জীবন দর্শন – ভারী ও হালকা অধ্যায় । – ১ম পর্ব

ভারী অধ্যায়

ভারী অধ্যায়
প্রতি দিনই কোনো না কোনো নুতন মুগ্ধতায় অভিভূত হই আমি । আমার চার পাশের প্রতিটি মানুষ, তাদের কর্মকান্ড, ভাবনা, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী এবং বিষয়ভিত্তিক প্রতিভা আমাকে ক্রমাগতই মুগ্ধ করে চলেছে । লক্ষকোটি গুনাবলী, প্রতিভা,ভাললাগা ও আনন্দ আমাদের চারপাশে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে যা আমরা অনুভব করি না । ব্যাপারটা আনেকটা বাতাসের মধ্যে ডুবে থেকেও এর উপস্থিতি অনুভব করতে না পারার মত । আমরা মূর্খের মত প্রতিনিয়তই বিখ্যাত ঘটনা, বিখ্যাত ব্যাক্তি, বিখ্যাত কর্মযজ্ঞ ইত্যাদির খোঁজে ব্যাস্ত থাকি । একটু সংবেদনশীল ও গ্রহনশীলতাসুলভ মনোভাব নিয়ে বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহুর্তকে অতিক্রম করলেই পেয়ে যাব ভালথাকা ও ভাললাগার লক্ষ কোটি উপাদান , যা কিনা বিশেষ কিছু খুঁজে বেড়ানোর দৌড়ে সবসময়ই পেছনে ফেলে আসি ।
আপনার সন্তানের মুখে উচ্চারিত নানামাত্রিক শব্দগুলো মনযোগ দিয়ে শুনে দেখুন , এমন কিছু কথা শুনতে পাবেন যা আপনার কল্পনা বা চিন্তায় কখনো আসেনি । আপনার বাড়ীর পরিচারক যে ভাব, বাচ্য ও উপস্থাপনায় হকার বা প্রতিবেশীর সাথে গল্প করে, ততটা সুন্দর উপস্থাপনায় ভাব প্রকাশের কথা হয়তো কখনোই আপনার মনে উদিত হয়নি । বাসার সামনের মুদি দোকানের বিক্রেতা ছেলেটি অথবা গ্রীস্মের দুপুরে ছায়ায় নিজ রিকশায় বিশ্রামরত চালকের, অবসর সময়ের জীবনদর্শন বা গান গেয়ে উঠার আনন্দ বিনোদন কতটা স্পর্শকারী তাও হয়তো দেখা হয়নি । কিংবা পঠিত প্রবন্ধ, গল্প ইত্যাদি কতটা মেধা,গুরুত্ব ও আদরের সাথে পরিবেশন করা হয়েছে তাও হয়তো অনুভব করা হয়নি । তাই কবির সাথে আবারও উচ্চারন করছি ” দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,একটি ঘাসের শিশের উপর একটি শিশির বিন্দু । ”
চারপাশে ঘটে যাওয়া ছোটো ছোটো সব ঘটনা ও মুহুর্ত থেকে আনন্দরস সংগ্রহ করে বেঁচে থাকাকে আরো প্রানবন্ত, অর্থবহ ও আনন্দের করে তুলতে চেষ্টা করুন । দেখবেন ভাল লাগার পরিমান ও পরিধি বেড়েই চলেছে । অহেতুক হতাশা, দুঃখ , ক্ষোভ জমিয়ে নিজেকে কষ্ট দেবার মানে হয় না ।
হালকা অধ্যায়

জীবন দর্শনের হালকা অধ্যায় হলো যুগে যুগে বিনোদিত হওয়ার মত ঘটনাসমূহ । এই ঘটনাগুলো মোটেও কাল্পনিক নয় । প্রায় অবিশ্বাস্য শোনালেও এগুলো সত্য এবং জীবন থেকে নেয়া ঘটনা এবং মন্তব্য । অনেক ক্ষেত্রে এগুলো জীবন সম্পৃক্ত প্যাচালও বটে ।
হাসপাতালে কাজ করতে গেলে প্রতিনিয়তই অসহায় এবং অদ্ভুদ পরিস্থিতর সম্মুখীন হতে হয় । চিকিৎসকের অসহায়ত্বের নমুনা হিসাবে কিছু ঘটনা স্মৃতির বাক্সে জমা থাকে । স্মৃতির বাক্স ঘেটে এমনি পুরানো একটি ঘটনা বলছি ।
২৪-২৫ বছর বয়স্ক একজন রোগীনি পেট-বুক জ্বালাপোড়া ও মাথাব্যাথা সহ কিছু সামান্য অসুবিধার অভিযোগ নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসেন । অভিযোগগুলো খুব গৌন হওয়ায় পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই পরামর্শ ও চিকিৎসা দেওয়া হলো । তিনদিন পর রোগীনি আবারো একই অভিযোগ নিয়ে হাজির হলেন । এইবার আর গুরুত্ব না দিয়ে পারা যায় না , কাজেই সকল প্রকার পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করে এবারও আগের চিকিৎসাই বহাল রাখা হলো এবং আরো অন্তত পাঁচদিন ধৈর্য ধারনের পরামর্শ দেয়া হলো । পাঁচদিন পর আবারো রোগিনীর প্রত্যাবর্তন – এবং এইবারও একই অভিযোগ । এবার রোগীর ব্যাক্তিগত ইতিহাস পরীক্ষাকরত বৈবাহিক অবস্থা নিশ্চিত হয়ে প্রেগনেন্সী টেষ্ট করতে দেওয়া হলো । কিছুসময় পর রিপোর্ট সহ রোগীনি ফেরত আসলেন । এইবার চিকিৎসক বিজয়ীর বেশে রোগীকে আনন্দ সংবাদ অর্থাৎ প্রেগনেন্ট হবার সংবাদটি দেন । প্রতিক্রিয়ায় রোগীনি অত্যন্ত বিরক্তভাবে চিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন – ” এইটা কিভাবে সম্ভব ?”। এবার চিকিৎসকের অস্বস্থির পালা , দ্বিধাগ্রস্থ ভাবে চিকিৎসক এর জবাব – ” সেটাতো আপনারই ভাল জানবার কথা ”। রোগীনি আরও অধিক বিরক্তির সাথে বললেন ” কিন্তু উনি তো দেড় বছর হইলো দুবাই থিকা দেশে আসেন নাই ”। এখন চিকিৎসকের নীরবতার পালা । অবশেষে রোগীনিই নীরবতা ভাঙ্গলেন, খানিক চিন্তান্বিত থাকবার পর রোগীনি দ্বিধা দুর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে যা বললো তা শুনে তো চিকিৎসকের আক্কেল গুরুম । রোগীনি বললেন – ”ওহ্ বুঝছি গতমাসে যে উনারে স্বপ্নে দেখছিলাম সেইজন্য”।

আমার জীবনে কাউকে স্বপ্নে গর্ভবতী হয়ে বাস্তবে তা ধারন করতে দেখা সেটাই প্রথম এবং শেষবার ।

সাভারে রানা প্লাজার পিলার ঝাঁকিয়ে ধ্বস নামানো, তত্তাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থা বহাল না হওয়ার কারনে ধ্বস নামা, চাঁদে সাইদীকে দেখতে পাওয়া, শত শত লাশ গুম হয়ে যাওয়া অথবা লাশগুলো জীবিত হয়ে হেটে চলে যাওয়া – এ জাতীয় জীবনদর্শন আমাকে ভাবিত করে না, অনাবিল আনন্দ দেয় । আপনারাও শরীক হোন, উপভোগ করুন ।

৬ thoughts on “জীবন দর্শন – ভারী ও হালকা অধ্যায় । – ১ম পর্ব

  1. ভারী অধ্যায় নিয়ে মাঝে মাঝে
    😀 😀 😀 😀 😀
    ভারী অধ্যায় নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। আসলেই খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা বা উপাদানের মাঝেই লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার অদ্ভুত প্রেরণা। তারেক মাসুদের রানওয়ে সিনেমার শেষ দৃশ্য দেখে সেটা দারুনভাবে উপলব্ধি করেছিলাম।

    হালকা অধ্যায় নিয়ে আর কি বলব… আপনার পেশারই লোক, বুঝতেই পারছেন… :চোখমারা:
    ভালো লাগল আপনার লেখা। :ফুল:

  2. দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর

    দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,একটি ঘাসের শিশের উপর একটি শিশির বিন্দু । ”

    ভাল লিখেছেন । শুভেচ্ছা রইল 🙂

  3. হালকা উপলব্ধিতে এইটা কি গল্প
    হালকা উপলব্ধিতে এইটা কি গল্প শোনালেন?
    পুরাই পেটে খিল ধরা অবস্থা! :হাহাপগে: :হাহাপগে:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *