অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০৪

গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার ‘সাবি’র প্রস্তাব কেন যেন অমোঘ সত্যের মত মনে হয় অমৃতার কাছে। বলে – “চল সাবি, আমরা গঙ্গার ঘাটে যাই”! রোবটগুলো ওদের মনের ভাষা আগাম বুঝে তৈরি করে রাখে ত্রিশ শতকের গঙ্গার পথঘাট। সে পথে হাঁটতে থাকে সাবি, হাঁটতে থাকে অমৃতা। সন্ধ্যা নামে গঙ্গাতীরে পৌঁছতে দুবোনের। সন্ধ্যা নামে মির্চারও গঙ্গাতীরে ফিরতে। কে যেন তাকে টেনে নিতে থাকে গঙ্গার সেই পরিচিত গাছ-গাছালি ঘেরা জলসিঁড়ির ঘাটে, সেখানে প্রতিনিয়ত বসতো তারা বৈকালিক গোধূলি লগ্নে। অমৃতা বিচ্ছেদের কাল্পান্তরে পুড়তে পুড়তে কয়লা হওয়া হৃদয়টা ধুতে নামে গঙ্গার পবিত্র জলে এবার। কষ্টজীবনের অহোরাত্রির রক্তস্নানে ভেসে-ভেসে মির্চা সত্যিই পৌঁছে যায় গঙ্গার সেই পরিচিত পুরনো ঘাটে, যেখানে সাবি আর অমৃতা ভরা চাঁদজ্যোৎস্নায় গঙ্গাস্রোতের দিকে তাকিয়েছিল দূর নীরিক্ষণে। ড. সেনের রূঢ়তার দহনে মূঢ় মানবিক বোধ আর মৃত প্রেমিকার শবদাহের যন্ত্রণা ঝেড়ে সত্যিই অমৃতার সামনে দাঁড়ায় সন্ন্যাসীরূপী মির্চা। অকিঞ্চন প্রেমের অমিয়ধারা-স্রোতের মাঝে মির্চাকে দেখে স্থিতধি অমৃতা বলে, “সন্ন্যাস জীবন কেন বেছে নিলে মির্চা? এ জীবন কি তোমায় মানায়”? স্তিমিত রক্তের দলিত লাভার মত মির্চা বলে – “তোমার বাবাইতো আমায় সন্ন্যাস জীবন দিয়েছে অমৃতা”।

রূপোলি জ্যোৎস্নাজলের চাঁদোয়া আলোতে এবার ৩০১৬-র চেতনায় উদ্ভাসিত হয় অমৃতা এবং জেগে ওঠে মির্চা। খরায় শুকিয়ে ওঠা ফাটা জমির মত চৌচির হওয়া অমৃতা বলে – “মির্চা তুমি একটা উপন্যাস লিখেছিলে আমায় নিয়ে সেই ১৯৩৩-এ। তাতে অনেক মিথ্যে ভাষণ ছিল তোমার তাইনা”? স্পর্ধিত পাহাড় বেয়ে ঝরেপরা ঝর্ণাস্রোতের মত দৃঢ়তায় বলে মির্চা – “না আমার সব কথাইতো সত্যি ছিল, মিথ্যে বলিনি আমি”।
– “ঐ যে তুমি প্রথম বললে আমার মা-বাবা তোমার কাছে বিয়ে দিতে আমাদের ঘরে নিয়েছিল তোমায় । সেটাতো মিথ্যে ছিলো”।
– “আর” ?
“সাবি যে রাতে অসুস্থ্য হলো খুব, সে রাতে নাকি ‘নিরাবরণ’ হয়েছিলাম আমি তোমার কক্ষে গিয়ে? আমার নগ্নদেহ দেখিয়েছিলাম তোমায়? আমার ভার্জিনিটি ভাঙতে আহবান করেছিলাম নিজে? এসব কি মিথ্যে নয়”?
মাথা নাড়লো মির্চা। বললো – “মিথ্যে কেন হবে”?
– “তুমি পবিত্র গঙ্গার বহমান জলে নেমে শপথ করে বলো, এসব কথা সত্যি ছিল”?
সত্যি এবার জলে নামলো দৃঢ়চেতা মির্চা। প্রথমে হাঁটুজলে, তারপর গলাজলে নামলো সে। এবং জলে ভিজে দৃঢ়তায় বললো – “আমি গঙ্গার নামে শপথ করে বলছি, আমার উপন্যাসে অমৃতার সাথে যে শারিরীক সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছি তা সত্যি ছিল”।
আকস্মিক গঙ্গাতে একটা ডুব দিলো মির্চা। এবং অনেকক্ষণ পর যখন জল থেকে উপরে উঠলো সে, তখন তার কুৎসিত কদাকার চেহারায় বিস্মিত হলো অমৃতা, বিস্মিত হলো সাবি। সাবি চিৎকার দিলো আতঙ্কে ওর গায়ের রঙ আর শারিরী কদর্যতা দেখে।

এই প্রথম কাছাকাছি দৌঁড়ে এলো বিশেষজ্ঞ টিমের সবাই। এলো সংশ্লিষ্ট আরো মানুষজন যারা কাছাকাছি ছিল। এলাম আমি নিজেও। ওরা সবাই বললো – “মিথ্যে বলছে মির্চা। ৩০১৬-র পৃথিবীতে মিথ্যে বলতে পারেনা কেউ। বলা মাত্রই তার চেহারা পাল্টে যায়। কুৎসিত কালো হয় মিথ্যে বলার কারণে। এমনই ‘প্রোগ্রাম’ সেটাপ করা আছে পুরো পৃথিবীর সব জল বাতাসে”।
এবার ঘাবড়ে যায় মির্চা। এমন পরিণতিতে ব্যথিত হয় সবাই। আমি জানতে চাই বিশেষজ্ঞ টিমের কাছে – “এর কি কোন প্রতিকার নেই”?
টিম সদস্য ‘জ’ বলে – “সে অনুতপ্ত হয়ে বহমান গঙ্গায় নেমে আবার সত্যিটা বললে, তার পূর্বরূপ ফিরে পাবে সে, তবে একবার মিথ্যে বলেছিল চেহারায় এমন একটা চিহ্ন থাকবে তার আজীবন! তাই করতে রাজি হয় মির্চা। এবং সত্যিটা বলে ২য় ডুবে ফিরে পায় সে তার পূর্বরূপ। ২৩-বছরের ককেসীয় মির্চা ইউক্লিড দাঁড়ায় ষোড়শী অমৃতার সামনে।

এবার হাসে ‘অমৃতা’। হাসে ‘সাবি’। হাসে পুরো পৃথিবী। এ নাটকীয়তা পর্যবেক্ষণে করতালিতে জেগে ওঠে পুরো বিশ্বের মানুষ। যে সত্যের জন্যে অমৃতারূপী মৈত্রেয়ী দেবী জীবনে যুদ্ধ করেছিল অনেক বার, প্রাক্তন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে পর্যন্ত গিয়েছিল অমৃতা তার নামে মিথ্যাচারে ভরা The Bengal Night ছবির প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে। সে সত্যিটা আজ প্রকাশিত হলো ৩০১৬’র পৃথিবীর কোটি-কোটি মানুষের সামনে, এ সত্য-মিথ্যা নির্ণায়ক ক্লেদহীন ভালবাসাময় পৃথিবীতে!

হাত ধরতে চাইলো মির্চা অমৃতার। চোখ ভিজিয়ে বললো – “অমৃতা ক্ষমা করো তুমি আমায়। তোমার বাবার দেয়া আঘাতে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে মাত্র ২৩-বছর বয়সে এক মিথ্যেভরা প্রেম কাহিনিতে পুরো বিশ্বকে ভুল বুঝিয়েছিলাম আমি। কিন্তু এটাতো মিথ্যে নয় যে, তোমাকে সত্যি ভালবাসি আমি এবং এখনো”!
মির্চার বন্ধু সেবাস্টিন সেরগেই তার বাড়িতে সাক্ষাতে একদিন বলেছিল – “প্রেমের মধ্যে অমরতা থাকে, মির্চা সেই অমরতায় ফিরে আসবে”! এ কথাই হয়তো ডি প্রফান্ডিস তার কবিতায় বলেছিলেন এভাবে – “Where all that was to be in all that was”!
– “তাই কি মির্চা! তাই কি সত্যি ছিল জীবনে”?
চলার পথের অমিত প্রগলভতায় ভিজে যায় পুরো বোধ অমৃতার। প্রাক্তন ভালবাসাময় জীবনের অনিদ্রার গানে ভেসে-ভেসে ওর হৃদয় নেচে ওঠে আবার পুরণো দিনে। চোখ ভিজিয়ে বলে –
– “মির্চা, জ্যোতিষী আমায় বলেছিল, আমি সমুদ্র পার হবো। সারাজীবন যার অপেক্ষা করেছি, তার সাথে দেখা হবে আমার! সে জ্যোতিষ কিভাবে জানতো, এ গঙ্গাতীরে সত্যভাষণ শেষে তুমি দাঁড়াবে আমার পাশে এ গঙ্গা সুমদ্রে”!
– “এই কি এসেছে সে সত্যদিন! last of life for which the first was made —” !
মহাকালের কারাগার ভেঙে মির্চার সাথে একদিন যেতে চেয়েছিল অমৃতা। যে মহাকালের আদি নেই, মধ্য নেই, অন্ত নেই। সে মহাকাল দেখছে অমৃতা আজ। ক্ষণিক প্রবাহিত জীবনের আনন্দ স্রোতস্বিনী নদী সপ্তবর্ণা মেঘ হলো এবার দুর আকাশে। তাইতো মির্চাকে পেতে বলেছিল একদিন অমৃতা
– “মহাকাল তার জটার বাঁধন খুলে নিয়ে যাবে তাকে মির্চার কাছে। লজ্জা, ভয়, স্বজনের বন্ধন ঝেরে কালজয়ী প্রেম তার ঔজ্জ্বল্য নিয়ে নীলাকাশে ধ্রুবতারার মত মহাসমুদ্র পার করে নেবেই তাকে একদিন”।
উডল্যান্ডে মির্চাকে খুঁজতে গিয়েছিল একদিন অমৃতা। গঙ্গাতীরের এ বৃক্ষবাতাস আর বনশ্রেণির হাতনাড়া কি সেই উডল্যান্ড! শার্লি নামের মেয়েটিও একবার অমৃতাকে দেখিয়েছিল মির্চার কক্ষ। ‘সাবি’ কি আসলে সেই শার্লি!
– “বিয়াল্লিশ বছর কি বড় সময় মির্চা! হাজার বছর কি বড় কিছু এ জীবনে? দেখো পৃথিবীটা কত দিনের পুরনো। এ চাঁদ সূর্যের বয়সও কি কম মির্চা? হাজার বছরটা আসলে কি খুব বড় মির্চা”!
শীর্ণ গিরিপথে সারারাত জেগে থাকা কষ্টবাতাসে ভর করে অবশেষে মির্চার দিকে হাত বাড়ায় অমৃতা। ১৯৩০ সালের নিষ্পলক নারীর অসূয়া বুকের সুখ স্মৃতির মত মির্চার হাত ধরে সত্যি সত্যি অমৃতা। এবং ভালবাসার পরম আশ্রয়ে অবশেষে হাতে হাত রাখে তারা, যার সাক্ষি থাকে বিশ্বের সকল মানুষ!
:
এবার আকস্মিক মহাশূন্য থেকে জাদুকরের মত সেই সাইনবোর্ডটা শূন্যতায় দৃশ্যমান হয়। যাতে লেজার ঝিলিকে ভেসে উঠতে থাকে প্রথমে মির্চার ছবিতে – “… Tomar Ki moné acché ? …. Yadi thaké, taholé Ki, Kshama Karté Paro ? ….” অমৃতার ছবিতে
– “অজস্র মণিমুক্তা সজ্জিত সুবর্ণ দেবতার মত, অপার অসীম সুষমায় আমি তোমার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণতা হই, আর তুমি আমাকে বুকে তুলে নাও”। এবং শেষে –
“আমি তো সেই তোমাকেই দেখতে এসেছি, যাকে Weapon cannot pierce, fire cannot burn… সংস্কৃতিতে বললে – ‘ন হন্যতে হন্য মানে শরীরে-” এবং সব শেষে পুরো বিশ্বময় করতালিতে সবাই পাঠ করে –
“শুভতা মির্চা ইউক্লিড! শুভতা মৈত্রেয়ী দেবী। ৩০১৬’র পৃথিবীতে স্বাগতম তোমাদের। এ বিশ্বে চিরন্তন তোমরা। তোমাদের “লাভ কাপল হাউস” সেই ভবানিপুরের পুরণো বাড়িতেই। আজ তোমাদের মধুচন্দ্রিমার রাত। যে রাতের নামটিই হচ্ছে “The Bengal Night 3016”.

কাহিনি এখানেই শেষ হয়না। মির্চার মিথ্যাচারের জন্যে একটা লঘু শাস্তি ঘোষিত হয় তার। ১৯৩০-সনের কোলকাতার হাতেটানা একটা ‘রিক্সা’ নিয়ে আসে রোবটেরা ওদের পাশে। যাতে যাত্রী হিসেবে বসবে অমৃতা। আর শাস্তিটা? হ্যাঁ মির্চা পুরো পথটা টেনে নিয়ে যাবে রিক্সাটা ঐ ভবানিপুরের বাড়ি পর্যন্ত। একদম খালি পায়ে ঠিক ত্রিশ সালের রিক্সাওয়ালার মত!
মির্চা তার লালঠোঁটে হাসি এনে বললো – “তথাস্তু”!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *