ইশ্বরের নশ্বরতা

মৃদু অথচ তিব্র আর্তনাদের শব্দে ইশ্বরের ঘুম ভাঙ্গল। তিনি কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন। দুরে কোথাও কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাপারটা বোঝার জন্য তিনি এগিয়ে গেলেন যেদিক থেকে শব্দটি আসছিল। তিনি দেখলেন একটা ঘুঘু ঝিঙে মাঁচায় বসে করুণ সুরে বিলাপ করছে, -“হায় ইশ্বর! আমার সন্তান ফিরিয়ে দাও নাহলে আমাকে নিয়ে নাও!”

তিনি ঘুঘুটির কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনলেন এবং অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন ঘুঘুটির সন্তানের কি হতে পারে। তিনি খেয়াল করলেন, অদূরেই একটা মানব শিশু একটি ঘুঘুছানা নিয়ে খেলছে। ঘুঘু ছানাটি চুপচাপ দাঁত কামড়িয়ে শিশুটির খেলায় সঙ্গ দিচ্ছে। এমতাবস্থায় ঘুঘুছানাটি হঠাৎ নড়াচড়া থামিয়ে দিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আর শিশুটি কান্না করা শুরু করে দেয়। ইশ্বরকে দেখে শিশুটি কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-“কে ওখানে?”
-“আমি ইশ্বর!”
-“ওই বুড়ো এই দিকে আয়!”
-“কি বাবা? ডাকছো কেন?” ইশ্বর এগিয়ে এসে শিশুটিকে জিজ্ঞেস করে।
-“এই ঘুঘুর বাচ্চাটা নড়ছে না! ওকে কিভাবে চালু করবো?”
-“দাড়াও চালু করে দিচ্ছি!” বলেই ইশ্বর ঘুঘুছানাটিকে উঠে দাড়ানোর নির্দেশ দিলেন। কিন্তু ঘুঘুছানাটি উঠলো না।
-“কি হলো?” শিশুটি তাড়া দেয়।
-“ওটা মরে গেছে! আর চালু হবেনা!” ইশ্বর বিরস মুখে জবাব দিলেন।
-“কেন চালু হবে না? সেদিন আমার একটা খেলনা গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আমার বাবা একমিনিটেই সেটা ঠিক করে দিল! তুমি না বললে, তুমি ইশ্বর? আম্মু বলেছে তুমি সব পারো! এইবার এই ঘুঘুটিকে চালু করে দাও।”
ইশ্বর প্রমাদ গুনলেন। তক্ষনাৎ কিছু ভেবে পেলেন না শিশুটিকে কি উত্তর দেবেন। বিব্রত ইশ্বরকে বাঁচিয়ে দেয় শিশুটির মা এসে।
-“এই খোকা! একা একা কার সাথে কথা বলছিস?”
-“ইশ্বরের সাথে। দেখোনা মা ইশ্বর আমার ঘুঘুটিকে চালু করে দিচ্ছে না!”
-“ছিঃ বাবা! ইশ্বরকে নিয়ে মিথ্যে বলতে নেই। গুনাহ হয়।” এই বলে শিশুটির মা শিশুটিকে হাত ধরে টেনে বাসায় নিয়ে যায়।

এইবার ইশ্বর কোন এক শিশুর আর্তনাদের শব্দ পেলেন। এগিয়ে গেলেন তিনি। বৃদ্ধ একলোক সাত বৎসরের এক শিশুর উপর চেপে বসেছে। শিশুটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে।
-“ছেড়ে দাও দাদু! আমার ব্যথা লাগছে!”

লোকটির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শিশুটির মুখ চেপে ধরে রাখে যাতে শিশুটি চিৎকার করতে না পারে। ইশ্বর হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। কোন শিশুর ওপর এরকম পাশবিক অত্যাচার কেউ করতে পারে এটা তার কল্পনার অতিত ছিল। তিনি দেখলেন লোকটি কাজ শেষে চলে গেল আর যাওয়ার আগে শিশুটিকে গলাটিপে হত্যাও করলো। ইশ্বর ভেবে পেলেন না তার কি করা উচিত। এমন সময় দূরে কোথাও হাসির শব্দ শোনা যায়।

কয়েকজন লোকের একটি জটলা দেখা যাচ্ছে। থেমে থেমে তাদের মধ্যে থেকে হাসির রোল উঠছে। ইশ্বর উঁকি দিয়ে দেখলেন একটি লোককে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে। থেমে থেমে তাকে লাথি, ঘুষি দিচ্ছে লোকজন। লোকটি ব্যথায় কুকড়ে যাচ্ছে আর তখনি হাসির শব্দ জোড়ালো হচ্ছে। কেউ একজন লোকগুলিকে নির্দেশ দিল,
-“এই শালাকে মাতব্বরের কাছি নিয়া চল। ওরে ইশ্বরের দেয়া বিধানে শাস্তি দেওয়া হবে।”

ইশ্বরের মনে করতে পারলেন না তিনি আবার কবে শাস্তির বিধান দিলেন! ব্যাপারটা দেখার জন্য উৎসুক হয়ে তিনি লোকজনের পিছু পিছু চললেন।

লোকজন যেখানে থামল সেখানে ইশ্বর আরো একটি জটলা দেখতে পেলেন। যেখানে একজন যুবক ও যুবতীকে একসাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। লোকজন বেশ উৎসাহ নিয়ে হইহুল্লোড় করছে কোন সুখকর কিছুর প্রত্যাশায়। কিছুক্ষণপর সবাই চুপ হয়ে গেল। ইশ্বর তাঁকিয়ে দেখলেন, এক বৃদ্ধ লোককে লোকজন সরে গিয়ে যায়গা করে দিচ্ছে নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করার জন্য। তিনি খেয়াল করলেন বৃদ্ধলোকটি সেই ব্যক্তি যিনি সাত বৎসরের শিশুটির উপর পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছিল।
পেয়াদা গোছের একজন বর্শা হাতে বৃদ্ধটির আগে আগে চলেছে লোকজনকে হটানোর জন্য।

-“এই সর সর! মাতব্বর সাহেব আসছেন!”
মাতব্বর আসন গ্রহণ করার পর কেউ তার কানের কাছে কিছু বলে। আর মাতব্বর কাউকে কিছু নির্দেশ দেয়।
কয়েকজন লোক বেঁধে রাখা যুবক, যুবতীকে মাতব্বরের পায়ের কাছে এনে ছুড়ে দেয়।
মাতব্বর সাহেব বলে উঠে,

-“তোরা কোথায় পেলি এমন দুঃসাহস? জানিস ব্যভিচারের শাস্তি কি?”
-“আমরা একে অপরকে ভালবাসি!”
-“ভালবাসা! নরকে গিয়ে রঙঢঙ করিস! এখানে এসব চলবে না।”
তারপর মাতব্বর সবাইকে উদ্দ্যেশ করে বললেন,
-“কাল মধ্যাহ্নে এই ব্যভিচারী যুবক-যুবতীকে পাথর নিক্ষেপ করে শাস্তি দেওয়া হবে।”
এরপর মাতব্বরের সামনে পরে আনা লোকটিকে হাজির করা হলো।
-“কি করেছে ও?” মাতব্বর জিজ্ঞেস করলেন।
-“হুজুর চুরি করেছে!”
-“ঠিকাছে একেও বেঁধে রাখো। এর হাতের আঙ্গুল কাটা হবে আগামীকাল সকালে!”
এরপর মাতব্বর চলে গেলেন।

মাতব্বরের রায় শুনে ইশ্বর তার মাথার চুল টানলেন। এটা তার বদঅভ্যেসের একটি। যখন তিনি খুব বেশি বিষন্ন হয়ে পড়েন তখন তিনি তার চুল টানেন। তিনি অনুভব করলেন তার কপালের শিরা দপদপ করছে। কিছুই কি করার নেই তার? নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি। কে উত্তর আসলো, না! অবশেষে বিষন্ন মনে ফিরতি পথ ধরলেন।

এক মুসাফির পথের পাশে একটি ঘুঘুছানাকে পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি ছিলেন একজন ডাক্তার। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন ঘুঘুছানাটি ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছে। পুকুর থেকে কয়েক আজল পানি ছিটিয়ে দিতেই ঘুঘুছানাটি উঠে বসল। একটুখানি দূরে ঘুঘুর ডাক শুনেই বুঝতে পারলেন আশেপাশেই কোথাও ঘুঘুর বাসা রয়েছে। কোন দুষ্ট ছেলে হয়তো ছানাটিকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। তিনি ছানাটিকে ঘুঘুর বাসায় রেখে দিয়ে প্রস্থান করলেন।

ইশ্বর ফিরতি পথে সব কিছুই দেখলেন। এরপর নিজেকে একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলেন। প্রথমে ঘুঘুছানাটিকে কে কেড়ে নিয়েছিল? ধর্ষনকারী কে? চোর কে? চোরের বিচারকারী কে? নৈতিকতার অবক্ষয়কারী কে? নিঃস্বার্থ পরোপকারী কে? সব কটি প্রশ্নের উত্তর, মানুষ। তাহলে, “আমার থেকে কি লাভ?” ইশ্বর ভাবলেন। অবসাদের পাহাড় তাকে ঘিরে ধরলো। অবশেষে তিনি আত্মহননে প্রবিষ্ট হলেন। কিছুক্ষণের জন্য ভুলতে সক্ষম হলেন যে, তিনি অবিনশ্বর।

৩ thoughts on “ইশ্বরের নশ্বরতা

  1. প্রথমে ঘুঘুছানাটিকে
    প্রথমে ঘুঘুছানাটিকে কে কেড়ে নিয়েছিল? ধর্ষনকারী কে? চোর কে? চোরের বিচারকারী কে? নৈতিকতার অবক্ষয়কারী কে? নিঃস্বার্থ পরোপকারী কে? সব কটি প্রশ্নের উত্তর, মানুষ। তাহলে, “আমার থেকে কি লাভ?” ইশ্বর ভাবলেন। অবসাদের পাহাড় তাকে ঘিরে ধরলো। অবশেষে তিনি আত্মহননে প্রবিষ্ট হলেন। কিছুক্ষণের জন্য ভুলতে সক্ষম হলেন যে, তিনি অবিনশ্বর।
    ঈশ্বর প্রকৃতই থাকলে উল্লেখিতি এ প্রশ্নগুলো তিনি নিজেকে অবশ্যই করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *