কান্না, সৌভাগ্য, এবং…

ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে সাদেকের চোখ পড়েছিল আকাশের দিকে। আকাশটা তখন দিগন্ত থেকে দিগন্তে মেশে নি। তার আকাশটা তখন আটকে ছিল বাঁশের বেড়ার ছোট্ট একটা ফুটোর মাঝে। সেখান থেকে যখন সে দৃষ্টি সরাল, তখন তার চোখে পড়েছিল প্রায় ধ্বসে পড়া বাঁশের বেড়া। এক পাশে বুড়োমত একজন মহিলা। তার হাতভর্তি রক্ত। আর দেখেছিল একজন তরুণীকে। তার শরীরের নিম্নাংশ ছিল রক্তাবৃত। সাদেক তার মাথাটা খানিকটা ঘোরাতে পারলে দেখতে পেত, তার সমস্ত শরীরও রক্তে সয়লাব। অবশ্য, সে বুঝতে পারত না, সেই রক্ত ভর্তি রয়েছে পাপ। তার জন্মই পাপের মধ্য দিয়ে।

সাদেকের জন্য একটা নাম রাখার যন্ত্রণাটুকু তার মা করে নি। বড় হবার পর সে যখন বুঝতে পারল সবার একটা করে নাম থাকে, তখন সে নিজেই নিজের নাম রেখেছিল সাদেক। স্রেফ একটা নাম রাখার জন্যেই।

_______________________________________________________________

জন্মের পর থেকে কিভাবে বড় হয়েছে সাদেক জানে না। তার যখন থেকে অতীত স্মৃতি মনে আছে, তখন সে একটা মাজারে নিয়মিত খেত। প্রতি-বেলা লবণ ছাড়া খিচুড়ি। শুক্রবার দুপুরে তাতে মাংস দেয়া হত। তাই শুক্রবার দুপুরে সাদেকের ভাগ্যে কিছু জুটত না। বয়েসে ছোট হওয়ায়, সে মার খেয়ে পড়ে থাকত। অন্যেরা হাসতে হাসতে মাংসের খিচুড়ি নিয়ে চলে যেত। সাদেকের চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হত। সাদেক কাঁদত না। কান্নার মত বিলাসিতা সবার ভাগ্যে নেই।

তার মা তাকে নিজের পরিচয় দেবার যন্ত্রণাটুকুও করে নি। সেদিন সে মাজারের পাশের বস্তিটায় আবুলের সাথে খেলার সময় যখন তাকে আবুলের মা বলেছিল, ‘যা যা। তর মার কাছে যা। এইহানে চিল্লাইস না।’ তখন সাদেক অবাক বলেছিল, ‘আমার মা কেডা?’ আবুলের মা তাকে তার মা দেখিয়ে দিল। আবুলের ঘরের চার ঘর পরে একটা ঘরের দরজায় একটা প্রায় শেষ যৌবনা মহিলা বসে আছে। সে অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারও মা আছে! আর সবার মত তারও একজন মা আছে? সাদেক তার ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারল না।

গুটিগুটি পায়ে সে মহিলাটার দিকে এগিয়ে গেল। লজ্জা, সংকোচ নামের অনুভূতিগুলো কখনই তার মাঝে ছিল না। আজ যেন এই অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যে সবকিছু তার মাঝে এসে ভর করল। মহিলাটার সামনে গিয়ে বলল, ‘এই যে শুনেন।’ মহিলাটা তার দিকে চোখ তুলে তাকাল। খানিকক্ষণ আর কিছু সে বলতে পারল না। তার গলাটা ধরে এল। একটু পরে বলল, ‘আপনে না’কি আমার মা?।’ মহিলাটা একটা তীব্র দৃষ্টি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। সাদেক ভয় পেয়ে গেল। মনে হল এখনই দৌড়ে পালিয়ে যেতে। আবুলের মা নিশ্চয় তার সাথে মজা করেছে। তার আবার মা আসবে কোথা থেকে? কিন্তু, তাকে অবাক করে সেই মহিলাটা তাকে জড়িয়ে ধরল।পরম মমতায়। সাদেক কি করবে বুঝতে পারল না। মহিলাটা ডুকরে কেঁদে উঠল। সাদেক বুঝল না সে কাঁদছে কেন? আজকে তার একটা মা হয়েছে। আজকে কাঁদার কি আছে?

সেদিন থেকে সাদেক তার মায়ের সাথেই থাকে। কিছুদিন পর সে আর একটা জিনিস সে জানতে পারল। সবার একটা করে বাবা থাকে। কিন্তু, তার কোন বাবা নেই। মাকে তার এই প্রশ্নটা করা সাহস হয়ে ওঠেনি। একদিন সে সাহস করে মাকে তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছিল। তার মা চিৎকার করে বলেছিল, ‘তর কোন বাপ নাই’।
-ক্যান নাই? সবার বাপ আছে আমার নাই ক্যান?
-বাপ! তর বাপ লাগব? কয়টা বাপ লাগব তর? শ’য় শ’য় মাইনসের মইধ্যে, যা তর বাপরে খুইজ্যা বাইর কর- কোনডা তর বাপ? না, অই হগ্গলেই তর বাপ। যেই কডা আমার লগে শুইছে সব কডা তর বাপ। একটা না, তর শ’য় শ’য় বাপ আছে।

সাদেক কিছু বোঝে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ, তাকে অবাক করে ঠাস করে তার মা তাকে একটা চড় মারে। বলে, ‘এই নে তর বাপ।’ সাদেকের খুব কাঁদতে ইচ্ছে হয়। সাদেক কাঁদে না। কান্নার মত সৌভাগ্য নিয়ে সবাই পৃথিবীতে আসে না।

সাদেকের সাথে তার একজন বাবার দেখা হয় ক’দিন পরেই।

রাতে মায়ের সাথে থাকা সাদেকের কোন দিনই হয় না। সে বড় হয়েছে মাজারে। সে জানত, তার থাকার জায়গাই হল এই মাজার। সন্তানেরা যে রাতে মায়ের কাছে থাকে এই কথা তার জানা ছিল না। কারণ, তার সাথে যারা থাকত, তাদের কারোরই মা ছিল না। কিংবা, থাকলেও তারা সাদেকের মত সৌভাগ্যবান ছিল না। তাদের মায়ের সাথে তাদের পরিচয় ছিল না। কিন্তু, ক’দিন আগেই মাজারের ঝাড়ুদার দাঁত বের করে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কি রে, তুই রাত্রে তর মার লগে না থাইকা মাজারে থাকস ক্যান?’ সাদেক বুঝতে পারল, যাদের মা আছে, তারা রাতের বেলা তার মায়ের সাথে থাকে। সে তখন শুধু বলল, ‘মাজারে থাকলে আল্লা সোয়াব দ্যায়। তাই থাকি।’

সেদিনও সে শুয়ে ছিল মাজারের আঙ্গিয়ায়। একটা কাঁথায় মাঘের প্রচণ্ড শীত পোষ মানছিল না। অন্য কোনদিন হলে সাদেক দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যেত। সেদিন আর করতে ইচ্ছে হল না। কেন করবে? তার এখন মা আছে। তার মায়ের একটা ঘর আছে। সন্তানেরা রাতে তার মায়ের সাথে থাকে। সেখানে না থেকে কেন সে এই মাজারে পড়ে থাকবে?

সাদেক তার মায়ের ঘরের দিকে রওনা দিল। পৌঁছে দরজায় হাত দিয়েই বুঝল দরজা ভেতর থেকে আটকানো। সেটা তার কাছে সমস্যা না। দরজার পাশের বেড়ায় দুটো ছোট ফুটো আছে। সেখান দিয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা খুলে ফেলা যায়। এটা সাদেক দু’দিন আগে আবিষ্কার করেছে। আজকে সেই আবিষ্কারকে কাজে লাগল। ফুটো দিয়ে তর্জনী আর মধ্যমা ঢুকিয়ে দরজা খুলে ফেলল। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সে তার একজন বাবাকে দেখতে পেল।

ভুঁড়িওয়ালা, মোটা একটা লোক নগ্ন হয়ে তার মায়ের ওপর শুয়ে আছে। তার মাও নগ্ন। সাদেক হতভম্ব হয়ে গেল। কিছু বুঝতে পারল না। সাদেক দেখতে পেল, তার মায়ের মুখের লিপস্টিকের খানিকটা তার চিবুকে তার খানিকটা সেই লোকটার মুখে লেগে আছে। তার মায়ের চকমকে শাড়িটা মেঝেতে পড়ে আছে। তার ওপরে মেয়েদের আরও কিছু পোশাক। সাদেক তার নাম জানে না। একপাশে একটা লুঙ্গি আর একটা ফতুয়া। সাদেক বুঝতে পারল না, সন্ধ্যা থেকে তার মায়ের সেজেগুজে রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে থেকে কি লাভ হয়? সব তো পেট মোটা লোকটা নষ্ট করে দিল। সাদেক কিছুই বুঝতে পারল না।

হঠাৎ, তার মা নগ্ন অবস্থায়ই উঠে এসে তাকে কষে একটা থাপ্পড় মারল। সাদেক ছিটকে গিয়ে মাটিতে পড়ল। তার নাক দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল। সাদেক উঠে বসার চেষ্টা করল। মাটিতে থু থু ফেলল। থুথুর সাথে রক্ত বেরিয়ে এল। সাদেকের মা চিৎকার করে বলল, ‘ক্যান আইছস? ক্যান আইছস তুই? এই জন্যেই জম্মের পর তরে মাজারে ফেলায় আইছিলাম। আমারে রাইতের বেলায় দেখার লেইগা আইছস? না’কি তর বাপরে দেখতে আইছস? দেখবি তর বাপরে? অই যে দেখ। ওইটাও তর একটা বাপ।’ সাদেক অবাক হয়ে শুনল। কিছুই বুঝল না। হঠাৎ, লোকটা হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে সাদেকের মায়ের শাড়িটা কোমরে পেঁচিয়ে উঠে এসে সাদেককে একটা লাথি মারল। সাদেক ছিটকে গিয়ে বেড়াতে আছড়ে পড়ল। তারপর তার মাকে অশ্রাব্য কয়েকটা গালি দিল, সাদেক কেন এখানে এসেছে? সাদেক সেখান থেকে পথের নেড়ি কুকুরের মত পালিয়ে গেল।

________________________________________________________________

কয়েক মাস পর।

সাদেককে তার মা বলল এই ক’দিন রাতে তার সাথে থাকতে। তার শরীর যদি কখনও খারাপ হয় তাহলে যেন সাদেক করিমনের নানীকে ডেকে আনে।

দু’দিন পরের সাদেকের মা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। সাদেক দৌড়ে গিয়ে করিমনের নানীকে ডেকে আনল। করিমনে নানী তাকে বলল, বাইরে গিয়ে দাড়াতে। সাদেক কিচ্ছু জিজ্ঞেস করল না। চুপচাপ বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। একটু পরে আরও একজনের চোখ পড়ল আকাশের দিকে। আকাশটা তখন দিগন্ত থেকে দিগন্তে মেশে নি। সেই আকাশটা তখন আটকে ছিল বাঁশের বেড়ার ছোট্ট একটা ফুটোর মাঝে। সেখান থেকে যখন সে দৃষ্টি সরাল, তখন তার চোখে পড়েছিল প্রায় ধ্বসে পড়া বাঁশের বেড়া।

কিছুই না বুঝতে পেরে, সে কেঁদে উঠেছিল। সাদেক বাইরে থেকে শুনতে পেল তার কান্না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, ‘কান। যত পারস এহনই কান। পরে আর কানতে পারবি না। কান্দার মতন ভাইগ্য নিয়া সবাই জম্মায় না।’

৯ thoughts on “কান্না, সৌভাগ্য, এবং…

  1. আপনার গল্প লেখার হাত অত্যন্ত
    আপনার গল্প লেখার হাত অত্যন্ত দুর্দান্ত…… গল্প যখন পাঠকের মনে নিরবিচ্ছিন্ন চিত্র আঁকতে সক্ষম হয় তবে সেই গল্প সার্থক। সেই লেখক সার্থক।

  2. ক্লান্ত ব্রাদার, গল্পখানা
    ক্লান্ত ব্রাদার, গল্পখানা আমার বাসায় এসে পড়িয়েছিলেন। :চোখমারা:
    তখনই বলেছিলাম অনেক ভাল হয়েছে।। :খুশি:

  3. চমৎকার লাগল। আপনার গল্পের
    চমৎকার লাগল। আপনার গল্পের ভক্ত পাঠক হয়ে গেলাম। :বুখেআয়বাবুল:

  4. প্রশংসা করতে করতে তো মুখ
    :রকঅন: :রকঅন: :রকঅন: প্রশংসা করতে করতে তো মুখ ব্যথা হয়ে গেল । । :মুগ্ধৈছি:

    1. জ্বি, প্রশংসা করতে করতে মুখ
      জ্বি, প্রশংসা করতে করতে মুখ ব্যাথা হয়ে যাবার পর একটা ফালতু পোস্ট পড়তে এলেন তাই না???

      বুঝি বুঝি, সবই বুঝি। পিচ্চিকালে খাইছি সুজি।

      1. বুঝি বুঝি সবই বুঝি বৃদ্ধ কাল
        :শয়তান: :শয়তান: :শয়তান:
        বুঝি বুঝি সবই বুঝি বৃদ্ধ কাল এ খাচ্ছি রুটি 😀

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *