জীবনের প্রথম রক্তদান ও কিছু দুঃসহ স্মৃতি

প্রায় প্রতিমাসে তিন চার বার লক্ষীপুর(রাজশাহী) যাওয়া পড়ে।যেতে হয়।থাকতে পারিনা।বলতে গেলে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার।কোন না কোন কারনে টেনে নিয়ে যায়।গত দুদিন অাগেও গিয়েছিলাম।অার কতদিন উনার দারস্থ হতে হবে জানিনা।কবে ইশ্বর মুক্তি দিবেন সেটাও অগচরে।

বছর খানিক হয়ে গেল।এটা ছিল অামার প্রথম ব্লাড ডোনেট।ডাক্তার দেখিয়ে হাঁটতে হাটতে লক্ষীপুর মোড় পৌঁছাতেই একটা দূর্ঘটনা।অনেক লোক জড়ো হয়েছে।সবাই নির্বোধের মত দেখছে।কেউ সাহায্যের জন্য এগুচ্ছে না।বছর তিনেক হবে শিশুটির বয়স।ফুটফুটে।দেখলেই বুকে তুলে অাদর করতে ইচ্ছা করে।সাথে মা ও অাছে।কি করবে বুঝতে পারছে না।হাতের প্রেসক্রিপশনটা দুমড়েমুচড়ে পকেটে ঠুকিয়ে একটি রিকসা ডাকলাম।প্রচুর রক্ত ধরছে বাচ্চাটির পা দিয়ে।মনে হয় ভেইনটা কেটেছে।জোরে রিকসা টানতে বললাম।বাচ্চাটি কোলেই ছিল।কোন মতে রামেকে পৌঁছালাম।অনেক দৌড়াদৌড়ির পর পথ্য মিলল(রাবির স্টুডেন্ট পরিচয় দিয়ে সুবিধাটা পেলাম)।ব্লাড বন্ধ হল।অপারেশন থিয়েটার থেকে খবর এলো প্রচুর রক্ত লাগবে।ব্লাডগ্রুপ মিলে গেল।নিজ শরীর থেকেই ব্লাড দিলম ৫০০ মিলি গ্রাম।মেয়েটির মাও সাথে ছিল।

এত কিউট বাচ্চা এর অাগে কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না।অাপুর নাম্বার নিয়ে প্রায় সময় খোজ খবর নিতাম।প্রতিদিন অন্তত দুবার ওকে দেখতে যেতাম।ও সুন্দর করে দাদা দাদা বলে ডাকত।সাধ্যমত কিছু কিনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম।
ও হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার পরও প্রায় মাস দুয়েক নিয়মিত কথা বলত।শুধু ওর ঐ কচি মুখের দাদা ডাকের জন্যই ফোন দিতাম।লক্ষীপুর গেলেই দেখা করতাম।কিন্তু ওর মা কখনও অার দেখা করত না।কারনটা তখনও অলক্ষ্যে।
হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বন্ধ পেলাম।এভাবে প্রায় মাস চারেক হয়ে গেল ফোন বন্ধ।তবু লক্ষীপুর গেলেই অাশপাশ খুজতাম। পায়নি।সত্যি বলতে মেয়েটির মায়ায় জড়িয়ে গেছিলাম।নিজের ছোটবোন ভেবেই নিয়েছিলাম।

প্রথমে যা বলছিলাম।দু দিন অাগে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরছিলাম।হঠৎ পিছন থেকে কচি বয়সের কেউ দাদা বলে ডাক দিল।পিছন ফিরে দেখি অনু(ছদ্মনাম)। অামাকে জড়িয়ে ধরল।অনেকদিন পর ওকে পেয়ে কান্নায় চোঁখে জল এসে গেল।ওকে চিপস,চকলেট ও অারো কিছু কিনে দিয়ে কোলে নিয়ে বসে রইলাম।

ওর মা একটু দুরে দাড়িয়ে দেখছিল।খেঁয়াল করিনি।ফোন এলো।অামাকে ওর মা তার পিছু নিতে বলল।কথা মত অনুকে কোলে নিয়ে হাটলাম পিছু পিছু।কয়েকটি গলি পেরিয়ে একটি বাসায় ঠুকল। বুঝলাম অনুদের বাসা।
অামি জানতে চাইলাম কেন উনি এমন করলেন? অামি কি অপরাধ করেছি? অনুরও বা কি দোষ?

অনুর মা যা বলল অামি তখন একটু হতবাক।সে একজন প্রস্টিটিউট।সে অামায় বলল।দেখ ভাই তোমার একটা সন্মান অাছে,তুমি য়ুনিভার্সিটিতে পড়,তোমার সামাজিকতা অাছে ইত্যাদি ইত্যাদি।অামি চাইনা অামার সাথে সম্পর্ক রেখে তুমি সমাজের কাছে অপমানিত, লাঞ্ছিত হও।তোমার সন্মান নষ্ট হোক তা চাইনা।সমাজ অামাকে স্বকৃতি দেয়নি,চাইলেই সমাজে ফিরতে পারব না।অামি নির্বাক হয়ে গেলাম।একটা প্রস্টিটিউটের সাথে সম্পর্ক রাখলে সন্মান নষ্ট হয়,সামাজ লাঞ্ছিত করে।
অারে ভাই অাপনি, অামি,অাপনার মত সুশীল সমজা ই ত এদের কাছে গিয়ে অামাদের জৈবিক চাহিদা মেটায়।একটি পুরুষ যখন অনেকটা মেয়ের সাথে শুয়ে মহাপুরুষ হয় তখন তাদেরকে কি বলবেন? প্রশ্ন থাকল।
দেশের বড় বড় গুনীজনরাই ত এদের দেহ ভোগ করে।এখন হয়ত অাপনি বলবেন প্রমান কই? নিজেকে প্রশ্ন করুন।

যাই হোক তারপর জোর করেই অনুর মা’র হাতের রান্না খেলাম ও বললাম।অাপনি যা করেন না কেন অনু অাজ থেকে অামার বোন।অার সমাজ কি বলল বা ভাবল সেটা অামি মাথায় রাখিনা।অামার কাছে যেটা সঠিক মনে হবে সেটা করব।
তারপর তার জীবন কাহীনি শুনলাম(পরে লিখব)।সমাজ,বাস্তবতা,জীবন কতটা কষ্টকর হয় এ ঘটনাটা না ঘটলে হয়ত অনেক শিক্ষা বাকী থেকে যেত জীবনে।

পৃথিবীর কোন মানুষই খারাপ না।প্রতিটি মানুষের মন অাছে, অন্তস্থল অাছে,অন্তরের গভীরতা অাছে।প্রতিটি মানুষের খারাপ পথে যাওয়ার পিছনেও একটা গভীরতর ঘটনা অাছে।যা সবার অগচরে থেকে যায়।সে গল্প না হয় অার একদিন বলব।তবে অামরা মানুষেরা খুবই নেগেটিভ। কখনও এ প্রশ্নের উত্তর অামরা খুজিনা;ছেলেটি বা মেয়েটি কেন এ পথে পা বাড়াল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *