পাহাড় মানেই কি শুধুই পর্যটনঃ প্রচলিত গণমাধ্যম ও আমাদের ভাবনা


গত কিছুদিন ধরেই দেশের প্রথম সারির একটি অনলাইন পত্রিকা Banglanews24.com পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন দিয়েই যাচ্ছে। অনেকে হয়তো মনে করবেন, পাহাড়ের বর্তমান যে অচলাবস্তা চলছে, বিভিন্ন সমস্যার সূত্রপাত হচ্ছে এ নিয়ে প্রতিবেদন করা হচ্ছে।
কিন্তু, এসব কোন কিছুই নয়। এই মাধ্যমে এসব খবর কোনদিন এসেছে বলে চোখে পড়ে নি। তাই পাহাড় নিয়ে যখন এই মাধ্যমটি টানা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তখন তা আমাদের সবার নজরে আসবেই, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আশ্চর্যের সাথে লক্ষ্য করা গেল যে, পাহাড়ের সমস্যা নয়, বরং পাহাড় যে খালি সৌন্দর্য আর রূপের আধার তা খুঁজে পেলাম!!!
তার মানে কি পাহাড় মানেই পর্যটন? পাহাড় মানেই উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি আর তার সাথে মেঘের খেলা?? অথচ, পাহাড়ের রয়েছে সংগ্রামের দীর্ঘ এক ইতিহাস, হারানোর ইতিহাস, সবকিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার ইতিহাস। কিন্তু কোই? কোন প্রতিবেদনেই তো চোখে পড়লো না এসব!!
গত ১৭ অক্টোবর, এক প্রতিবেদক লিখেছেন “ইউরোপ-আমেরিকাকেও পায়ে ঠেলবে রাঙ্গামাটির লংগদু”। প্রতিবেদনের শুরুতেই তিনি লিখেছেন কাকডাকা ভোরের হালকা শারদীয় কুয়াশায় সেনানিবাস এলাকা থেকে অটোরিকশায় রিজার্ভবাজার লঞ্চঘাট।

তিনি এখানে শুরুতেই বলে দিয়েছেন যে, তিনি উঠেছিলেন সেনানিবাস এলাকায়। নিশ্চয়ই ভালো আতিথেয়তাও পেয়েছেন। তাই তিনি কিভাবে বলবেন যে, লংগদুতে ১৯৮৯ সালের সেনা-সেটেলারদের দ্বারা পাহাড়িদের উপর গণহত্যার কথা? তিনি বলেননিও। বরং চোখে দেখেছেন খালি কাপ্তাই লেক আর লংগদুর সৌন্দর্য। তাদের কথায় উঠে আসবে না এই লংগদুতে পাহাড়িদের জমিতে সেটেলারদের অবৈধ বসতি ও বসবাস। তাছাড়া, তিনি তো গিয়েছিলেন সৌন্দর্য দেখতে, পাহাড়িদের কষ্ট-ইতিহাস দেখতে নয়। তাই প্রতিবেদনে এসব থাকার কথাও নয়।

“চুম্বকের মতো পর্যটক টানবে চিম্বুক পাহাড়” এই শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। প্রতিবেদক যেখানে ঘুরতে গিয়েছিলেন সেই চিম্বুক পাহাড় আগে কাদের ছিল? এখন কাদের হয়েছে?? জানিয়ে রাখি ২০০৫-০৬ সালের দিকে চিম্বুক পাহাড়ের বেল্টের চারটি বড় পাহাড় সুয়ালক, ভাগ্যকুল, টংকাবতী ও কদুখোলা থেকে ৭৫০টি ম্রো পরিবারকে খেদিয়ে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার একর জমি দখল করে বানানো হয়েছে চিম্বুকের বর্তমান পর্যটনকে। আর প্রতিবেদক লিখেছেন সেখানে বানানো হোটেলের রুম সার্ভিসের বর্ণনা!!! চিম্বুক পাহাড়ের পর্যটনের সম্ভাবনার কথা বারবার উঠে এসেছে কিন্তু এর ফলে উচ্ছেদকৃত পাহাড়ি ম্রোরা কোথায় গিয়েছে সেটা জানা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।
সাজেক যাওয়ার পথে হাজাছড়া ঝরণারও কত রূপের কথা শুনলাম। কিন্তু সেখানে কি ধরণের অবস্থা এটি প্রতিবেদক জানবেন কিভাবে? এই বছরের মাঝামাঝি সময়ে একদল পাহাড়ি ছেলে-মেয়ে সেখানে ঘুরতে গিয়েছিল। ঝরণায় গোসল করার সময় পাহাড়ি মেয়েদের শরীরে কাপড় লেপটে যায়। এরপরই সেটেলারের দল শুরু করে তাদের কর্মকান্ড। মেয়েদের গা ঘেঁষে দাড়িয়েঁ ইঙ্গিত করা, মেয়েদের ভেজা শরীরের ছবি তোলা থেকে শুরু করে আরো বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে শুরু করে। এরপর পাহাড়ি ছেলেরা একে প্রতিরোধ করতে গিয়ে মারামারি ঘটে এবং পরে আর্মি গিয়ে দোষী সেটেলারদের কিছুই না করে পাহাড়ি ছেলেদের মারতে শুরু করে এবং পরে কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এই হাজাছড়া বর্তমানে এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর প্রতিবেদকগণ এর রূপ নিয়েই ব্যস্ত। তিনি আর কি করবেন? তার কাজ তো শুধু রূপের বর্ণনা দেয়া, সমস্যা দেখা নয়।
এভাবে আরো বিভিন্নভাবে পাহাড়ের পর্যটনকে প্রোমোট করতে শুরু করে বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর। যেখানে প্রতিনিয়তই সংঘাত চলে, সেখানকার রূপ নিয়ে শুধু প্রতিবেদন কিসের ইঙ্গিত দেয়?? যে সাজেক নিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত, প্রতিবাদ-আন্দোলন হয়েছে, সেই সাজেক নিয়ে বারবার প্রতিবেদন দেয়া কিসের ইঙ্গিত দেয়???

এই বছরের ফ্রেব্রুয়ারি মাসের দিকে এক সেটেলার মোটরসাইকেল চালকের মিথ্যা নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় বিভিন্ন পরিবহনে সেটেলাররা পাহাড়ি যাত্রীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করে। যদিও ঘটনাটির সত্যতা বেরিয়ে আসে এবং কথিত নিখোঁজ মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধেই মামলা করে পুলিশ। কিন্তু সত্যতা জানার আগেই পাহাড়িদের দায়ী করে মারধর করাটা কতটুকু সমীচীন? আর এ নিয়ে কোন গণমাধ্যমেই কোন খবর প্রকাশিত হচ্ছিল না। তাই আমাদের বারবার তথ্য সংগ্রহের জন্য ফেইসবুকের দ্বারস্ত হতে হচ্ছিল। তখন বাংলা নিউজের একজন সাংবাদিক ফেইসবুকে পোস্ট করেন যে, কেন আমরা পাহাড়িরা বারবার মিথ্যা তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি? কেন বস্তুনিষ্ঠ কোন মাধ্যমের দ্বারস্ত হচ্ছি না?? কিন্তু তখন তার নিজের মাধ্যম ও অন্যান্য কোন সংবাদমাধ্যমেই খবর প্রকাশ হচ্ছিল না। এমনকি এই ধরণের কোন কিছু ঘটছে তারও কোন আভাস দেয়া হচ্ছিল না?? তাই কিভাবে আমরা এই মাধ্যমগুলোর উপর ভরসা করতে পারি??
আজ বাংলা নিউজ সংবাদমাধ্যমটি পর্যটন নিয়ে প্রতিবেদন লিখে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে চাইছে যেন পাহাড়ে ঘোরার আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু শুধু কি পাহাড়ে ঘুরলেই সব দেখা হয়ে যায়??? পাহাড় নিয়ে যেহেতু ভালোই বিজ্ঞাপণ করছেন সেহেতু আপনাদেরও দায়িত্ব শুরুতেই পর্যটন স্থানগুলোর সাথে সাথে এর সাথে সংশ্লিষ্ট পাহাড়িদের জীবন-জীবিকা, তাদের সংগ্রাম, তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা বলিয়ে ওরিয়েন্টেশন করানো। কিন্তু তাদের দায় তো শুধুমাত্র কিভাবে যাবেন, কিভাবে খাবেন, কিভাবে ঘুমাবেন এসব পর্যন্ত। কারণ, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর দৌড় এদ্দুর পর্যন্তই। তাদের কাছে ব্যবসাই বড়, মানুষ নয়।

আর এসব সংবাদমাধ্যমের যেখানে উচিত সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরা সেখানে তাদের চলে লুকোচুরির খেলা। কিসের প্রয়োজন সাধারণ পাহাড়িদের কথা বলার?? কিসের প্রয়োজন সাজেকের ছোট ছোট বাচ্চাদের চকলেটের লোভ দেখিয়ে হাততালি দেয়া যে রেসিস্টের পর্যায়ে পড়ে, এসব শিশু নিজের অজান্তেই যে Human Safari র ভুক্তভোগী হয়ে যাচ্ছে এসব কথা বলার??? বরং মিথ্যাকে সামনে এনে সত্যকে আড়ালে নিয়ে যাওয়ার যে প্রচেষ্টা এসব গণমাধ্যম করে যাচ্ছে সেটা লজ্জাকর সাংবাদিকতার জন্য এবং অমানবিকতার জন্য।
এতকিছু বলা হলো, আমাদের সাংবাদিক মহোদয়গণের কি কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবে? চোখে রঙিন চশমা খুলে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে পাহাড়কে তাকিয়ে দেখবে?? পাহাড়িদের পণ্য নয়, মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করবে?? পাহাড়ের কষ্টকে তুলে আনার চেষ্টা করবে???

করবো না, কারণ পাহাড়ের প্রেসক্লাবগুলো হলো সংবাদমাধ্যমের কবরখানা। আর্মি-প্রশাসন থেকে যাই বলা হবে তাই তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসবে। তাই তো, তারাও মনের সুখে ক্যান্টনমেন্টে আরামে নিদ্রা গিয়ে পরের দিন প্রতিবেদন লিখতে বসে যান। আর ভূমি সমস্যার, পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান, আর নতুন করে বাপেক্সের তেল-গ্যাস খোঁজার নামে দেড় হাজার বর্গকিলোমিটার জমি দখলে নেয়ার পাঁয়তারা এসব কোন কিছুই তাদের চোখে পড়বে না।

হায় সাংবাদিকতা!! হায় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম। ধিক, ধিক, ধিক।

৭ thoughts on “পাহাড় মানেই কি শুধুই পর্যটনঃ প্রচলিত গণমাধ্যম ও আমাদের ভাবনা

  1. পৃথিবীর সবদেশগুলোতে যেখানে
    পৃথিবীর সবদেশগুলোতে যেখানে পাহাড়ি এলাকা আছে, সেখানেই পর্যটন ও পাহাড়ে উঠা (travelling, trekking, mountaineering) কে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচার (promote) করা হয়। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আপনি নেপাল, ভারত, আমেরিকা, স্ক্যানডিনেভিয়ার পাহাড়ি এলাকাগুলোর টিভি বিজ্ঞাপন ও নেট বিজ্ঞাপনগুলো দেখুন।

    1. তাইতো বলছিলাম এসব সাংবাদিকদের
      তাইতো বলছিলাম এসব সাংবাদিকদের ধিক।
      পর্যটন নিয়ে সিরিজের পর সিরিজ প্রতিবেদন দেয়া যায় কিন্তু পাহাড়ের সমস্যাগুলোর কথা, বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের কথা নিয়ে প্রতিবেদন আসে কি?? এসব মাধ্যমে তো এগুলো দেখাও যায় না।

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. পৃথিবীর সবদেশে পাহাড়ি
    পৃথিবীর সবদেশে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পর্যটন ও আহরনব্যবসা (travelling, trekking, mountaineering) কে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচার ও প্রনোদনা (promotion) দেওয়া হয়। এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। নেপাল, ভারত, আমেরিকা, স্ক্যানডিনেভিয়া ইত্যাদি দেশগুলোর টিভি চ্যানেল ও নেটভিত্তিক বিজ্ঞাপনগুলো দেখুন।

  3. সাইট সমস্যার জন্য মন্তব্য
    সাইট সমস্যার জন্য মন্তব্য পোস্ট করলে তা দেখায় না, তাই বারবার পোস্ট করতে হয়। সাথে লেগে আছে 503 server error. ইস্টিশনের আগে ঘর সামলানো দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *