নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুরষ্কার ও নারী ধর্ষণ – খুনের বিচারহীনতা

নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস করার ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায় হাফ ডজন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়েছেন। সর্বশেষ তিনি জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ‘ইউএন ওম্যান’ এর কাছ থেকে ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০’ পুরষ্কার লাভ করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পুরষ্কার লাভ করা দেশের জন্য গৌরবের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি এদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে?

নারীর ক্ষমতায়ন পরে, এদেশে নারী ধর্ষণ ও খুনের বিচার করাইতো সম্ভব হয়ে উঠছে না। সাংবাদিক রুনি হত্যার বিচার এদেশে কখনো হবে কিনা, সেই ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সাত মাসের বেশি সময় পার হলেও কুমিল্লার কলেজ ছাত্রী তনু হত্যার কারণ এখন পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি, বিচার তো পরের বিষয়! একমাস দশদিন পার হয়ে গেলেও আফসানার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি। আফসানার মৃত্যুতে যে মামলাটি করা হয়েছে, সেটির কোন অগ্রগতি নেই। নতুন করে খুনের মামলা নিতে পুলিশ অনীহা প্রকাশ করছে। আফসানার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রদানে বিলম্ব করা, এই হত্যাকান্ডকে ভুল পথে পরিচালিত করতে চাওয়া কিনা, সেই ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায়।

রুনি, তনু, আফসানা তো সাধারণ নারী। স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আখতারের স্ত্রী খুনের কোন কুলকিনারা দেখা যাচ্ছে না। খুনীকে চিহ্নিত করে সাজা দেয়ার বদলে, পুলিশের গর্ব বাবুল আখতারকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে! দেশে দিনকে দিন নারী ধর্ষণের পরিমান বেড়েই চলেছে। পুলিশের খাতায় নতুন নতুন ধর্ষণ এবং নারী খুনের মামলা লিপিবদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু সেইসব মামলার সুরাহা হচ্ছে না।

এসব কি নারীর ক্ষমতায়নের চিহ্ন বহন করে? দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী নেত্রী নারী, স্পিকার নারী, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী নারী, এর মানে কি দেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? এখনও দেশে বহু নারীকে রাতে মাতাল স্বামীর হাতে মার খেতে হয়। এখনও নারী উদ্যোগতাদের ঋণ সুবিধা পেতে দূর্ভোগ পোহাতে হয়, অথচ দেশে নাকি নারীর শাসন চলছে!

মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন। সেই পুরষ্কার পেয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি সৃষ্টি করেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী গত বছর জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ অর্জন করে রামপালে পরিবেশ ধ্বংসকারী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেন।

এই কথা ঠিক, রাতারাতি সব কিছু পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে যেদেশে প্রধানমন্ত্রী না বললে কোন কিছুরই অগ্রগতি হয় না, সেদেশে নারী হত্যার বিচারের উদাসীনতার দায় তাকে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যদি রুনি, তনু, আফসান কিংবা মিতুদের হত্যাকান্ডের বিষয়ে আন্তরিক হতেন, তবে হয়তো এর মধ্যে একটা হত্যাকান্ডের বিচার হতো।

আমরা একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হাতে পুরষ্কার দেখি, অন্যদিকে প্রতিদিন ধর্ষিতা নারীর লাশ দেখি। আমরা একদিকে পুরষ্কার হাতে প্রধানমন্ত্রী হাস্যজ্বল ছবি দেখি, অন্যদিকে ধর্ষণ – খুনের বিচার না পেয়ে শত শত পরিবারের আহাজারি দেখি। নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পুরষ্কার প্রাপ্তি আমাদের যদি গর্বিত করে, তাহলে নারী ধর্ষণ – খুন এবং এর বিচার না হওয়া কি আমাদের লজ্জিত করে না??

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *