জমির উর্বরতা হ্রাসে অশনি সংকেত

এককালে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের মাটি ছিল‌ শস্য বান্ধব, উর্বর – পৃথিবীর বুকে বিধাতার অফুরন্ত করুণাবারিতে সিক্ত এক শস্যভান্ডার, সীমাহীন উর্বরতায় ধন্য দেশ। কিন্তু উদ্বেগজনক হলেও সত্য, সময়ের বিবর্তনে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জমিতেই আজ জৈব উপাদানের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনসহ এদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কৃষির অপরিকল্পিত নিবিড়করণ, অপরিকল্পিত শস্য আবর্তন ছাড়াও নানা উচ্চফলনশীল শস্যের চাষ বৃদ্ধি পাওয়াতেই মাটিতে জৈব উপাদানের এ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফসল উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই মাটিতে জৈব সার রিসাইক্লিং (পুনঃব্যবহারযোগ্য) হচ্ছে না বরং ক্ষয় হচ্ছে বেশি। গাছের পুষ্টি ধরে রাখা জৈব পদার্থই মাটির প্রাণ। বর্তমানে অজৈব রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, সবুজ সার, কম্পোস্ট ইত্যাদি সঠিকভাবে পচিয়ে প্রতি শতাংশ জমিতে ১০ থেকে ২০ কেজি করে প্রয়োগ করলে ধীরে ধীরে উর্বরতা ফিরে পাবে মাটি। কারণ জৈব সার মাটির উন্নত গঠন নিশ্চিত করে, মাটিতে বায়ু চলাচলের পরিমাণ ও পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখে। এসআরডিআইয়ের বিজ্ঞানীদের মতে, গত এক দশকে দেশের কৃষি জমিতে জৈব উপাদান কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। ফসল উৎপাদন ঠিক রাখতে মাটির জৈব উপাদান শতকরা সাড়ে তিন শতাংশ থাকার কথা থাকলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের জমিতে এ উপাদান এখন এক বা এর নিচে। ফলে মাটি উর্বর রাখতে যে অণুজীব কাজ করে তা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে জৈব সারের গুণগত মান ঠিক রেখে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। সেই সঙ্গে তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করে জৈব সারের গুণগত মান নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। সার্বিক সচেতনতার অভাব এবং মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে প্রচলিত শস্য আবর্তনের ধারা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে অপরিকল্পিত কৃষি নিবিড়করণের আওতায় উচ্চফলনশীল জাতের শস্যের আবাদ বৃদ্ধিই মাটিতে জৈব উপাদানসহ নানা পুষ্টি-উপাদান ঘাটতির অন্যতম কারণ। মাটির উর্বরতা হ্রাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় কৃষি উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে জরুরী ভিত্তিতে কয়েকটি সময়োপযোগী উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে – শস্য আবর্তনের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ, মাটি পরীক্ষা করে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সুষম মাত্রায় জৈব সার প্রয়োগ, পরিকল্পিত কৃষি নিবিড়করণ, উফশী ফসল উৎপাদনে সঠিক নির্দেশনা মেনে চলা ইত্যাদি। তাহলেই আমাদের কৃষির বৈপ্লবিক উত্থান অব্যাহত থাকবে – নিশ্চিত হবে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *