কমিউনিস্ট ইশতেহার পরিচয়

ইউরোপকে আতঙ্কগ্রস্থ করছে একটা ভূত-কমিউনিজমের ভূত।

২৪ জুন,১৮৭২।আক্ষরিক অর্থেই কমিউনিস্ট বিপ্লবের ভয়ে ইউরোপের পুঁজিপতিদের হাটু কাঁপছে।এই সময়ই প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক কমিউনিস্ট মেনেফেস্টো বা কমিউনিস্ট ইশতেহার।
এ ইশতেহারকে মহামতি মার্ক্স নিজেই ঐতিহাসিক দলিল ঘোষণা করেছেন।এবং ‘একে বদলাবার অধিকার নেই’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন।তাই বর্তমান আমরা ইশতেহারটির যে রূপ দেখতে পাই তা মূলত দু ভাগে বিভক্ত।প্রথম ভাগে ১৮৭২ থেকে ১৮৯৩ পর্যন্ত পাঁচটি বিভিন্ন ভাষায় এর সংস্করণ বেরুনোর প্রেক্ষাপটের ইতিহাসসম্বলিত সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধ যার প্রথম দুটিতে মার্ক্স এর নিজেরই স্বাক্ষর ছিল এবং পরেরটি মূল ও অপরিবর্তিত অংশ।

পাঠক ইচ্ছে করলেই মার্ক্সের প্রথম ভূমিকাটুকু পড়ে এটি এড়িয়ে যেতে পারেন তবে এটি পড়লে তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা জন্মাবে।আর যাদের এটি প্রথম কোন কমিউনিজম পুস্তক তাদের জন্য আমি মূল অংশ পড়ে এসে এটা পড়বার সুপারিশ করব তাতে বরং বিভিন্ন টীকা সম্পর্কে বুঝতে সুবিধে হবে।
মার্ক্সের প্রথম ভূমিকায়ই কার্ল মার্ক্স কমিউনিস্ট পার্টিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সমিতি বলে।এছাড়া তিনি এর ঐতিহাসিক গুরূত্ব তুলে ধরেন এবং কমিউনিস্ট পার্টি তথা শ্রমিক শ্রেণীর আদর্শ নিয়েই এ ইশতেহার লিখিত বলে ‘তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রের শুধু দখল পেলেই শ্রমিক শ্রেণী তা কাজে লাগাতে পারে না’ বাক্যটিতে ইঙ্গিত দেন।
এর পরের মুখবন্দগুলোতে মূলত প্রথম ভূমিকারই পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয় আর সাথে তখনকার পালাবদল গুলোর কথা উল্লেখ করা হয়।আর প্রথম দুটি বাদে পরের গুলোতে সাক্ষর করেন ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস।

ভূমিকা শেষে মূল পর্বে এসে শুরুতেই সেই বিখ্যাত লাইনযুগল-ইউরোপকে তাড়া করছে একটা ভূত-কমিউনিজমের ভূত।আর এই ভূতকে তাড়াবার জন্য এক পবিত্র জোটের এসে ঢুকেছে সাবেকি ইউরোপের সকল ব্যক্তি -পোপ,জার,ফরাসি র‍্যাডিকেল ও জার্মান পুলিশ।
এখানেই ইশতেহারটির কারণ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়-
১.ইউরোপের সকল শক্তি ইতিমধ্যেই কমিউনিজমকে একটি শক্তি বলে ঘোষণা করেছে।
২.সময় এসে গেছে এখন প্রকাশ্যে সারা জগতের সামনে কমিউনিস্টদের ঘোষণা করা উচিৎ তাদের মতামত কী,লক্ষ্য কী,তাদের ঝোঁক কোন দিকে এবং কমিউনিজমের এই ছেলে ভোলানো গল্পের জবাব দেওয়া উচিৎ পার্টির একটা ইশতেহার দিয়েই।
এরপর আমি এর সংক্ষেপে পরিচ্ছেদগুলো তুলে ধরছি:
১.বুর্জেয়া ও প্রলিতারিয়েত

বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিপতি শ্রেণিকে বোঝায় যার উৎপাদনের উপাদান গুলোর মালিক এবং মজুরি ক্রিমের নিয়োগকর্তা ।প্রলেতারিয়েত হল আজকালকার মজুর শ্রমিকরা যারা উৎপাদনের উপায় নিজ হাতে না থাকার দরূন বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি ব্যয় করে।(এঙ্গেলস,১৮৮৮)

এই অধ্যায়ে মুলত বুর্জেয়াদের স্বরূপ উদঘাটন করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে তারা কেবল পূর্ববর্তী সামন্ত সমাজের অত্যাচারের রূপ পাল্টিয়েছে।এখানে তাদের অসুস্থ বিপ্লবি আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে তারা মুল্যবোধ ও পরিবার ধ্বংস করছে।এমনকি তারা শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনবিশারদ ইত্যাদি প্রগতিশীল দের স্রেফ মজুরী ভোগী শ্রমিকে পরিণত করেছে।
এছাড়া বলা হয়েছে যে আগের সব বিপ্লব হয়েছে সং্খ্যালঘুর দ্বারা কিন্তু এই আন্দোলন হচ্ছে সং্খ্যাগুরুর দ্বারা সং্খ্যালঘু শোষকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

২.প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্ট :

এই অধ্যায়ে প্রলেতারিয়েত ও কমিউনিস্টদের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে হয়েছে।আর পরিষ্কার ভাবে বলা আছে কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাক্তি মালিকানার উচ্ছেদ।এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হচ্ছে এখানে বুর্জোয়াদের সব অভিযোগের অত্যন্ত যৌক্তিক উত্তর আছে এতে।এছাড়া এখানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা,শিল্পপুলিশ প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি মোট দশটি দাবি নিয়ে এগুতে হবে বলে প্রলেতারিয়েতদের আহবান করা হয়েছে।

৩.সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট সাহিত্য :

সাহিত্য বলা হলেও এখানে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বই বোঝানো হয়েছে।এজন্য প্রথম দুই প্যারাতে রচনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।
সমাজতন্ত্রের তৎকালীন ক্ল্যাসিফিকেশগুলো করা হয়েছে এভাবে-
১.প্রতিক্রিয়াশীল সমাজতন্ত্র –
ক.সামন্ত সমাজতন্ত্র :এটিকে পাদ্রিতান্ত্রিক বা ছদ্ম সমাজতন্ত্র বলা হয়েছে।
খ.পেটি বুর্জোয়া সমাজতন্ত্র: যেখানে বুর্জোয়াদের বিভিন্ন ছোট শ্রেণিদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমাজতন্ত্র বলা হয়েছে।উল্লেখ্য মূলত উচ্চ ধনী সমাজে এই ছোট বুর্জোয়া যেমন বাড়িওয়ালারা হারিয়ে যায় কিন্তু মধ্যম সমাজে তাদেরও অস্তিত্ব থাকে।
গ.জার্মান বা খাঁটি সমাজতন্ত্র:এটি মূলত জার্মান প্রতিক্রিয়াশীলদের জার্মান সমাজতন্ত্র।
২.রক্ষণশীল সমাজতন্ত্র
৩.সমালোচনায় ইউটেপিয় সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজম:
-এটি মূলত সামন্ত্রতান্তিক আন্দোলন পরবর্তী যখন প্রলেতারিয়েত শৈশবে।
-এরা প্রলেতারিয়েতের মুক্তির শর্ত তুলে ধরে নি।
-এক কথায় এরা রাজনৈতিক সমালোচক বা সংস্কারক।তাই কমিউনিজমের সাথে আদর্শগত অমিল আছে।

৪.বিদ্যমান বিভিন্ন বিরোধী পার্টির বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের অবস্থান:
মূলত শেষ কয়েকটা কথায় এর ও গোটা ইশতেহারের সারমর্ম বা উপসংহার তুলে ধরা হয়েছে।

“শেষ কথা সকল দেশের
গণতন্ত্রী পার্টিগুলোর ঐক্য ও
প্ল্যাটফর্মের জন্য আমরা কাজ করি।
আপন মতামত ও লক্ষ্য গোপন
রাখতে কমিউনিস্টরা ঘৃণা করে।
খোলাখুলি আমরা ঘোষণা করছি আমাদের
অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে কেবল
সমস্ত বিদ্যমান সকল সামাজিক
অবস্থার সকল উচ্ছেদ ঘটিয়েই।
কমিউনিস্ট বিপ্লবের আতঙ্কে শাসক
শ্রেণিরা কাঁপুক।
শৃঙ্খলা ছাড়া হারানোর কিছু নেই
প্রলেতারিয়েতের,জয় করার জন্য
আছে সারা জগৎ।”

৫ thoughts on “কমিউনিস্ট ইশতেহার পরিচয়

  1. কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্তেহার
    কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্তেহার বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের প্রথম কর্মসূচিমূলক দলিল….!
    চিরজীবী অজেয় মতবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *