পাহাড়ে উন্নয়ন প্রকল্প পাহাড়িদের ভূমি উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন

ছবিঃ প্রতীকী

পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৫৭ সালেই। ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর মডারেট শ্লোগানে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উদ্যোগে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ১৯৬১ সালের শেষ নাগাদ এবং ১৯৬২ সালের প্রথম দিকেই বাধের পানি নির্গমনের দ্বারগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়। যার ফলে জলাধারটির কারণে রাংগামাটি জেলার বিশাল এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ৩৩.২২ মিটার উঁচু পর্যন্ত এলাকাসমুহ পানিতে নিমজ্জিত হয়। মূল লেকটির আয়তন প্রায় ১৭২২ বর্গ কিমি, তবে আশপাশের আরও প্রায় ৭৭৭ বর্গ কিমি এলাকাও প্লাবিত হয়। কাপ্তাই বাঁধের কারণে আনুমানিক ১৮,০০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায় এবং প্রায় ৬৯০ বর্গ কিমি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃত্রিমভাবে বাঁধ নির্মাণের ফলে আদিবাসীরা বাড়ী-ঘর এবং চাষাবাদযোগ্য জমি হারিয়েছে। চল্লিশ হাজারেরও অধিক আদিবাসী সম্প্রদায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্থানান্তরিত হয়ে শরনার্থী হতে হয়। এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ফলে ঐ এলাকায় সৃষ্ট সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান কারণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধের কারনও এই উন্নয়ন প্রকল্প।

এবার নতুন করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র সরকার পার্বত্য এলাকায় তেল-গ্যাস উত্তোলনের আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। যে প্রকল্প বাস্তবায়নে আবার নতুন করে পার্বত্য আদিবাসীদের ভূমি উচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। রাংগামাটি জেলার সদর উপজেলার কাচালং এবং কাপ্তাই উপজেলার সীতা পাহাড় এলাকায় তেল-গ্যাস উত্তোলন করতে যাচ্ছে। এবং এই উত্তোলনে কাজ যদি শুরু হয় তাহলে সেখানকার বসবাসকারী হাজারো আদিবাসীদের উচ্ছেদের সম্মুখীন হবে। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভবিষ্যতের জ্বালানি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি কিন্তু সে নিরাপত্তার নামে বেঁচে থাকার প্রধান উপদান প্রকৃতি ও পরিবশের নির্বিচার ক্ষতি নিশ্চিতভাবেই আত্মঘাতী। বর্তমান সরকার কর্তৃক সংশোধিত সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্য নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব–বৈচিত্র্য, জলভূমি, বন ও বন্য প্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন”। অথচ বাস্তবে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার নামে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ ধ্বংশ করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতকে ব্যবহারের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সেখানকার অধিবাসীদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পায়তারা চলছে।

প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ইকোনোমিষ্টের মতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে শক্তিশালী রাষ্ট্রেসমূহের কাছে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। উইকিলিকস প্রকাশিত গোপন তারবার্তার মাধ্যমে ১/১১ পরবর্তী তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময়ে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের এশিয়া এনার্জিসহ পরিবেশ বিনষ্টকারী বহুজাতিক কোম্পানির পক্ষে বৈধ–অবৈধ আবদারের কথা প্রকাশ পায়।

পার্বত্য অঞ্চলে তেল-গ্যাস উত্তোলনের প্রক্রিয়াও বাহির রাষ্ট্রের আবদার পূরণের একটি প্রকল্প। যে প্রকল্প বাস্তবায়নে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ধ্বংস হবে, বন্যপ্রাণী এবং সেখান অধিবাসীদের বসবাস উপযোগী আবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পার্বত্য এলাকায় চলমান ভূমি বিরোধ সমস্যার এখনো কোন সুরাহা হয়নি, সে অবস্থায় এই উন্নয়ন প্রকল্প যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে পার্বত্য এলাকায় ভূমি কেন্দ্রিক সংঘাটেও আবার নতুন মাত্রা যুক্ত হবে এবং পার্বত্য ভূমি সমস্যা আরো জটিল আকার ধারন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *