সিপিবিতে বিবাদ!

দলের ১১তম জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে গৃহদাহ তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী সংগ্রামে বর্তমান সরকারের পাশে থাকা না থাকা নিয়ে এই বিবাদের সৃষ্টি হয়েছে বলে দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য নিশ্চিত করেছেন। তার মত করে কেন্দ্রিয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, দলের একটি কট্টরপন্থী অংশ সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী সংগ্রামে আওয়ামী লীগ সরকারের পাশে না থেকে ‘এককভাবে লড়াই’য়ের নামে বিএনপি-জামাত অংশকে সুবিধা দিয়ে আসছে।

সিপিবির বর্তমান নেতৃত্ব নিজেদেরকে শ্রেণিবাদী-বিপ্লবী অংশ বলে দাবি করে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ও ব্যবসায়ীদের পার্টি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বলেও জানান তারা। তবে সদ্য অনুষ্ঠিত ঢাকা জেলা সম্মেলনে এ অংশ ‘সম্পূর্ণ পরাজিত’ হওয়ার পর সামনে সিপিবির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঢেউ লাগবে বলে অনেকেই মনে করছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই এদেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করা এই দলটি নব্বই উত্তরকালে তার রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছে বলেও এর অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, পার্টির অভ্যন্তরে, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীসহ বিভিন্ন মহলে জমতে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এখন প্রায় প্রকাশ্যেই ঘটছে। ফলে আগামী জাতীয় সম্মেলন, যা কংগ্রেস নামে পরিচিত, সেখানে দলের কট্টরপন্থী সংকীর্ণ অংশকে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, আসন্ন কংগ্রেসের রাজনৈতিক প্রস্তাবে ‘গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই’ এর কথা বলা এবং সম্প্রতি সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনের কর্মসূচিতে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ‘প্রয়োজনে রাজনৈতিক পরিবর্তন এনে হলেও সুন্দরবন রক্ষা করার কথা’ বললে তা বিভিন্ন মহলের পাশাপাশি সিপিবির ভেতরেও উত্তেজনা ছড়ায়। সিপিবির অভ্যন্তরে আগে থেকেই বর্তমান সরকারের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুড়ি চলছিল বলে দলটির বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। কংগ্রেসকে ঘিরে রাজনৈতিক এ বিবাদ প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

এর আগে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে অনুষ্ঠিত দলের নবম কংগ্রেসে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সম্পাদক পদে ‘পার্টি ছাড়া অন্য কোনো পেশায় জড়িত আছেন’ এমন কেউ থাকতে পারবেন না এই বিধান গৃহীত হলে দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা যারা সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত তারা বাদ পড়ে যান। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এনজিওর প্রধানকর্তা, বৃহৎ বীমা কোম্পানির বিপণন অংশীদার, বড় ব্যবসায়ী এমন ব্যাক্তিবর্গও আছেন। পার্টির একটি বড় অংশ এতে ক্ষুব্ধ হন। বিগত দশম কংগ্রেসে ঐ বিধানটির আংশিক বাতিল ও দলের কট্টরপন্থী লাইনের প্রধাননেতা মনজুরুল আহসান খানকে নেতৃত্ব থেকে বিদায় করা তাদের জন্য বিজয় ছিল।

কিন্তু দলের বর্তমান সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদের নেতৃত্বে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি-জামাতকে অনুসরণ, সরকারের ইতিবাচক কোন কাজের মূল্যায়ন একেবারে না করা, উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিএনপির সাথে এক পাল্লায় মাপা, উভয়ের সাথে সমান দূরত্বের নীতিগ্রহণ, মিছিল মিটিং করার সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্রহীনতার স্লোগান দেয়া ইত্যাদি কারণে দলে বিদ্রোহ শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে দুইবছর আগে ঢাকা জেলা কমিটিতে ‘কেন্দ্রের আজ্ঞাবহ’ নেতৃত্বের আংশিক পতন ঘটে। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলার সম্মেলনে ওই ‘আজ্ঞাবহ নেতৃত্ব’ একেবারেই পরাজিত হয়। কট্টরপন্থী অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা-নেত্রীকে ভাল ফলাফল করতে দেখে যায় নাই। দেশের প্রাচীন এ কমিউনিস্ট পার্টিতে বিদ্রোহ স্থায়ী হয় না বলে অনেকে আশংকা প্রকাশ করলেও সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ঢাকায় দলের পরিবর্তনকামী অংশ শক্ত অবস্থান লাভ করেছে।

এ ঘটনার পর দলের অভ্যন্তরে ও ওয়াকিবহাল মহলে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার পরিণতি দেখার জন্য আসন্ন একাদশ কংগ্রেস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *