তৃষ্ণা

অতলা বেগম শ্যাওলা ধরা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে আছেন নিস্পলক। তিনি দেয়ালের সাথে লেপ্টে থাকা টিকটিকির সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করছেন। টিকটিকি হয়ত খাবারের খোজে ঘোরাফেরা করছিল দেয়ালের এই পাশটাতে। মনোবাসনা ব্যর্থ হওয়াতে টিকটিকিটি চলে যায় দেয়াল ঘেষে চোখের আড়ালে। অতলা বেগম আবারো একা হয়ে পড়েন। টিকটিকিটি চলে যাওয়াতে টিকটিকি ভাবনার সমাপ্তি টানতে হয় তার। ঘরটা যেন গুমোট ভাব ধরে থাকে হয়ত অশুভ কোন কিছুর আগমণের বার্তায়। অতলা বেগম পাশ ফিরে চোখদুটো বোজার চেষ্টা করেন। তিনি জীবনের চারটি যুগ পেরিয়ে এসেছেন চলন্ত বাসে ঝুলন্ত কোন মানবের মত। আরো একটি যুগ বাঁচতে চাওয়াটা তার অন্যায় হবার কথা নয়। কিন্তু তিনি আর বাঁচতে চান না। তার মনে স্মৃতিগুলোর নিশ্পেষন চলতে থাকে অবিরত।

অতলা বেগম বিছানা থেকে নেমে তার একমাত্র সম্বল কাপড় দিয়ে বাঁধা পুটলিটার কাছে গিয়ে দাড়ান। পুটলিতে কয়েকটি ছেড়া মলিন কাপড় আর একটি বিষের শিশি ছাড়া বিশেষ কিছু নেই। তিনি পুটলিতে হাত রাখেন। পুটলির চিরচেনা বাঁধনটাকে আজ বড় অচেনা মনে হয় অতলা বেগমের কাছে।
-ওখানে শিশিটা নেই। (ভরাট একটি শীতল কন্ঠের ঝংকারে ছোট্ট ঘরটা গমগম করে উঠে)
-কে? কে কথা কয়?
-আমি! ইশ্বর!
-ইশ্বর? ইশ্বর বলে কিছু নেই। থাকতে পারে না।
-তবুও আমি এসেছি।
-কেন এসেছেন?
-তোমার মৃত্যু ঠেকাতে! তুমি জানোনা আত্মহত্যা মহাপাপ?
-পাপ! বাহ! ইশ্বর সাহেব বাহ! সাত বৎসরে সেই শিশুটিকে এত শিঘ্রই ভুলে গেলেন? যেদিন বাবার বয়সী এক ভদ্দরলোক শিশুটিকে মুখ বেধেঁ তার পৌরষ্যত্ব জাহির করেছিল। শিশুটি অদম্য ব্যথায় কুকড়ে কুকড়ে যাচ্ছিল। প্রাণ ভরে চিৎকার পর্যন্ত করতে পারে নি। অবশেষে রাস্তার পাশে খড়কুটোর মত রকাক্ত দেহে মাটির বুকে পড়েছিল। সেদিন কোথায় ছিল আপনার পাপ পূণ্য? আর আপনিই বা কোথায় ছিলেন? জানোয়ারটা আমার মুখ বেঁধে রেখেছিল যাতে চিৎকার না করতে পারি। আমার অন্তর তো সেদিন সচল ছিল। আমি অন্তর দিয়ে মনে প্রাণে আপনাকে ডেকেছিলাম। কই আপনি সেদিন তো আসেননি? তারপর জীবনের তিনটি যুগ ধরে মুখোশধারী জানোয়ারদের থাবায় নিজেকে সপে দিয়েছি। বারবণিতা হয়েছি! এখন আমার রূপের জৌলুস নেই। গতরটা জং ধরে গেছে। চাইলেও আর শরীরটা বিকোতে পারি না। তাইতো আত্মহত্যায় অগ্রসর হয়েছি। আর আপনি এসেছেন আমার মৃত্যু ঠেকাতে? আপনি চলে যান! আপনাকে আমার দরকার নেই। যাবার সময় শিশিটা দিয়ে যাবে দয়া করে। (অতলা বেগম এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে মেঝেতে বসে পড়ে হাপাতে হাপাতে)
-ভূল বোঝনা! আমি সব সময় চাইলে আসতে পারি না।
-এ কেমন কথা ইশ্বর সাহেব? আপনি না সর্বশক্তিমান?
-হুম! আমি সর্বশক্তিমান। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাকে নিশ্চুপ ভূমিকা নিতে হয়!
-কেন? সংখ্যালঘুরা যাতে করে পরে পরে মার খেতে পারে সেজন্য?
-চুপ করো মেয়ে!
-কেন চুপ করবো? আপনাকে যারা তৈরী করেছে আপনাকে তাদের ইচ্ছাঅনুসারেই চলতে হয় বলে? তাদের ইচ্ছাতে চলতে চলত আপনি আপনার স্বকিয়তা হারিয়ে ফেলেছেন বলে?
-আমাকে আবার কারা তৈরী করলো? আমাকে কেউ তৈরী করেনি। অামি অক্ষয়! ছিলাম আছি থাকব!
-মিথ্যা কেন বলেন ইশ্বর সাহেব? বুক হাতে দিয়ে বলুত তো আপনাকে জুলুমবাজ, অত্যাচারী, ধর্ষনকারীরা তৈরী করেনি?
-খামোশ! আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই!
-তাহলে আপনি চলে যান!
-অামি যাচ্ছি! তুমি আত্মহত্যায় লিপ্ত হও তোমাকে আর বাঁধা দেব না! তবে মনে রেখো তোমাকে অনন্তকাল ধরে নরকের শিখায় জ্বলে পুরে মরতে হবে।

একটানা কথা বলতে বলতে অতলা বেগমের গলাটা শুকিয়ে গেছে তৃষ্ণায়! তিনি শিশিটা হাতে তুলে নেন। এক শিশিতে তার তৃষ্ণা মিটবে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *