নারীকে কেন সাজতে হবে পুরুষের রুচিতে?

নারীর খোলা বাহু পুরুষকে উত্তেজিত করে। খোলা পেট, টাইট পোশাক, ওড়না ছাড়া স্তন পুরুষের কাম জাগায়। লোলুপ দৃষ্টি ফেলে খোলা বাহু, খোলা পেট, নিতম্বের উঠা নামা, স্তনের আকৃতি দেখে। মনে মনে হিসেব কষে স্তনের ওজন, নিতম্বের সাইজ, পেটের চর্বির পরিমাণ, যৌনির গভীরতা মাপে! মেপে মেপে সুখ নেয়।


নারীর খোলা বাহু পুরুষকে উত্তেজিত করে। খোলা পেট, টাইট পোশাক, ওড়না ছাড়া স্তন পুরুষের কাম জাগায়। লোলুপ দৃষ্টি ফেলে খোলা বাহু, খোলা পেট, নিতম্বের উঠা নামা, স্তনের আকৃতি দেখে। মনে মনে হিসেব কষে স্তনের ওজন, নিতম্বের সাইজ, পেটের চর্বির পরিমাণ, যৌনির গভীরতা মাপে! মেপে মেপে সুখ নেয়। সেই সাথে নিজেকে মডারেট প্রমাণ করতে যুক্তি টেনে বলে, “নারীর প্রতি পুরুষের এইরকম আকর্ষণ আসলে জিনগত, জৈবিক। যাদের এইরকম আকর্ষণ নাই তারা আসলে পুরুষ না, অথবা পুরুষত্বহীন মানুষ”!

নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ, পুরুষের প্রতি নারীর আকর্ষণ জৈবিক, জিনগত। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু সেই আকর্ষণ যখন কার্তিক মাসের রাস্তার কুকুরের মতো হয়ে যায় তখন সেটা আর জৈবিক থাকে না, হয়ে যায় মানসিক সমস্যা। কুকুর বা অন্যান্য প্রাণীর কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা মাসে যৌনাকাংখা বেড়ে যায় এবং সেই সময়েই তারা মিলিত হয়। অন্যান্য সময় এই সকল প্রাণী একে অন্যের দিকে ফিরেও তাকায় না। তবে জিনগত কারনে মানুষের যৌনাকাংখা সবসময় থাকে। কোন নির্দিষ্ট সময় বা মাস নেই। এটিও সত্য যে মানুষের বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি মস্তিষ্ক আছে এবং এই মস্তিষ্ক দিয়ে মানুষ তার শারীরিক, জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এবং এই মস্তিষ্কের কারনেই মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। এখন যদি মডারেট সাজার জন্যে কেউ বলে, নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ থাকবেই, এটা জিনগত, এতে কোন সমস্যা নাই। তখন বলতে হয় আপনার মাথায় যে বিশাল আকারের একটি বুদ্ধি সম্পন্ন মগজ আছে তার প্রয়োজন কী? এই মগজটিকে কি পেয়েছেন বুদ্ধি খাটিয়ে, কৌশল খাটিয়ে শারীরিক চাহিদা বা জৈবিক চাহিদাকে আরো সহজ ভাবে মেটানোর জন্যে? নাকি পেয়েছেন এটিকে খাটিয়ে সভ্য হওয়ার জন্যে?

ওড়না ছাড়া একটি মেয়েকে দেখলে মাল বলে গালি দেন, জিন্স, টি-শার্ট পরলে বেশ্যা বলে মন্তব্য করেন, শাড়ির ফাঁক দিয়ে পেট দেখা গেলে বিছানায় নেয়ার স্বপ্ন দেখেন। বোরকায় আবৃত নারীর চোখ দেখেই বলে দিতে পারেন কাপড়ের নিচে তার শরীর কেমন! বন্ধুদের আড্ডায় হাসি হাসি মুখ করে বলেন, খাবার খোলা থাকলে মাছি বসবেই! যেন একেকটা পুরুষ একেকটা মাছি, একেকটা কুকুর। খাবার খোলা পেলেই খামচে খেতে হবে!

সুন্দরের প্রতি, সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। শহরের চব্বিশ তলা বিল্ডিংটির ডিজাইন, কারুকাজ চমৎকার হলে যে কেউ বারবার তাকিয়ে দেখবে, গ্রামের পাথর খচিত মসজিদ কিংবা মন্দিরের দিকে তাকিয়ে কখনো কখনো চোখ ফেরানো যায় না। লাখ লাখ টাকা খরচ করে মানুষ সপ্তাশ্চর্য দেখতে যায়। পাহাড়, নদী, সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে পাড়ার মানুষের সাথে গল্প করে। পাশের বাসার ভাবির সদ্যোজাত মেয়ে শিশুর সৌন্দর্যের প্রসংশা সবার মুখে মুখে থাকে। কেন? কারন মানুষ সৌন্দর্য ও সুন্দরের পাগল। ফলে সবাই চায় নিজের সবকিছুকে আরেকটু সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে যাতে ভালো দেখায়। ঠিক তেমনই আমরা প্রতিদিন গোসল করি, পারফিউম, কসমেটিকস ব্যবহার করি যাতে নিজেকে দেখতে ভালো লাগে, আকর্ষণীয় লাগে। শপিং করতে গিয়ে দোকান থেকে দোকানে ছুটে বেড়াই ভালো জামা-জুতো কেনার জন্যে। কেন? কারন নিজেকে সুন্দর দেখাবে বলেইতো সুন্দর জিনিসের এতো খুঁজ? নাকি একটা মেয়ে কিংবা ছেলে রাস্তায় বেরুবে বা কাজে যাবে এই চিন্তা করে যে তাকে যতটা খারাপ দেখাতে পারে! সেই অনুযায়ী পোশাক, গয়না পরে? যদি না হয়, তবে একটি মেয়ে যদি মনে করে তার এই পোশাকের সাথে ওড়নাটা মানাবে না, সে পরবে না। মেয়েটি যদি মনে করে তাকে টাইট জিন্স, টি-শার্ট, হিল জুতায় বেশি ভালো লাগবে তবে সে তাই পরবে। যদি মনে করে পাতলা শাড়িতে পেটের একটুখানি বেরিয়ে থাকলে তাকে বেশি ভালো লাগবে তবে সে তাই পরবে। আপনার আমার তো সমস্যা হবার কথা না। আপনি তাকে নিয়ে মন্তব্য করার কে? আপনার ভালো লাগা, মন্দ লাগা দিয়ে তো অন্য একজন সতন্ত্র মানুষের কিছু যাবে আসবে না। আপনার ভালো না লাগলে আপনি দেখবেন না। চোখ বন্ধ করে রাখার জন্যে প্রকৃতি আপনার চোখের উপর সুন্দর একটা পাতা দিয়েছে। বন্ধ রাখুন। খোলা বাহু, পেট, নিতম্ব দেখে যদি আপনার চরিত্র নষ্ট হয় সেটা আপনার মানসিক সমস্যা। আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতা রাখেন না। আপনার মানসিক সমস্যার কারনে অন্য একজন মানুষের ভালো লাগা বর্জন করতে হবে কেন? শালীন হবার উপদেশ আপনি দেবার কে?

একটি মেয়েকে আমি পছন্দ করি, ভালবাসি। তার শারীরিক সৌন্দর্য চমৎকার। তার চেয়ে চমৎকার মানসিক সৌন্দর্য, চিন্তার সৌন্দর্য। আমার মতো তুচ্ছ মানুষকে ছাপিয়ে তার প্রেমে পড়া মানুষের প্রোফাইল ঘাটলে দেখা যাবে চেহারায়, মেধায় একে অন্যকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি যে মেয়েটিকে ভালবাসি সে ভালবাসা কি শুধু কাম বা যৌনতা নির্ভর ভালবাসা? আমার কাছে কাম বা যৌনতা জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ। আমি আমার ভালবাসার মানুষটির কথা যখন চিন্তা করি তখন এই যৌনতার ক্ষুদ্র অংশকে ছাপিয়ে আমার কল্পনায় বেসে আসে মানুষটার পাশে থাকা, দুজনে মিলে অন্যরকম কিছু একটা করা, মানুষের বাসযোগ্য একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে কাজ করা, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এক সাথে লড়াই করা। আমার কল্পনায় শুধু ভেসে থাকে দুজনের হাসি, কান্না, আনন্দের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলোকে ভাগ করে নেয়া।

এখন যদি কেউ বলেন আমার পুরুষত্ব নাই তবে বলতে পারে। এই বাক্যটির সাথে আমার পরিচয় বহু দিনের। দলবেঁধে বন্ধুরা একটা মেয়েটি টিজ করছে, আমি নীরব অথবা প্রতিবাদ করছি দেখে ওরা বলতো তুই “মাগি”, “হিজড়া”! অধিকাংশ সময়ই বন্ধুদের আড্ডার প্রধান বিষয় থাকে কোন না কোন নারী! আমার অংশগ্রহণ খুঁজে না পেয়ে তখন শুরু হয়ে যেতো আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা!

নারীর সৌন্দর্য আমিও দেখি। দেখে মুগ্ধ হই। অনেক সময় এমন কিছু নারী দেখি যাদের থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়া কষ্টের ব্যাপার। তাই বলে তাদের দেখে যৌন লালসা জাগে? বিছানায় নিতে ইচ্ছে করে? মোটেই না। যেমন করে একটা চমৎকার স্থাপনা দেখে আমি মুগ্ধ হই, একটি হৃদয় ছুঁয়ে যাও উপন্যাস, কবিতা পড়ে পুলকিত হই তেমন করেই নারীর সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হই। উপন্যাস, কবিতা কিংবা স্থাপনা দেখায় যেমন যৌনতা থাকে না তেমনি নারীর সৌন্দর্যেও আমি কোন যৌনতা খুঁজে পাই না। পাই মায়া, কারুকাজ, শিল্প।

তসলিমা নাসরিন তাঁর ছেলেবেলায় একদিন নিজ শহর ময়মনসিংহ থেকে রিক্সা করে বাসায় ফিরছিলেন, তখন হঠাৎ ছুটে এসে একটি ছেলে জলন্ত সিগারেট তার বাহুতে চেপে ধরে পুড়িয়ে দিয়েছিল! তসলিমা নাসরিনের দোষ কী ছিল? তিনি মেয়ে বলে? শহরে, গ্রামে হাজার হাজার পুরুষ প্রতিদিন খালি গায়ে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কিছু বলে না, কোন মেয়েও ফিরে তাকায় না। অথচ নারীর সামান্য খোলা বাহু, খোলা চুল দেখে পুরুষের অনুভূতি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়! সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেয়! কুৎসিত মন্তব্য করে প্রতিনিয়ত!

ফেসবুকে নারী আইডিগুলোর ইনবক্স পরিনত হয় এক শ্রেণীর নপুংশক পুরুষের যৌনাঙ্গের চিত্র প্রদর্শনীতে! কিছু নারী যদি লজ্জা ভেঙ্গে, সাহস করে এই নপুংশকদের কার্যকলাপ জনসম্মুখে নিয়ে আসে তখন তারা হয় বেশ্যা নয় পতিতা! যারা এগুলো করছে তারা অন্য পুরুষদের থেকে নতুন ভাবে আরো করার উৎসাহ পায়! ফেসবুকের এই নারীদের দোষ কী? তারা কি সেই সকল নপুংশকদের নিমন্ত্রণ করে তার আইডিতে নিয়ে আসে? নারীটি তার প্রোফাইলে ছবি দিবে, লিখবে, যা ইচ্ছে তা করবে। কাউকে তো জোর করে বলে না, আমার ছবি দেখ, আমার লেখা পড়। তোমার ভালো না লাগলে তুমি তার আইডি থেকে চলে যাও, ব্লক দাও। কেন বোঝ না, নারীটির ফেসবুক প্রোফাইল তার ব্যক্তিগত সম্পদ, তোমার নয়।

একজন মানুষ তার শরীরটাকে কিভাবে প্রেজেন্ট করবে সেটা তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যপার। কারো যদি নিজেকে বোরকায় আবৃত রাখতে ভালো লাগে সে বোরকা পরবে, কারো যদি জিন্স-শার্ট পরতে ভালো লাগে সে জিন্স-শার্ট পরবে, কারো যদি কিছু না পরতে ভালো লাগে সে পরবে না। তাতে আপনার আমার তো কোন সমস্যা থাকার কথা না। আপনার যা ভালো লাগে আপনি করুন না। কেউ তো কিছু বলছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *