কালো মেয়ে


বাংলাদেশে কালো মেয়েদের কি বলে ডাকে?আপনি হয়তো বলবেন মায়াবতী। মায়াবতী বললেও রুপবতী কিন্তু বলেনা। খেয়াল করে দেখুন মায়াবতী বলা হলেও তা খুব খুশি হয়ে বলা হয়না, কোথায় যেনো একটা করুণা করা হয়েছে বলে মনে হয়। নাটকে, সিনেমায়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়, সংবাদ পাঠে- সব জায়গায় কিন্তু ফর্সা মেয়ে। গায়ের রঙ ফর্সা না অথচ খুব যোগ্যতা রাখে এই সকল বিষয়ে, এমন কেউ কালেভদ্রে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে দেখেছেন কি?

একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে আর একজন লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে কালো মেয়ে আসলে কেমন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালো রঙকে গ্লোরিফাই করে লিখেছিলেন- ” কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” অথচ তার উপন্যাসের নায়িকাদের গায়ের রঙ কি আসলেই কালো ছিল? রবীন্দ্রনাথের চোখে কালো রঙের অর্থ কি দাঁড়ায়।
অনেকে বলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আগের মানুষ,তার সমাজ অন্যরকম ছিল, চিন্তাজগত অন্যরকম ছিল। সেই সমাজ আর বর্তমানকালের মধ্যে অনেক তফাত।
তাহলে কাজী নজরুল ইসলামের সেই সংগীত, ‘‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়, দেখে যা আলোর নাচন।” অথবা শামসুর রাহমানের “কালো মেয়ের জন্যে পংক্তিমালা” যা বার বার পড়লেও তৃপ্তি মেটেনা। সবটাই কি তাহলে তুচ্ছ ছিল?

আচ্ছা নিরপেক্ষ ভাবে দেখুন তো, ঘুম ভেঙ্গেই কোনো কৃষ্ণকলিকে পাশে শুয়ে থাকতে দেখলে আপনার কেমন লাগবে? গভীর আবেগে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারবেন ?
সমুদ্রতটে বসে কোনো কৃষ্ণ সুন্দরীর চোখে চোখ রেখে আবেগ ভরা কথা ভাবতে পারবেন ? যদি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর ‘ হ্যাঁ ‘ হয় তাহলে আপনি আসলেই প্রেমিক ! একজন বর্ণ গবেষক প্রেমিক হতে পারে না।

আমাদের সমাজে কালো মেয়ে জন্মাতে না জন্মাতেই তার গায়ের রঙের কারণে হীনমন্যতায় ভুগতে হয়। রবীন্দ্রনাথের যুগ না হয় বাদ দিলাম,এই একুশ শতকেও গায়ের রং কালো হলে “মেয়ের বিয়ে কী করে হবে, একে আদো পার করা যাবে কি যাবেনা ” এই ভাবনায় কাহিল হতে হয় বাবা-মা-কে। জন্মের পর থেকেই এক অসমাপ্ত যুদ্ধ চলে মেয়েকে ফর্সা করার পেছনে। কাঁচা হলুদ, দুধের সর, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী, শত রকমের এইবাটা সেইবাটা – এর কোনো শেষ নেই।হাজার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয় কাল রঙের চামড়ার আরালে।

ভেবে দেখেন, এই পিতাই যদি তার কন্যার কালো কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, “নীল রঙের শাড়ি পরলে আমার ব্ল্যাক প্রিন্সেসটাকে জলপরীর মতো লাগে ।” এই মা যদি তার কালো মেয়েকে বলতেন ” ঝিলের টোল-খাওয়া পানির মত তার মায়াময় মুখ।” তাহলে মেয়েটা হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অকারণেই বিষণ্ণ হতো না! বিষণ্ণ জলপরী হয়তো আট-দশটা মেয়ের মত বেড়ে উঠতো।

ভালবাসা যে দিতে জানে সে কেনো ভালবাসা পাবেনা। সারাটি জীবন “কালো মেয়ে” নামক এক জল ছাপ পিঠে লাগিয়ে অন্যকে ভালবেসে গেছে হয়তো একটু ভালবাসার দৃষ্টি তার উপরে কেউ রাখবে বলে। হয়তো বলা হয়না তার মুখ ফুটে, সমাজ তাকে শিখিয়েছে,দেখিয়েছে – এত বঞ্চনা, এত লাঞ্ছনা। তবু সে ভালবাসে।ফেরার পথে ভালবাসার সেই বেকার মানুষটির হাতে যখন দুটো পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বলে- “সিগারেটটা কম খেয়ো !” তখন দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই সেই মায়াময় চেহারাটাকে অগ্রাহ্য করার।

একটা কথা মনে পরে গেল-

“অন্ধকারে একটা সুন্দরী মেয়ে যেমন
কালো মেয়েও তেমন,
পার্থক্য টা শুধু আলতে”

কথাটা যেনো কে বলেছিল??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *