জঙ্গিবাদ ও আজকের পৃথিবী

বিশ্ব জঙ্গিবাদ মানবসমাজকে
ঠেলে দিতে চাইছে এমন একটি
অন্ধকার সময় ও স্থানের দিকে,
যেখানে গণতান্ত্রিক সমাজের
ধারণাগুলো বিলুপ্ত। যেখানে
বিশ্বজনীন নিয়মনীতি সম্পূর্ণ
বিধ্বস্ত। সেটা তারা করতে চাইছে
সমাজ কাঠামোতে ভাঙন ধরিয়ে
চতুর কৌশলে মানবসমাজে বিভাজন
সৃষ্টির মাধ্যমে। সভ্য মানুষের
বিশ্বাস, সংস্কার কিংবা আচার-
আচরণের মূলে কুঠারাঘাত দিয়ে
ভয়াল বিপর্যয় ঘটিয়ে নিত্যনতুন নির্মম
সন্ত্রাস, অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ড ও
অরাজক পরিস্থিতিতে অসহনীয়
পারিপার্শ্বিকতা তৈরি করে।
যাতে নাগরিক মানুষের মনে সন্দেহ,
সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি হয় এবং
সুশীল সমাজে স্বাধীনতা ও সাধারণ
মানুষের বাঞ্ছিত জীবনযাত্রা
বিঘ্নিত হতে হতে সামাজিক
পরিবেশজুড়ে নেমে আসে
মৃত্যুশীতল বিপর্যয়। কেননা সমাজবদ্ধ
মানুষের সুস্থ চেতনাই মানব
সভ্যতাকে এগিয়ে দেয় সুস্থতর
ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে। মানুষকে
করে তোলে মানবিক গুণাবলির
আদর্শের ধারক।
এ মাসের প্রথম দিকে রাজধানীর
গুলশানের আর্টিজান রেস্টুরেন্টে
হয়ে গেল জঙ্গি হামলা। দেশি ও
বিদেশিসহ ২৬ জনের প্রাণ বিপন্ন হয়
এই হামলায়। ঈদের দিনও
কিশোরগঞ্জে একই কায়দায় হামলা
হয়। জঙ্গিবাদ দেশি ও বিদেশি উভয়
রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই
আতঙ্কে আতঙ্কিত। বিদেশি
জঙ্গিবাদ বা টেরোরিজম বর্তমান
বিশ্বের এক জটিল বাস্তবতা। তাই
এখন যৌক্তিক কারণেই জগতের
অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি
জঙ্গিবাদ নিয়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ
গুরুত্ব পাচ্ছে। এর সূত্র ধরে ও বিভিন্ন
বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে
জঙ্গিবাদের নানা শ্রেণিবিভাগও
তৈরি হয়েছে। যেমন সাইবার,
নারকো, নিউক্লিয়ার, বায়ো,
রাজনৈতিক, সেপারেটিস্ট, ধর্মীয়
জঙ্গিবাদ ইত্যাদি।
গুলশানের হামলায় অংশ নেয়া সবাই
বয়সে উঠতি যুবক, ধনিক শ্রেণির
পরিবারের সন্তান। পড়াশোনাতে
তারা ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। এই
তরুণরা কেন বিপথগামী? কীভাবে
আত্মঘাতী পথে পা বাড়ালো,
নেপথ্যের কারণই বা কী?
বাংলাদেশে কী আইএস আছে?
তবে হঠাৎ করে কেন আবার এই
জঙ্গিপনা নাড়া দিয়ে উঠল?
বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠীর
রয়েছে বিভিন্ন রূপ। আইএস আছে কী
নাই সেটা নিয়েও নানান প্রশ্ন,
সরকারও এ নিয়ে দ্বিধাদ্ব›েদ্ব
আছে। জঙ্গিদের প্রাথমিক উত্থান
আনুমানিকভাবে নব্বইয়ের দশকে
হয়েছে বলে আমরা জানি। নব্বইয়ের
দশকে দেশের বিভিন্ন উপশহর ও কিছু
শহরের অলি-গলির দেয়ালে একটি
স্লোগান দৃশ্যমান ছিল। তাতে
লেখা হতো ‘আমরা হবো তালেবান
বাংলা হবে আফগান।’ তখন
প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন ছিল। রমনা
বটমূলে উদীচী সাংস্কৃতিক মঞ্চে
বোমা হামলা দিয়ে শুরু হয় জঙ্গিদের
পথচলা। ২০০০ সালের পর এ পর্যন্ত
কোনো স্লোগান বা কোনো
ধরনের বক্তব্য দেয়ালে লেখা
দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন নামের
জঙ্গিগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান। এ
বিষয়ে কোনো মৃত্যু বা সহিংস
আক্রমণের পরেই আমরা তা জানতে
পারি। তবে সব গুপ্তহত্যার পেছনে
জঙ্গিগোষ্ঠী দায়ী কিনা এ বিষয়ে
নিশ্চিত নয়। ২০০২-০৩ সালে
জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ
(জেএমবি)-এর নেতা ‘বাংলা ভাই’
সংবাদমাধ্যমে একটি বহুল আলোচিত
বিষয় ছিল। তৎকালীন জোট সরকার
এদের নির্মূলে সমর্থ হয়। এরপর জঙ্গি
তৎপরতা বন্ধ ছিল।
পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ সৃষ্টির প্রধান
কারণগুলো কোন পরিস্থিতিতে
তৈরি হয়, তার ব্যাখ্যা অনুসন্ধান
করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে
অপরাধ জগতের অজস্র তথ্যবৃত্তান্ত।
যেখানে সন্ত্রাস সংঘটনকারীদের
পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায়
এনে তাদের জঙ্গিবাদী কার্যকারণ
সম্পর্ক মেলাতে রীতিমতো হিমশিম
খাচ্ছেন সন্ত্রাস বিশ্লেষকরা। আর
সে জন্যই জিজ্ঞাসা জেগেছে,
বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদের এই
বিপুল উত্থান কিসের কারণে? সে
কি দারিদ্র্যের কশাঘাত, ধর্মীয়
উন্মাদনার যুক্তিহীন উন্মেষ,
রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কুটিল
অভিপ্রায়, বিপ্লবী বাসনা, মানসিক
নাকি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে
অবরুদ্ধ বিদ্রোহে?
অনেকে আধুনিক জঙ্গিবাদের মূল
কারণকে রিলিজিয়াস ফ্যানাটিজম
বা ধর্মীয় উন্মাদনার বিস্তার বলে
বিশ্বাস করেন। ধর্মীয় উগ্রতা
জঙ্গিবাদের পরিবেশ সৃষ্টিতে অনুক
‚ল ভূমিকা তৈরি করতে অবশ্যই সহায়ক
হয়। কিন্তু সেটাই কি শুধু মূল কারণ?
পৃথিবীর নানা ধর্মমতে এমন অজস্র
অনুসারী রয়েছেন, যারা নিজেরা
ধর্মান্ধ হয়েও কোনো ধরনের সহিংস
নীতির প্রতি মোটেই বিশ্বস্ত নন।
সাম্প্রতিককালে বিদেশি নাগরিক
ছাড়াও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের
ধর্মযাজক, হিন্দু পুরোহিত পুলিশ
সুপারের স্ত্রী ও ব্যবসায়ীকেও
হত্যা করা হয়েছে। ৭ জুন প্রকাশিত
খবরের যে লেখচিত্র পাওয়া যায়
তার মধ্যে প্রো-আলকায়েদা দল,
অর্থাৎ আনসার আল ইসলাম ৪৭ জন
নিহত ব্যক্তির মধ্যে মোট আটটি
হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
অন্যদিকে প্রো-আইএস গোষ্ঠী ২৮
জনের দায় স্বীকার করে। এদের
শ্রেণিবিন্যাসে দেখা যায়
প্রথমোক্ত গোষ্ঠীর চিহ্নিত
ব্যক্তিরা হলেন মুক্তমনা, ব্লুগার ও
সমকামিতা সমর্থক। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর
হাতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে
পুরোহিত ও ধর্মযাজক, বিদেশি ও
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন।
অতীতেও আইএসআইয়ের
কর্মকাণ্ডের কথা শোনা গিয়েছিল।
এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোসাদ।
জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি অর্জন,
তাদের পরিপুষ্টি লাভের পেছনে
সর্বদাই যে দেশীয়ভাবে রাষ্ট্রীয়
শক্তির সমর্থন থাকে, তা নয়। তবে
বাস্তব সত্য হলো, অর্থনৈতিক
অভিপ্রায় নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা
দখলের লোভ থেকে একটি
সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের মধ্যেই যেমন
ছোট ছোট জঙ্গি সংগঠনের জন্ম
হচ্ছে, তেমনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে
প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক
পর্যায়ে শক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য
নিয়ে অথবা এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
অপর রাষ্ট্রের প্রতিহিংসা
চরিতার্থের উপায় হিসেবে এখনো
কিছু কিছু রাষ্ট্র পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ
সহযোগিতায় এদের সৃষ্টি করে
যাচ্ছে আর্থিক ও নৈতিক
সহযোগিতায় সমর্থন জুগিয়ে। কেননা
বর্তমান জঙ্গিবাদ রাজনৈতিক
আন্দোলন কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্য
বিস্তারের জন্য লক্ষ্যে
পৌঁছানোর এমনই এক মোক্ষম অস্ত্র,
যা ছায়াযুদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে
সরাসরি সৈন্য নামিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার
পরিবর্তে। তাই সর্বজনীনভাবে
বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা থাক কিংবা
না-ই থাক, জঙ্গিদের আইনবহির্ভূত
অনৈতিক কর্মধারা থেমে নেই
একেবারেই। বরং বিজ্ঞান ও নব্য
প্রযুক্তির নিত্য নতুন দিক উন্মোচনের
পাশাপাশি জঙ্গিদের জঙ্গিত্ব
সৃষ্টির অভিনব সব কৌশলপদ্ধতি
বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এগিয়ে চলেছে
অপ্রতিহত প্রতিযোগিতার সুনির্দিষ্ট
পথ ধরে। রোবোটিক, জেনিটিক,
নিওরোসায়েন্স,
বায়োটেকনোলজির আবিষ্কার
যেমন অব্যাহত অগ্রগতিতে আমূল
বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনধারা
আর বিচিত্র জীবের পৃথিবীকে,
তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে
আন্ডারগ্রাউন্ডে সন্ত্রাসীরাও
তাদের জঙ্গিবাদে জাগিয়ে তুলছে
নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা।
জঙ্গি মানসিকতা নিশ্চিতভাবেই
সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষের এমন এক
সাইকোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য, যা
শক্তিমান প্রভাবশালীদের কাছ
থেকে আর্থিক, নৈতিক, আদর্শগত ও
আইনগত আনুক‚ল্য লাভ করে
মানবসমাজের ভিন্ন ভিন্ন
পরিবেশে এবং পরিস্থিতিতে
একেকভাবে বাস্তবতা পায়।
বাস্তবে তার সক্রিয় প্রকাশ তখনই
ঘটে, যখন সেই মনস্তত্ত্ব দেশীয়
শক্তি অথবা আন্তর্জাতিক মহলের
রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক
কিংবা ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের
উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। তাই দেহ-
মনের বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির পেছনে
যেমন কার্যকারণ সম্বন্ধ খুঁজে
সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দান
করা চলে, জঙ্গিবাদকে সব
ক্ষেত্রেই সেভাবে বিশ্লেষণ করা
যায় না। জঙ্গিবাদের বৈজ্ঞানিক
কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ও তাই অনেক
সময়ই সম্ভব হয় না। যা-ই হোক, সন্ত্রাস
নির্মূলের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও
সন্ত্রাসবাদের বিপুল উত্থানে
বিশ্বের মধ্যে তৈরি হয়েছে আরো
একটি বিশ্ব। তার নাম জঙ্গি বিশ্ব।
কারণ, জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলো
বিশ্বজুড়ে এত বেশি দ্রুতগতিতে
বৃদ্ধি করে চলেছে তাদের সদস্য
সংখ্যা, তার প্রভাব পৃথিবীর প্রতিটি
কোণেই আলোড়ন তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *