *yahoo*

    1. একটু ছওয়াব কামানোর ধান্দা
      একটু ছওয়াব কামানোর ধান্দা করলাম আরকি। ধর্মীয় চেতনায় তেনারা এমনিতেই ভাজা ভাজা। যাইহোক, আপ্নেরও পুন্যি হবে *yahoo*

      1. ভাই, এ পুণ্যিগুণে যদি
        ভাই, এ পুণ্যিগুণে যদি নরকবাসটা নিশ্চিত হয়। সবাই স্বর্গের আশায় পুণ্যি করে, আমারা না হয় নরকের আশায় পুণ্যি করি!

  2. বারের নামকরণের এই ব্যাপারগুলো
    বারের নামকরণের এই ব্যাপারগুলো জানা ছিল না, আপনাকে ধন্যবাদ। কিছু অংশ নিজের একটা পোস্টের জন্য হুবহু কপি করে নিলাম, আশা করি কিছু মনে করবেন না 😀

    1. কিচ্ছু মনে করিব না। তয়
      অন্যকেউ, কিচ্ছু মনে করিব না। তয় চামেচিকনে এট্টু রেফারেন্স দিয়া দিলে ধরেন আমার এট্টু পাব্লিসিটি অয় আর কি *clapping*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *