ট্রাম্পের হোয়াইট ম্যাড হাউজ

হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনে লোক নিযুক্তির সাক্ষাতকার নিচ্ছেন। এই চাকরিতে আবেদনের পূর্বশর্ত ছিলো; প্রার্থীর অবশ্যই পাগলা গারদে কমপক্ষে পাঁচবছর বসবাসের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অনেকেই অবাক হয়; পাগলা গারদে ছিলো এমন লোকেরা দেশ চালাবে; তাই কী হয়!

ট্রাম্প বলেন, যে দেশের নাগরিকেরা আমার মতো লোককে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে; তাদের পরিচালনার জন্য পাগলাগারদ ফেরত লোকই চাই। কই ডাকুন এক এক করে।

প্রথম প্রার্থী আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদের জন্য সাক্ষাতকার দিতে।
ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন, আমার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় যারা জ্বালাও-পোড়াও করেছে; এরা কারা! কিছু জানেন!
প্রার্থী বলেন, এরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি। এদের সঙ্গে ছিলো কিছু চিংকু বাম। এরা সরকার পতনের বৈজ্ঞানিক ষড়যন্ত্র করছে। অবশ্য এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দেশবাসীর আপনার চেতনায় আস্থা আছে।
–আমার চেতনা কী!
–ঐ যে স্বাধীনতার পক্ষের চেতনা।
–এখন এই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কী করণীয়!
–বিষয়টা খতিয়ে দেখতে হবে। অনেক খ্রিস্টান মসজিদে গিয়ে আপনার শপথের প্রতিবাদে অবস্থান নিয়ে খ্রিস্ট ধর্মানুভূতিতে আঘাত হেনেছে। খ্রিস্টান জাহান এটা বরদাশত করবে না।
ট্রাম্প উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরে লোকটাকে একটা চড় দিয়ে বলেন, কনগ্রাটস। আপনিই আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত।

এর পরের প্রার্থী আসেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি চিফের পদের জন্য ইন্টারভিউ দিতে।
ট্রাম্প সময় বাঁচাতে চলে যান সরাসরি প্রশ্নে। আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কীভাবে ঠেকাবেন!
–রিপাবলিকান পার্টি যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলো; কাজেই যারা রিপাবলিকান পার্টিতে বিশ্বাস রাখে না; তারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস রাখেনা। তারা নিশ্চিতভাবেই এন্টি-এমেরিকান। আমি বলতে চাই; এন্টি রিপাবলিকান মানেই এন্টি এমেরিকান। যারা স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাস করেন না; তারা দেশত্যাগ করুন।
ওয়াও বলে লোকটার গালে ঘোত করে একটা চুমু খেয়ে দেন ট্রাম্প।
জিজ্ঞেস করেন, এতো গেলো উইচ হান্টিং-এর প্রথম ধাপ। নেক্সট ধাপে কী!
–কেউ আপনার বিরুদ্ধাচরণ করলে; গ্রেফতার করে তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে বের হবে এলিট ফোর্স। এরপর তার মৃতদেহের কাছে একটি রিভলবার রেখে বলে দেবো, এনকাউন্টারে মারা গেছে। এছাড়া সরাসরি গুম করে দেবার নতুন একটা কৌশল তো আছেই।
–এই গুম করতে গিয়ে এলিটফোর্সের কেউ যদি ধরা পড়ে যায়; মানবাধিকার সংস্থার নাটকুগুলিরে কী উত্তর দেবেন!
–বলে দেবো ব্যক্তির অপরাধের দায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ফোর্স কিছুতেই নেবেনা। কুকুর গিয়ে কাউকে কামড় দিলে কী কোন কুকুরের মালিক মালিকানা স্বীকার করে!
ট্রাম্প লোকটার মুখ বরাবর একটা ঘুঁষি বসিয়ে দিয়ে বলেন, ইউ আর সিলেক্টেড।

পরবর্তী প্রার্থী আসে ইনফরমেশান এন্ড ব্রডকাস্টিং মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে মনোনীত হতে।
ট্রাম্প লোকটির কাঁধে একটি পাঞ্চ বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
–স্যাটারডে নাইট শো’র লোকটাকে নিয়ে কী করি! খুব জ্বালাচ্ছে। শুধু আমার পিছে লেগে থাকে।
–ও তো একটা শো করে মাত্র বারোশো ডলার পায়। ওরে একটা টিভি লাইসেন্স দিয়ে কিনে নেবো। সেই হবে ট্রাম্প টিভির সিইও। সে আপনার যাবতীয় ভুলের জাস্টিফিকেশান দেয়া ধামাচাপাজীবী হয়ে যাবে।
–মেইন স্ট্রিম মিডিয়াকে না হয় টেকাটুকা দিয়ে ম্যানেজ করলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কী করবেন!
–এগুলো তো বৈজ্ঞানিক ষড়যন্ত্রের মিডিয়া। এখানে ইনডিভিজুয়ালকে ধরার উইচহান্টিং-এর জন্য একটা “অনুভূতি” আইন প্রণয়ন করতে হবে। প্রাথমিকভাবে এটা খ্রীস্টধর্মানুভূতিতে আঘাত বন্ধের লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত এটা ট্রাম্পানুভূতিতে আঘাত বন্ধের হাতিয়ার হবে। এই আইন দিয়ে অন্যধর্মের মানুষ ও নাস্তিকদের যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের ব্যবস্থা করা যাবে। তাদের বাড়ী-জমির দখল নিয়ে রিপাবলিকান ক্যাডার ও চার্চগুলোকে খাসজমি হিসেবে বরাদ্দ দেয়া যাবে।
–আপনিও কী আমার মত আপনিও “লিটনের ফ্ল্যাট” ব্যবসায়ী ছিলেন নাকি! এতো বড় প্রোমোটার তো কখনো দেখি নাই। আপনি সিলেক্টেড।

এরপরের আফ্রো-এমেরিকান লোকটি আসে জ্বালানী মন্ত্রী পদের জন্য।
ট্রাম্প তাকে পশ্চাদদেশে একটি বেত্রাঘাত করে বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানী তেল চুরি করার দিন তো বোধ হয় শেষ হয়ে এলো। এই বিপুল জ্বালানী সংকট কীভাবে মোকাবেলা করবেন!
–আমাদেরকে কয়লা সভ্যতার দিকে ফিরে যেতে হবে। সুপার-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বনভূমিগুলোর ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে!
–ঠিক ১৪ কিলোমিটার কেন!
–জ্বালানী ব্যবস্থাপনার চৌদ্দ গুষ্টিতে এই মডেল আর কেউ উদ্ভাবন করতে পারেনি তাই।
–পরিবেশকর্মীরা যদি প্রতিবাদ করে।
–বলে দেবেন ওরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি।
–বুঝতে পারছি এই স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির তকমা দিয়ে বিরোধী সব পক্ষকে দমিয়ে রাখতে হবে। গুড আইডিয়া। আই এম লাভিং ইট। কনগ্রাটস।
–থ্যাংক ইউ মি প্রেসিডেন্ট। পুতিনের সঙ্গে কথা হলে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ দেবে কীনা জেনে নেবেন প্লিজ।
–পুতিনের সঙ্গে এতো ঘন ঘন কথা বললে বিরোধী পক্ষ যদি আমাকেই স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি বলে বসে!
–আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় উগ্র জাতীয়তাবাদী ইনজেকশান দিয়ে একটা নাতসি গ্যাং ছেড়ে দেবো; এরা দেশপ্রেমের ঠিকাদারি করে বেড়াবে। কথায় কথায় লোকজনকে, -ক ইউ, মাদার-ফাদার-ব্রাদার-সিস্টার -কার বলে গালি দেবে। ভদ্রলোকেরা ভয় পেয়ে প্রতিবাদে পিছিয়ে পড়বে।
–এতো বুদ্ধি নিয়ে কী করে ঘুমান ভাই কালিয়া!

এরপরের প্রার্থী ট্রাম্পের বেয়াই। তিনি ঢুকতেই ট্রাম্প তার মুখে পেস্ট্রি ছুড়ে মারেন। বেয়াই ঠোঁটের কাছে পেস্ট্রিগুলো জিভ লম্বা করে চেটে-পুটে নেন। আবদার জুড়ে দেন, আমার কিন্তু লোকাল গভমেন্ট মিনিস্ট্রিটা চাই-ই চাই।
–নিশ্চয়ই বেয়াই বলে কথা। যার ঘরে মেয়ে দিয়েছি; এমেরিকাটাই তো এখন তার।
–আমি কিন্তু অন্যধর্মের মানুষ একদম সহ্য করতে পারিনা। আমার নিজের এলাকায় এদের দেখতে চাইনা। ইচ্ছে হয় দু’একটার চোখ তুলে নিই। সবকটাকে জেলে ভরবো।
–আপনার এলাকার সংখ্যালঘু মাছ কীভাবে ভাজবেন সেটা আপনার ব্যাপার।
–আমি মাছের তেলেই মাছ ভাজবো বেয়াই।

এবার আসেন এক ভদ্রলোক শিক্ষামন্ত্রী পদে ইন্টারভিউ দিতে। প্রায় একইসঙ্গে ঢুকে পড়েন আরেক সেইন্টের মত দেখতে লোক। উনি এসেছেন বানিজ্য উপদেষ্টা পদে ইন্টারভিউ দিতে। একই সঙ্গে দুজন করে লোকের ইন্টারভিউ নিয়ে নিয়োগের ঝামেলা শেষ করতে চান ট্রাম্প।

শিক্ষামন্ত্রী পদে নিয়োগে আগ্রহী লোকটিকে ছাপিয়ে সেইন্টের মত দেখতে লোকটি বলেন, মি প্রেসিডেন্ট খ্রিস্ট ধর্মের আদর্শে গড়ে তুলতে হবে।
—আমিও তাই ভাবছিলাম। এমেরিকা এখন থেকে চলবে ওল্ড টেস্টামেন্ট সনদ অনুযায়ী।
–সেইক্ষেত্রে শিশুদের গ্রন্থে সি-তে চার্চ হওয়া বাঞ্চনীয়।
–আপনি তো এসেছেন বানিজ্য উপদেষ্টা পদের জন্য; শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে কথা বলছেন কেন!
–মি প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র এতোদিন শিক্ষা-বিজ্ঞানের দিকে অপ্রয়োজনীয় মনোযোগ দিয়ে দেশটার বারোটা বাজিয়েছে। শিক্ষাকে হতে হবে ধর্ম ও বানিজ্যমুখী। মনে রাখবেন একটি পাঠ্যপুস্তকের শক্তি যে কোন মিডিয়ার চেয়ে বেশী। চারবছরের মধ্যে এমেরিকাকে একধর্মীয়, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী আর শিক্ষায় দুর্বল করে ফেলতে পারলে; নির্বাচন ছাড়াই সেকেন্ড টার্মে শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন আপনি।
কথাটা ট্রাম্পের খুব ভালো লাগে, আপনি তো সান্টাক্লজ মশাই; সেকেন্ড টার্মের আইডিয়ার উপহার নিয়ে এসেছেন।
হবু শিক্ষামন্ত্রী কী যেন বলতে চান। ট্রাম্প থামিয়ে দিয়ে বলেন, সেইন্টের কথা শুনুন; কাজে দেবে।
সেইন্ট বলে, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে দুবার ভরাডুবি ঘটানোর অভিজ্ঞতা আছে আমার। তা থেকে বুঝেছি শেয়ার বাজার বিপর্যয় মডেলটি রাষ্ট্রের প্রত্যেক ক্ষেত্রে কাজে দেয়। শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে শেয়ার বাজারে পরিণত করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে খ্রিস্টধর্ম আর ট্রাম্প-অনুভূতি ইনজেক্ট করতে হবে। পেছনের প্রচ্ছদ হবে ভোটের লিফলেটের মতো। ট্রাম্প মহাশয়ের ছবি দিয়ে নীচে লিখে দিতে হবে, কাউকে হৃদয় দিওনা। মানে ট্রাম্প ছাড়া কাউকে হৃদয় দিওনা।
ট্রাম্প উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ান। আর কোন আইডিয়া।
–দিতে পারি; যদি আমার নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ লুটপাটের মামলাটা খারিজের ব্যবস্থা করেন।
–সে তো হবেই। এখন বিচার বিভাগে নিজেদের লোক ঢোকানোর আদর্শ সময়। আপনি বলুন।
–শিক্ষা-ব্যবস্থার মধ্যে শেয়ার বাজারের সব উপাদান ঢুকাতে হবে; অভিভাবকেরা বাচ্চাদের জন্য শেয়ার কিনবে; প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যবস্থা থাকবে; আবার ভালো গ্রেড বিলিয়ে দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এতে শেয়ার হোল্ডারদের কোন লাভ হবে না। লাভ হবে রিপাবলিকানদের আর চার্চের। বাচ্চারা কম শিখবে; কম জানবে; প্রশ্ন কম করবে!

এমন সময় ট্রাম্পের জামাই দৌড়াতে দৌড়াতে আসে, হাতে একটা যিশুর মিনিয়েচার পুতুল। তাতে চুম্বন দিয়ে বলে, আব্বা এমেরিকায় যারা আমার প্রাণপ্রিয় যীশুর সমালোচনা করে, খ্রিস্ট ধর্ম নিয়া আজে-বাজে কথা বলে; ঐসব নাস্তিকদের ফাঁসি চাই। দরকার হয় এদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করুন।

– মাসকাদা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *