মানুষের চিন্তা চেতনা কোথায়?

“ভালোবাসা জিনিসটা প্রতিটা মানুষের জীবনে খুবই দরকার। তাই আমার জীবনেও ভালোবাসা আছে, তবে এটা একটু ভিন্ন ধরণের ভালোবাসা। এই ভালোবাসায় কোন কামনা নাই, আছে শুধু ভালোবাসার মানুষটাকে কাছ থেকে দেখার, কথা বলার প্রবল ইচ্ছা।

এ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমার আট বছর বয়স। খুব একটাও ভালো-খারাপের জ্ঞান তখনও আমার হয় নি। আমি বেড়ে উঠছিলাম, আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল আমার দুই বোন- আমার বড় বোনের নাম তুলি দিদি, ছোট বোনের নাম বৃষ্টি দিদি । তুলি দিদিকে আমি ‘আক্কা’ বলে ডাকতাম এবং বৃষ্টি দিদিকে ডাকতাম ‘সোনা’ বলে।

আমি তাদের যেমন ভালোবাসতাম তারাও আমাকে তেমনি ভালোবাসতো। আমরা প্রতিদিন অনেক গল্প করতাম, খেলতাম, মারামারি করতাম, এভাবেই যাচ্ছিল দিনগুলো।

হঠাৎ একদিন সব কিছু বদলে গেল। মা এসে বড় দিদিকে বললো যে, আগামীকাল নাকি দিদিকে দেখতে কে যেন আসতেছে । আমি তো ছোট, কিছু বুঝলাম না মা কি বললো । তবে দিদির চোখের দিকে তাকায় আমি ভয় পেয়ে যাই। দিদির চোখে আমি অন্ধকার দেখতে পাই, চোখে আগুন দেখতে পাই, মনে হচ্ছে দিদির চোখ থেকে এখনই জল পড়বে, একটা সমুদ্র তৈরী হয়ে যাবে সেই জলে, আমার মনে হয় দিদি অনেক কষ্ট পাচ্ছে । আমি কেঁপে উঠি, আমি ভয় পেয়ে যাই, আমি দিদিকে চিপে ধরি। দিদি কেঁদে ফেলে, ছোট দিদিও(বৃষ্টি দিদি) কেঁদে ফেলে। দিদির চোখের জলে আমার জামা ভিজে যায়।

দিদিকে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘দিদি কাঁদছো কেন?’
দিদি কিছু বলে না, শুধু আমাকে চিপে ধরে কেঁদেই যায়।
দিদিকে আমি আবার জিজ্ঞেস করি, ‘দিদি কাঁদছো কেন?’
দিদি কিছু বলে না, আমাকে আরও জোরে করে চিপে ধরে দিদি।

আমার মাথায় সহস্র প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, এ কেমন দিন এলো যে দিন সকলে কাঁদছে- আমার বড় দিদি কাঁদছে, আমার ছোট দিদি কাঁদছে, আমি কাঁদছি?
আমি অনেক ভাবি, তবে কিছুই বুঝতে পারিনা, আমি ছোট দিদিকে জিজ্ঞেস করি, ‘দিদি তোমরা সবাই কাঁদছো কেন, মা এমন কি বলে গেল যে তোমরা কাঁদছো?’
ছোট দিদি বলে, ‘সোনা, তোর বড় দিদির বিয়ের কথা বলে গেল মা।’

শুনেই আমি বেশ আঁৎকে উঠি, আমার খুব খারাপ লাগে । ছোট থেকে বিয়ে জিনিসটা আমার খুব একটা ভালো লাগতো না, এটা শুনার পর আমার আরও খারাপ লাগতে শুরু করে ।
আমি কেঁপে উঠি, আমার মনে হয় আমার সামনে আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে, আমার সামনে আগুনের বৃষ্টি হচ্ছে, আমি সবকিছু অন্ধকার দেখাতে পাচ্ছি ।

আমি দিদিকে জোরে করে চিপে ধরি, আমি বলি,‘ না এ আমি হতে দিব না, আমি আমার দিদিকে অন্য কারও সাথে শুতে দিব না, আমি আমার দিদিকে অন্য কারও সাথে কথা বলতে দিব না, না, না, না, এটা হতে পারে না ।’

দিদি আমাকে চিপে ধরে, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আমি ঘুমিয়ে পড়ি, দিদি আমাকে তার পাশে শুইয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, হয়তবা ঘুমায় না, হয়তবা সারারাত কাঁদে!
সকাল হয়, আমি চোখ খুলি, আমি দেখি দিদিকে সাজানো হচ্ছে। দিদি কাঁদছে, ছোট দিদিও কাঁদছে। একটু পড়ে দেখি কয়েকজন লোক এসেছে বাড়িতে, দেখি একজন বেশ সেজেগুজে এসেছে। ছোট দিদি আমাকে ডেকে বলে, ‘দেখ এটা আমাদের দাদা ভাই।’

আমার সে লোকটিকে দেখে খুব ঘৃণা হয়, যদি পারতাম তাকে ঘর থেকে বের করে দিতাম ।

দিদির সাজা শেষ  হয়ে গেছে, কী সুন্দর লাগছে দিদিকে! মনে হচ্ছে যেন, লাল গোলাপ। আমি দিদির চোখে তাকাই, দিদির চোখে আমি সুখ দেখতে পাই, আমারও সুখ লাগে, আমি দিদিকে চিপে ধরি, দিদি আমার কপালে চুমো দেয়, আমার খুব ভালো লাগে, আমি সব কিছু ভুলে যাই ।

অনেকক্ষণ ধরে চলছে আলাপ, শোনা যাচ্ছা দুই পক্ষই নাকি রাজি আছে । আমি নিজেকে বলি- ‘দিদির বিয়ে হবেই তাহলে, দিদি তাহলে আমাকে ছেড়ে চলেই যাবে! ‘

বিয়ের তারিখও নাকি ঠিক হয়ে গেছে শুনা যাচ্ছে । সকলের মুখে আনন্দ, সকলেই দেখি কিনাকাটিতে ব্যস্ত । তবে দিদির চোখে আমি এক না বলা কষ্ট দেখতে পাই, আমার খুব খারাপ লাগে, আমি দিদিকে চিপে ধরতে চাই, তবে পারি না। কি যেন আমাকে আঁটকে রাখে ! কোন রাতে আমার ঘুম হয় না, কি যেন আমাকে জাগিয়ে রাখে!

অবশেষে বিয়ে চলে আসে, দিদি খুশি, ছোট দিদি খুশি, মা খুশি, বাবা খুশি, সবাই খুশি, তবে আমার কোন কিছুই ভালো লাগে না। আমার মনে হয় দিদি চলে গেলে আমার কি হবে, আমি কার সাথে খেলবো, কার সাথে কথা বলবো, কার সাথেই বা মারামারি করবো! আমার কিছুই ভালো লাগে না। আমি সব কিছুকে ভালো লাগানোর চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না।

বিয়ে এখন শেষ, এখন বিদায়ের পালা । দেখি দিদি কাঁদছে, ছোট দিদি কাঁদছে, মা কাঁদছে, বাবাও কাঁদছে, সকলে কাঁদছে। আমারও কাঁদতে ইচ্ছা করে, আমি নিজেকে বলি কাঁদলে চলবে না । আমি সকলকে দেখছি, সবাই কাঁদছে, দিদিও কাঁদছে, আমার পক্ষে এখানে আর থাকে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দুচোখ ফেঁটে জল বের হতে চাচ্ছে, আমি আর পারছি না, আমি দৃঢ় থাকার চেষ্টা করছি , আমি পারছি না । দেখি দিদি আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে, আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, আমি দৌড়ে গিয়ে দিদিকে চিপে ধরি, আমার চোখে জলের সমুদ্র। আমি কাঁদছি, দিদি কাঁদছে, সবাই কাঁদছে !

দিদি চলে যাচ্ছে, আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, আমি নিজেকে বলছি, ‘কাঁদলে চলবে না, কাঁদলে চলবে না’, আমি নিজের সাথে কথা বলেই চলছি । আমি আমার চোখের জল মুছে নিই , আবার চোখে জল জমে যায়, আমি আবার মুছে নিই, আবার চোখে জল জমে যায়।

আমার সামনে দিদির চেহারা ভাসছে, দিদির কথাগুলো আমার কানে ঘন্টার মত বাঁজছে, আমার কোন কিছুই ভালো লাগছে না। আমি জোরে করে চিৎকার দিয়ে উঠি, ‘দিদি তুমি চলে আসো, দিদি তুমি চলে আসো।’
আমি আর পারিনা, আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমার কাছে এটা স্বপ্নের দুঃস্বপ্ন মনে হয়, যা আমি কখনই ভুলবা না, যা আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া কখনই সম্ভব হবে  না।

এখন আমি বেশ বড় হয়েছি, অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি । তবে এখন আমি আমার দুই দিদিকেই হারিয়েছি। দুই দিদিরই এখন বিয়ে হয়েছে, তারা খুব আনন্দে আছে। তবে এখনও আমার অনেক রাতে ঘুম হয় না, এখনও আমার তাদের কথা মনে করা ছাড়া দিন শুরু হয় না। আমার চোখ দিয়ে এখনও পানি পড়ে, তবে তারা তা বুঝতে পারে না, আমি বুঝতে দেই না। আমি যখন তাদের দেখি আমার আনন্দের শেষ থাকে না, আমার কত কথা জমে থাকে তাদেরকে বলার, তবে তা আর বলা হয় না। তবে আমি আমার জীবনে দিদিদেরকে যে ভালোবাসা দিয়েছি তা হয়তবা অন্য কাউকে দেওয়া আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমি আমার জীবনে ভালোবাসা বলতে শুধু আমার দিদিদেরকেই বুঝি ।

তবে আমার এই ছোট জীবনে আমি অনেক কিছু সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছি, যা অনেকে করতে পারেনি।”

কয়েকদিন আগে আমি এ গল্পটি লিখেছিলাম, তীব্র আবেগের বশে। তবে আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী (হয়ত আততায়ী) আমাকে বলেছিলেন তোমার লেখা ভালই হয়েছে, তবে ভাই-বোনের মধ্যে এরকম ভালোবাসা, জড়িয়ে ধরা এগুলো না করলেই না।

আমি প্রতি উত্তরে বলেছিলাম, ‘কেন, আমি তো শুধু আমার বোনকে জড়িয়ে ধরেছি, এতে ফের কি এমন হলো?’

এর উত্তরে লোকটি বলেন,’ আসলে মেয়ে মানুষেরা আসল মানুষই না, তারা মানুষের নামে কলঙ্ক। তাদের কাজ শুধু ছেলেদেরকে বশে আনা।’

আমি বলছিলাম, ‘ হয়ত আপনি পাগল, না হয় বড় ধার্মিক। নাহলে আপনার মুখে এ কথা শোনা যেত না”

লোকটি বলে, ‘ কেয়ামতের ময়দানে বুঝবা কে পাগল, আর কে…..’
তারপর সেই লোকের সাথে আমার আর কথা বা দেখা কিছুই হয় নি।

আমি এখন ভাবি, একটা মানুষের চিন্তাভাবনা কত নিম্নমানের হলে একটা ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে এরকম অবান্তর সব যুক্তির প্রবেশ দোয়ার তৈরি করতে পারে। এমন মানুষদের এই সমাজ থেকে বের করে দেওয়া উচিৎ। এরাই আমাদের সমাজকে দূষিত করে চলছে, নিজের ইচ্ছা মত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *