মাদ্রাসা শিক্ষা অনুৎপাদনশীল এবং একটি রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ


বর্তমান বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন প্রকার কারিগরি বিদ্যালয়ের চেয়ে মাদ্রাসার সংখ্যা বেশী। এসব মাদ্রাসায় গঠনমূলক এবং যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এসব মাদ্রাসায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী শিক্ষা অর্জন করা স্বত্বেও তাদের শিক্ষাকে দেশের ও সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল দেশ। বর্তমানে আমাদের দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নির্মাতা, ভাল শিক্ষক-শিক্ষিকা সর্বাত্মকভাবে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচয় দিয়ে দাঁড়াতে চায় তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই নতুন প্রজন্মকে যুগোপযোগী শিক্ষা দান করতে হবে। যে দেশে ধর্মের চেয়ে টুপি বেশী, যে দেশে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে পাদ্রী বেশী, সে দেশ কখনও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হতে পারে না। যে জমিতে শষ্যের চেয়ে পরগাছা বেশী সে জমি কখনও উর্বর শষ্য ফলাতে পারে না।

যদি আমরা সচেতন জনগোষ্ঠী নতুন প্রজন্মকে উৎপাদনশীল শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের মেধা থাকা স্বত্বেও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে দিন মজুরের মতো শারীরিক পরিশ্রমের কাজ ছাড়া বুদ্ধি মেধা দিয়ে জীবিকা নির্বাহের কোন সংস্থান হবে না। আমরা যদি নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য এবং মানব উন্নয়ন শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারি তাহলে আমাদের দেশে শিশু মৃত্যুর হার দুনিয়ার সকল দেশ থেকে সর্বদাই বেশী থাকবে। কোন শিশুই জন্মগ্রহন করে অকালে মৃত্যুর জন্য নয়। আমরা যদি নতুন প্রজন্মকে বিভিন্ন প্রকার প্রযুক্তি এবং জননিরাপদ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারি তাহলে আমাদের দেশে দুর্ঘটনাকবলিত মৃত্যুর হার পৃথিবীর সকল দেশের চেয়ে সর্বদাই বেশী থাকবে।

প্রত্যেকটি নাগরিকের এটা সহজাত কামনা যে, একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সরকার অবশ্যই তার নাগরিকদের জানমাল রক্ষা করবে এবং পাশাপাশি প্রত্যেকটা নাগরিকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী, উৎপাদনমুখী শিক্ষা প্রদান করবে। বাংলাদেশ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের দায়িত্ব প্রত্যেকটি মাদ্রাসাকে রাষ্ট্রীয় স্কুল শিক্ষার বাধ্যতামূলক কারিকুলামের আওতাধীন নিয়ে আসা।

এটা অনস্বীকার্য যে প্রত্যেকটা মা-বাবার তার সন্তানকে তাদের মতানুসারে শিক্ষা দেওয়ার অধিকার আছে। হউক সে শিক্ষা মাদ্রাসার ধর্মীয় অথবা দার্শনিক শিক্ষা। কিন্তু বাবা-মার এই অধিকার লাগামহীন নয়। সেই শিক্ষা অবশ্যই রাষ্ট্রীয় বাধ্যতামূলক শিক্ষার কারিকুলামের বাহিরে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা হওয়া উচিত। এবং সেই শিক্ষা অবশ্যই গণতান্ত্রিক সমাজ, ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী হবে না।

সারাবিশ্বের উন্নত দেশের নাগরিকগণ বর্তমানে সন্তান নিতে অনিচ্ছুক। তারা তাদের নিজের জীবনের ভোগবিলাস এবং পেশা নিয়ে মগ্ন। যার ফলশ্রুতিতে প্রত্যেকটা উন্নত দেশে বর্তমানে জনশক্তির মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব দুনিয়ার যেকোন দেশের চেয়ে পাঁচগুন বেশী। বাংলাদেশকে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রজনন কেন্দ্রস্থল বলা অমূলক হবে না। এই বিশাল জনসংখ্যা বিস্ফোরণকে আমরা যদি যুগোপযোগী এবং আর্থসামাজিক শিক্ষা দিতে পারি তাহলে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শ্রমিক ঘাটতি লাঘব করার জন্য আমাদের দেশের শ্রমিক লুফিয়ে নিবে। যার ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর চেয়ে কোন অংশে কম হবে না। পাশাপাশি এ স্বপ্ন দেখাও অমূলক হবে না আগামী দুই তিন দশক পরে কেউ হয়তো ইউরোপ আমেরিকার প্রধানমন্ত্রী হবে বাঙালী বংশদ্ভুত থেকে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার যা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বর্তমানে মাদ্রাসায় শিক্ষায় দীর্ঘ শিক্ষিত বেশীরভাগ জনগোষ্ঠী বর্তমানে বেকারত্বের জ্বালা নিয়ে দারিদ্রতার চরমঘাতে জীবনযাপন করছে। তারা দীর্ঘদিনের বেকারত্ব এবং দারিদ্রতার ফলে চরমভাবে হতাশগ্রস্থ। আর এই হতাশার ফলে মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্ররা হিংস্রতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশ্বের উগ্রবাদ এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো আমাদের দেশের বেকার যুবকদের বিভিন্ন প্রকার প্রলোভনের মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক কাজে লেলিয়ে দিচ্ছে।

পরিশেষে, আমি আমার দেশের সরকারকে একান্তভাবে আহবান করব যে, যদি বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে চান, যদি নতুন প্রজন্মকে আন্তর্জাতিক উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের থাবা থেকে বাঁচাতে চান তাহলে এখনই উপযুক্ত সময় বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মাদ্রাসাকে রাষ্ট্রীয় বাধ্যতামূলক শিক্ষা কারিকুলামের আওতাধীন নিয়ে আসেন। এবং এই বাধ্যতামূলক কারিকুলামে শুধুমাত্র আরবী শিক্ষাই প্রাধান্য পাবে না। আরবী শিক্ষার পাশাপাশি প্রত্যেকটা মাদ্রাসার ছাত্রকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসাবে গনিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি এবং কম্পিউটার শিক্ষাকেও বাধ্যতামূলক করা উচিত।

মোঃ খোরশেদ আলম, লেখক ও ব্লগার এবং কলামিস্ট

৪ thoughts on “মাদ্রাসা শিক্ষা অনুৎপাদনশীল এবং একটি রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ

    1. ইদ্রিস সাহেব, গঠনমূলক মন্তব্য
      ইদ্রিস সাহেব, গঠনমূলক মন্তব্য করার মত যোগ্যতা আপনার নেই। পরজীবী হয়ে লোকজনের ঘরে ঘরে দাওয়াত খেয়ে বাঁচার চেয়ে দিন মজুর হয়ে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে নিজের ঘরে নিজের রোজগার খাওয়া অনেক পবিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *