স্বাধীনতার ঘোষণা ও জিয়া

২৫ মার্চ। মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক সম্পর্কে তখনও অনেকে আশাবাদী। তারপরও বিপদের গন্ধ বাতাসে প্রকট। ইয়াহিয়া হঠাৎ ঢাকা ত্যাগ করলেন। সকলেই অবাক। রাত সাড়ে দশটায় ক্রাকডাউন শুরু। বেঈমানি করল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। বঙ্গবন্ধু নেতৃবৃন্দকে সীমান্ত অতিক্রমের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কোন এক রহস্যময় ফোন পেয়ে তিনি থেকে গেলেন তাঁর ধানমণ্ডির বাসভবনেই। গ্রেফতারের সামান্য আগেই গভীর রাতে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের কাছে টেলিগ্রাম করলেন স্বাধীনতার ঘোষণা। রাত বারটায় হামলা হল ধানমণ্ডির বাড়িতে। মুজিবকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হল।

তার আগেই চট্টগ্রামে মেজর রফিকুলের নেতৃত্বে শুরু হয়ে গেছে আরেক নাটক। মেজর রফিকুল ইসলাম ক্রাকডাউনের আগেই ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল এর বাঙ্গালী সৈন্যদের নিয়ে রাত ৮.৩০ এ চিটাগাঙে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই ব্যাপার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াতকে ঘিরে রহস্য সৃষ্টি, অন্যদিকে বাঙ্গালী অফিসার-সৈন্যদের বিভিন্ন অজুহাতে দূরবর্তী দুর্গম এলাকায় মোতায়ন সন্দিহান করে তোলে মেজর রফিকুলকে। হিসেব অনুযায়ী বাঙ্গালীর প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২৪ মার্চ রাতেই। মেজর রফিকুল ২৪ মার্চ রাতেই গোপন বৈঠকে বসেন দুইজন সামরিক অফিসারের সাথে। “আমার কিছু কাঠ দরকার” আর “আমার জন্যে কিছু কাঠ নিয়ে এস” এই দুটো সিগনাল সঠিক সময়ে ব্যবহার করলে চট্টগ্রামের যুদ্ধের পরিস্থিতি অনেকটাই ঘুরে যেত। কিন্তু সম্ভব হয়নি অপর দুই অফিসারের অসম্মতির কারণে। যাদের একজন-কর্নেল এম আর চৌধুরী যিনি পরদিনই ২০ বালুচ রেজিমেন্টের শিকারে পরিনত হন আর অপরজন টিকে থাকে বাঙ্গালীর ইতিহাসের খলনায়ক হিসেবে- মেজর জিয়াউর রহমান!

এবার আসা যাক স্বাধীনতার ঘোষণার ব্যাপারে। গ্রেফতার হওয়ার আগে পাঠানো শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নিয়ে হান্নান সাহেব এলেন চট্টগ্রাম বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে। ঘোষণাপত্র পাঠ করার জন্য কাউকে দরকার- একজন উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার যিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। ডাকা হল চট্টগ্রামের প্রথম প্রতিরোধের নায়ক ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামকে. তিনি রাজি হলেন না। তিনি চেইন অভ কমান্ড ফলো করলেন। বললেন মেজর জিয়াকে দিয়ে ঘোষণাপত্র পাঠ করাতে। এখান থেকেই উত্থান শুরু মেজর জিয়ার, যিনি ২৫ মার্চ এর আগে ছিলেন সেনাবাহিনীর শুধুই একজন মেজর। ঘোষণার প্রস্তাব দেওয়া হল মেজর জিয়াকে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত জিয়া পাকিস্তানের প্রেমে বুঁদ। এবারও এগিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন অলি। এই সেই ক্যাপ্টেন অলি যিনি ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের দিকে অগ্রসরমান জিয়াকে রিভলভারের মুখে ফেরত এনেছিলেন। তিনি পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেছিলেন যে ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাওয়া মেজরের পক্ষে সম্ভব না; পথ দুইটা- জয় অথবা মৃত্যু!

রাজি হলেন জিয়া, শুরু হল রেকর্ডিং-“আমি মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট(!!!!) হিসেবে……………………………………”- এই মারাত্মক কথাটি উত্তেজনায় কেউ খেয়াল করেননি। প্রথম সম্প্রচারে এই মহাত্রুটি ধরা পড়লেই সম্প্রচার বন্ধ করা হয়। বেতারের লোক টেপ নিয়ে ছুটলেন সংগ্রাম পরিষদের দিকে। রাগে-ক্ষোভে বিস্ফারিত সংগ্রাম পরিষদের নেতারা জিয়াকে ফোন দিলে জিয়া বললেন, “আমি ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারিনি, আপনারা একটা খসড়া করে দিন”।
এটাই ছিল জিয়ার উত্থানের কাহিনী। এবার একটু অন্য ঘটনায় আসি। ভাগ্যদেবী আর ক্যাপ্টেন অলি সহায় না হলে ঘোষণাপত্র পাঠের আগেই মেজর সাহেব অন্তত দুবার নিহত হতেন।

একঃ ২৫ মার্চ ১১.৪৫ মিনিট। ক্যাপ্টেন রফিকুল তাঁর সৈন্যসহ রেলওয়ে হিলে অবস্থান করছেন; অপেক্ষা করছেন বিমানবন্দর ও নেভাল বেইজ দখলের। এমন সময় টাইগার পাস ধরে দুটি নৌবাহিনীর গাড়ি যেতে দেখে সুবেদার আইজুদ্দিন মর্টারের গোলা দিয়ে গাড়ি দুটি উড়িয়ে দিতে চাইলে ক্যাপ্টেন রফিকুল অপেক্ষা করতে বলেন। পড়ে জানা যায় প্রথম গাড়িতে ছিলেন মেজর জিয়া। মহাশয় যাচ্ছিলেন কর্নেল জানজুয়ার আদেশে “সোয়াত” থেকে অস্ত্র খালাস করতে!!!!! সেই অস্ত্র যা দিয়ে চট্টগ্রামে চলত বাঙ্গালী নিধনযজ্ঞ!!!! সে যাত্রায় তাকে থামান ক্যাপ্টেন খালেক।

দুইঃ ২৬ মার্চ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে জিয়ার ডাক পড়ে। মেজর সাহেব কোর্টমার্শালের ভয়ে(!) নাচতে নাচতে আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য রওনা দেন। খবর পেয়ে ক্যাপ্টেন অলি জিয়াকে থামাতে পাগলের মত ছুটতে থাকেন। টাইগার পাসের কাছে জিয়ার দেখা পেয়ে জানান যে ২৫ মার্চ ৪০০ বাঙ্গালী রিক্রুটকে খুন করা হয়েছে এবং জিয়া তাদের পরবর্তী শিকার।
জিয়ার উত্তর- কী করব? না গেলে যে কোর্টমার্শাল হবে।

(!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!)
ক্যাপ্টেন অলি এবার কোমরের রিভলভার বের করলেন, “পশ্চিমাদের হাতে গুলি খেয়ে মরার চেয়ে বাঙ্গালীর হাতে গুলি খেয়ে মরে অনেক শান্তি পাবেন”।

এভাবেই দ্বিতীয়বারের মত বেঁচে গেলেন মেজর জিয়া! সেদিন ক্যাপ্টেন অলি না বাধা দিলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাঙ্গালীকে নতুন করে “জিয়া” নামক বিপত্তির মুখোমুখি হতে হত না।

সুতরাং অনুসিদ্ধান্ত টানা যায় যে দৈবক্রমে দু দু’বার বেঁচে যাওয়া আর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মোক্ষম মুহূর্তে আশেপাশে জিয়ার অবস্থান তাকে শঠতার রঙ্গমঞ্চের নটে পরিণত করেছিল। তাঁর শঠতার অনেক প্রমান পাওয়া যায় যার একটি হল যুদ্ধকালীন সময়ে ওসমানীবিরোধী তৎপরতা। ওসমানীকে সরিয়ে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি শুধুমাত্র সামরিক তৎপরতার মধ্যে আনতে চেয়েছিলেন। ওসমানী সাহেব চটে গিয়ে পদত্যাগ করতে গেলে তাজউদ্দীন সাহেবের মধ্যস্থতায় ব্যাপারটার নিষ্পত্তি ঘতে।তাছাড়াও জিয়াউদ্দিনের অসম্মতি ও জেনারেল শফিউল্লাহর প্রতিবাদের কারণে মেজর জিয়া সুবিধা করে উঠতে পারেননি। পরবর্তীতে নিজের নামে “জেড” ফোর্স গঠন নিয়ে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন যার নিষ্পত্তি হয় “এস ফোর্স” ও “কে ফোর্স” গঠনের মাধ্যমে।

আর বাকি থাকল জিয়ার যুদ্ধ পরবর্তী লীলাখেলা! সে গল্প আরেকদিন হবে’খন।
কর্নেল আবু তাহের বীরোত্তমের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করব-
“আমি জিয়াকে আস্তাকুড় থেকে তুলে এনে দিয়েছিলাম সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান কিন্তু সে আস্তাকুড়েই ফিরে গেছে, ইতিহাস আমাদের পক্ষে।”

রেফারেন্সঃ
১/লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে- ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম
২/স্বাধীনতা’৭১-কাদের সিদ্দিকী
৩/যুদ্ধের ময়দান থেকে মেজর জিয়ার পলায়ন- সিরু বাঙ্গালী
৪/ মূলধারা’৭১- মঈদুল হাসান
৫/অফেন্ডিং জিয়া-তথ্য একত্রিত করে কাজ সহজ করেছেন আরিফ রহমান ও সাব্বির হোসাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *