ইস্টিশন বন্ধের হুমকি- মুক্তচিন্তার গলায় আবার ছুরি?

কবি শামসুর রাহমানের একটি অসাধারণ কবিতা একসময় আবৃত্তি করতাম বারবার। বিধ্বস্ত নীলিমার সেই কবিতাটায় কবি প্রভুকে, যাকে অনেকেই সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মানেন- জিজ্ঞেস করেছেন, যদি তাকে পাঠানোই হলো, কেন পাঠানো হলো না তোতাপাখিরুপে!
“প্রভু, শোনো, এই অধমকে যদি ধরাধামে পাঠালেই,
তবে কেন হায় করলে না তোতাপাখি আমাকেই?
দাঁড়ে বসে বসে বিজ্ঞের মতো নাড়তাম লেজখানি,
তীক্ষ্ন আদুরে ঠোঁট দিয়ে বেশ খুটতাম দানাপানি।
মিলতো সুযোগ বন্ধ খাঁচায় বাঁধা বুলি কুড়োবার,
বলতে হতো না নিজেস্ব কথা বলবার গুরুভার।”

কবির আক্ষেপ আমারও, বাংলাদেশের হাজার মুক্তমনার, বন্ধ খাঁচায় বসে বুলি আওড়াতে না চাওয়া শতো শতো ব্লগারের। যদি তোতাপাখি হতাম এতো কিছু দেখতে হতো না, সইতে হতো না, বলার ইচ্ছে চাবুক মারতো না মননে। মানুষ তোতাপাখি নয় বলেই শিখিয়ে দেয়া বুলি আওড়াতে পারে না। বেঁধে দেয়া কিছু চিন্তা করতে পারে না। সে ভাবতে পারে, ভালোমন্দ বিচার করতে পারে। যা দেখছে তা বলতে পারে। আর এই বলতে চাওয়াটাই এখন হয়ে গিয়েছে বিপদজনক। অভিজিৎ বলতে গিয়ে কোপ খেয়েছেন। নিলয়, থাবা- আরো কতোজন। আর বলতে দেয়া, বলার জায়গা করে দেয়া, একটা সুন্দর যথাযথ প্লাটফর্ম তৈরী করে দেয়ার জন্য ইষ্টিশনকে শুনতে হচ্ছে “বন্ধ করে দেব” টাইপ হুমকি।

বাংলাদেশে, সেই ইংরেজ আমল থেকেই, বলতে চাওয়ার কোনদিন সুষম ছিল না। ১৯২৬ সালে নিষদ্ধ করা হয়েছিল শরৎচন্দ্রের পথের দাবি। নজরুলের কতিপয় বই নিষদ্ধ করা হয়েছিল দেশদ্রোহীতার অভিযোগে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ, যে মহান প্রতিভা ইংরেজদের প্রতি ছিলেন কিছুটা নরম তার উপরও নজরদারী রাখা হয়েছিল। শুধু রবি ঠাকুর নন, তার মতো আর আটজন যাতে কোনভাবে- কথায়, লেখায়, বক্তব্যে, কাজে ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করতে না পারে সেদিকে ছিলো কঠোর নজর। রবিবাবুর “চার অধ্যায়” বাজেয়াপ্ত করার কথাও উঠেছিল “১৯৩১ সালের প্রেস ইমার্জেন্সি আইনে”, বইটি স্বাধীনতাকামীদের প্রেরণা জোগাচ্ছে, এই অভিযোগে। এর অনেক আগে ১৮৮৭ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয় সরকার বিরোধী সব নাটকের মঞ্চায়ন। পাক আমলে সরকার বিরোধী চিন্তাও ছিল যেন পাপ। শুধু দৈনিক ইত্তেফাককেই ১৯৬৬ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল দুবার। আর এর সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে যেতে হয়েছিল জেলে। রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথের গান বাজানো নিষিদ্ধ করা হয়, অবশ্য বুদ্ধিজীবিদের কঠোর অবস্থানের কারণে, তাদের সে আবদার মাথা তুলতে পারেনি।

আজকের বাংলাদেশে, স্বাধীন ভূমিতে যখন কোন পত্রিকাকে, কোন চ্যানেল বা ব্লগকে যখন বন্ধ করার হুমকি বা বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন মনে হয় আমরা এখনো উপনিবেশের অধিনেই আছি। আমাদের অধিকার নেই কিছু বলার, করার। স্বাধীন দেশের সার্থকতা কোথায় যদি আমার বলার অধিকারই না থাকে?

গতকাল ইষ্টিশনের ফেসবুক পেজে বলা হয়-
“দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সরকারের নির্দেশে বিটিআরসি ইস্টিশন ব্লগে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গতকাল রাত থেকে ইস্টিশনে অনেকেই ঢুকতে পারছেনা। সরকারের এমন বাক-স্বাধীনতা হরন করার মানষিকতার নিন্দা জানাচ্ছি।”

খুব বেশীদিন হচ্ছে না অনলাইনে লিখছি। সামুতেই শুরু। অসাধারণ ব্লগ সামু, সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি খোলামেলা কথা বলার প্লাটফর্মের কথা বলা হয়, তবে বলবো ইষ্টিশনই সেরা। হ্যাঁ মুক্তমনা কিংবা সচলের কথা মাথায় রেখেও। এখানে মডারেটরের কচকচানি নেই। ব্যক্তিগত আক্রমণের ভয় নেই, ছাগুর ম্যাৎকার নেই, হিপোক্রাট সুশীলের ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘তবে’ নেই। মুক্তচিন্তা, খোলামেলা কথার স্বর্গ ইষ্টিশনকেই বলা যায়। আর এই ইষ্টিশনকেই বন্ধ করে দেয়ার পায়তারা করছে সরকার। এখন, অবশ্য সবাই, সব স্থান থেকেই ঢুতে পারছে ব্লগে। তবে, কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ রেখে সরকার কি এটাই বুঝিয়ে দিল না যে, “তোমাদের বন্ধ করার ক্ষমতা আমাদের আছে। বেশী লাফিয়ো না। ঠ্যাং ভেঙ্গে দেবো”?

রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ করে মুক্তচিন্তার পথে বিশাল এক গর্ত করে রেখেছে বইমেলা থেকে। শোনা গিয়েছিল, এবারের বই মেলায় অভিজিতের বই পাওয়া যায়নি কোন স্টলেই। বাংলাদেশের কোন মূলধারার পত্রপত্রিকাই মুক্তচিন্তাকে ধারন করতে অপারগ। বাকি থাকে এই অনলাইন জগত। এই ব্লগ। সেটাকেও গলা টিপে মেরে কাফন পরিয়ে বিদায় করার চিন্তা করা হচ্ছে? মজার ব্যাপার, কোনদিন শুনিনি চটি সাইটগুলো বন্ধের ব্যাপারে তারা কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আজ ওয়েব সার্চ করলে মূহুর্তেই পাওয়া যায়- মা, বোন, খালা, মামিকে নিয়ে অজস্র কুরুচিপূর্ণ লেখা, দেখা যায় ভিডিও রতিক্রিয়ার- সেসব বন্ধের কোন চিন্তা তাদের মাথায় নেই। কথা যখন উঠে মুক্তচিন্তার তখনই হয়ে যান তারা খড়গহস্ত।

যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তবে তার ফল যে ভালো হবে না কারো জন্যই- সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন দেশেই, কোন সরকারই নাগরিকের কণ্ঠরোধ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী।
সেই ইতিহাসের দিকে নজর রেখেই সরকারের এধরনের কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা উচিৎ। আর আমরা যারা সচেতন নাগরিক আছি, তাদের সবাইকে দাঁড়াতে হবে এই অপরিনামদর্শী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। শুধু ইষ্টিশন কেন আর কোন ব্লগের ব্যাপারেই যেন এমন কোন ফাউল সিদ্ধান্ত না নেয়া হয় তার জন্যও কথা বলতে হবে। নিজনিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করলেই এমন ভুলের জালে জড়িয়ে মরতে হবে না আমাদের।

27/09/2016

৭ thoughts on “ইস্টিশন বন্ধের হুমকি- মুক্তচিন্তার গলায় আবার ছুরি?

  1. ইস্টিশন বাংলাদেশ থেকে
    ইস্টিশন বাংলাদেশ থেকে বিটিআরসি ব্লক উঠিয়ে দিয়েছে এমন কোন খবর জানিনা। অনেকেই মোবাইল ব্রাউজারে প্রবেশ করতে পারছে নির্দ্দিষ্ট কিছু ব্রাউজারে।

    1. হ্যাঁ, অনেকেই পারছে। অনেকেই
      হ্যাঁ, অনেকেই পারছে। অনেকেই পারছে না।
      এটাই বড় কথা যে হুমকি দিয়েছে। এর মানে এটাই ওরা ইচ্ছা করলেই বন্ধ করে দিতে পারে।
      এতো ভয় করে সরকার ব্লগারদের!

      1. ভয় ব্লগারদের নয়, ভয় নাস্তিক
        ভয় ব্লগারদের নয়, ভয় নাস্তিক ব্লগারদের লেখনির ফলে সৃষ্ট ইসলামিক গণঅভ্যুত্থান (islamist insurrection) এর, যেটার ভয় বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই পাচ্ছে current time এ

  2. দেশে একটাই ব্লগ আছে বলতে গেলে
    দেশে একটাই ব্লগ আছে বলতে গেলে যেটা মুক্তচিন্তা সমর্থন করে, পোস্টে নাক গলায় না, ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা ভাবে না এবং পোস্টের মন্তব্যের ঘরে কোন গালাগালি নেই। দেশের প্রথমসারির প্রিন্ট এবং নিউজ মিডিয়ার মত সামুও সরকারের বাইরে যেতে ভয় পায়, ব্যবসাটা তাদের কাছে এখন বড় হয়ে গেছে মনে হয়। একমাত্র ইস্টিশনই আছে সবার মতামত কোন প্রভাব ছাড়া প্রকাশের মত। আর সরকারের নজর এখ সেই দিকে। দুঃখের কথা হচ্ছে বাকশালের ভুল থেকে আওয়ামীলীগ কোন শিক্ষা নেয়নি। আরও দুঃখের হবে যখন একই পন্থায় তাদেরকেও চেপে ধরা হবে। কারণ, ক্ষমতা চিরদিন থাকে না। যে ধারা তৈরী করা হলো, তা আবার ফিরে আসবে। ফিরে আসতে বাধ্য। ইতিহাস আমাদের তাই শিক্ষা দেয়। এবং সেই সময়ে ভুক্তভোগী হবে আওয়ামী লীগ।

    ক্ষমতা থেকে সরাবার, বিরুদ্ধ মত প্রকাশের কিংবা গণতান্ত্রিক উপায়ে যখন কাউকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সকল পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন নৃশংস পথই একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয় বিরোধীরা। আর সেটার ভুক্তভোগী হতে পারেন শেখ হাসিনা। কারণ, বিএনপির মত আওয়ামী লীগও একমাত্র এই মহিলার নামেই টিকে আছে এবং উনি বেছে নিচ্ছেন ভুল পথ। যারা সরকারের মাথায় বসে আছে, তারা হয়তো ভুলে গেছে, সময় কাউকে ক্ষমা করে না।

    1. একমত। এটা মেনে নিতে পারছি না
      একমত। এটা মেনে নিতে পারছি না যে ইস্টিশন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা হত্যার সামিল।
      এরা ব্লগ বন্ধ করে কন্ঠোরোধ করছে আর চাপাতিওয়ালারা কুপিয়ে।
      কোথা পার্থক্য?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *