অভিজিৎ দা‘কে নিয়ে

এক অভি হাজারো অভির জন্ম দিল। অভিজিৎ রায় বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন, অমর হয়ে থাকবেন সহযোদ্ধাদের মধ্যে, তার চিন্তা-চেতনা-লেখায়। চাপাতি ও রক্তের যুদ্ধ ‍অভিজিৎ রা, মুক্তমনারা, নাস্তিকরা করে না, তারা করে লেখা, যুক্তি প্রতিবাদের যুদ্ধ।


বই পড়ার ইচ্ছাটা আমার বরাবরই ছিল। মেট্রিক পরীক্ষা শেষ দীর্ঘসময় বই পড়ে কাটাব এটাই প্লেন। কোনো রকম টাকা সংগ্রহ করে লাইব্রেরীতে গেলাম। রানা ভাই মাত্র কিছু বই নিয়ে এসে বললো ,ধরুন,অভিজিৎ রায় খুব ভাল মুক্তমনা লেখক আজ এইমাত্র তার নতুন বই আসল। তখনো আমি জানতাম না অভিজিৎ কে! যদিও মুক্তমনা ব্লগ পড়তাম। আগ্রহ বইয়ের প্রতি,বলা মাত্র নিয়ে নিলাম দুটো বই “বিশ্বাসের ভাইরাস” এবং “বিশ্বাস ও বিজ্ঞান” পরে “স্বতন্ত্র ভাবনা”। বিশ্বাসের ভাইরাস পড়া শুরু করে দিলাম। এমন ভাল লাগল বলার মত না। তারপরে বিশ্বাস ও বিজ্ঞান বইটা। ভাল লাগার কারণ হচ্ছে সত্য তুলে ধরেছেন,মনের কথা বলেছেন,মনে আঘাত করেছেন,বাস্তব কথা বলেছেন। আমার মাথায় তখন ভাইরাস ভর্তি ছিল। সেই ভাইরাসের প্রতিষেধক ঔষধ পেলাম। আমার মাথা থেকে তখন সরে যাচ্ছে অন্ধ বিশ্বাসের ভাইরাস, আমি আমার ভুল গুলো খুঁজে পাচ্ছি। পথের প্রতিটা ভুল থেকে নব নব ‍অধ্যায় রচিত করছিলাম। এখন আর চোখ থাকিতেও অন্ধ নয়। কখনো নিজে নিজের ভেতরে প্রতিবাদে মেতে উঠি।এখন সামনে যাকে দেখি মনে হয় ভাইরাস আক্রান্ত বিশ্বাসী। সবাই কোনো না কোনো বিশ্বাস নামক ভাইরাসে আক্রান্ত, ধর্মে অন্ধে বিশ্বাস, প্রেমে, ভালবাসায়, রাজনীতি, মার্কসে, লেনিনে, নিজের গোপন সত্যে বা মিথ্যে গল্পে। মূলত বিশ্বাসটা নিজ থেকে সৃষ্টি, মন হচ্ছে বিশ্বাসের কেন্দ্রস্থল। ধর্ম, মতবাদ, দর্শন , সংষ্কার ও সংস্কৃতি চোখে দেখি, কানে শুনি অনুভুতি দ্বারা মনে ধারণ করি পরে বিশ্বাসে পরিণত হয়। সাধারণত নিজের বিচার বিবেচনা, যুক্তি ছাড়া অন্ধভাবে বিশ্বাস করি, জন্ম থেকে এটা বিশ্বাস করতে হবে বলে পরিবার ও সমাজ এটা শিখায়। ধর্মগুলো তাদের মতবাদে বিশ্বাসী বানাতে সবসময় তৎপর। ধর্ম ও সমাজ পরিবারকে বা ব্যক্তিকে নিন্দা করবে, কটু বলবে সে ভয়ে মা-বাবা পরিবার সেই শিক্ষাই দেয়। আমিও একসময় এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিলাম। অভিজিৎ দা‘র লিখা এবং মুক্তমনা ব্লগ বিশ্বাসগুলোকে ভেঙ্গে মাটির উপর মুক্তভাবে পথ চলতে শিখিয়েছেন। পরে হুমায়ুন আজাদ নাস্তিকদের বই পড়াই ব্যস্ত থাকি। রাহুল সাংকৃত্যায়ন, যতীন সরকার আরো অন্যান্য লেখকদের বই অনেক আগে থেকেই পড়তাম।

মেট্রিক পাশ করলাম। পরে ইংরেজীর ওপর একটা ডিপ্লোমা পাশ করে বাইরে চলে আসি। দেশে থাকতে তেমন একটা সময় ছিল না, এখন সময় হয় বই পড়ার, ফেইসবুকে পোস্ট পড়ার, কথা বলার , ব্লগ পড়ার। মুক্তমনা আর নাস্তিকদের বই বা লিখা বেশি পড়ি।

অভি দা‘র বই পড়তে পড়তে একটা বিষয়ে তার সাথে একমত হতে পারলাম না একদিন, ইচ্ছা হয় তার সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করি। ফেইসবুকে পরিচয় হয়। অভি দা ব্যস্ত থাকে তাই তেমন একটা সময় নিয়ে কথা বলা হত না। সময় নিয়ে আলোচনা করব সেটাই ভেবে রাখলাম। হঠাৎ এক সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাইরে বসে আছি। আমার সিনিয়র এক বন্ধু এসে বললো “তোমার অভিজিৎ দা কে তো হত্যা করেছে” “চাপাতি দিয়ে জখম করেছে” সে মারা গেছে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না ‘আমার কোন অভিজিৎ দা’ প্রশ্ন করলাম কোন ‍অভি দা? বললো তুমি যার ভক্ত ,যার বই পড়। তা শুনা মাত্র গাঁয়ের সব লোম, কেশ শিউরে উঠল, মনে হল আমার শরীর থেকে কি যেন কেড়ে নিয়েছে কেউ। তারপরও তার কথা বিশ্বাস হল না। ছুটে গেলাম ফেইসবুকে, দেখলাম ফেইসবুক শোকে ভারাক্রান্ত, তার কথা সত্যি। অভিজিৎ রায় আর নেই। আমার প্রিয় লেখক একজন নেই। আমার সেই আলোচনা আর করা হল না। আমার মনে হয়, সারা বাংলাদেশ থেকে তাঁকে খুব শিক্ষিত ,কম্পিউটারে দক্ষ, লেখায় শক্ত ও দুর্দান্ত, প্রচুর বোঝার ক্ষমতা ,বন্ধুত্ব পরায়ণ, গবেষক, প্রমাণ ভিত্তিক লিখা এবং যুক্তি দিয়ে সত্য উৎঘাটন করা তেমন সহজ কাজ নয়। শ্রম, সময়, মেধার প্রয়োজন পড়ে। সে মেধাবী ও দক্ষ লেখককে হত্যা করল মৌলবাদীরা।তা সহ্য হয় না। তাঁর মৃত্যু আমাকে জাগতে, কলম ধরতে, বুক ফুলিয়ে উগ্রদের বিপক্ষে দাড়াতে বলছে। তাঁর মৃত্যুতে মস্তিস্ক আমার জাগ্রত, কলম চলছে। উগ্র পাগলরা একটা মোমবাতি নিবিয়ে হাজার লক্ষ কোটি মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোকিত জাগ্রত করল। বিবেকের রক্তে ধরিয়ে দিল আগুন।

এক অভি হাজারো অভির জন্ম দিল। অভিজিৎ রায় বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন, অমর হয়ে থাকবেন সহযোদ্ধাদের মধ্যে, তার চিন্তা-চেতনা-লেখায়। চাপাতি ও রক্তের যুদ্ধ ‍অভিজিৎ রা, মুক্তমনারা, নাস্তিকরা করে না, তারা করে লেখা, যুক্তি প্রতিবাদের যুদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *