গান, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও আমি

জগদানন্দ বড়ূয়া ধনি নামের কেউ একজন আমার শৈশবের বিকেলগুলোর বারোটা বাজিয়েছিলেন। তিনি একাধারে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, লোকগীতি, শাস্ত্রীয় সংগীত আরো কী কী যেন পারতেন। আমার মাথায় খেলে না, কীকরে এই মহান প্রতিভাধর ব্যক্তি যে গলায় রবীন্দ্রনাথের ঘুমধরা গান গাইতেন সেই একই গলায় লোক গীতি গাইতেন চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে! থাক সে কথা। তিনি এখন স্বর্গবাসী (নাকি নরক?)। তার গান আর এখন শোনার উপায় নেই। সিডি পাওয়া যাবে হয়তো- বেকার টাকা নষ্ট করার কী দরকার আছে! … তিনি বই লিখেছিলেন একটা। সংগীত মুকুল নাম। সেটা ছিল আমার পাঠ্য। বিকেল বেলা গান শেখাতে আসতেন ম্যাম। এসেই সরগম করিয়ে পড়াতেন বা পড়া ধরতেন সেই বই থেকে। যেখানে আমি এখনও ছন্দ বুঝি না ভাল করে; কোনটা অক্ষরবৃত্ত, কোনটা স্বরবৃত্ত কিংবা কোনটা অমিত্রাক্ষর সেটা জিজ্ঞেস করলে এখনো আমার কান চুলকানো ছাড়া উপায় থাকবে না কোন- সেখানে আমাকে সেই সাত বছর বয়সে মুখস্ত করতে হয়েছে এসব। ম্যাম সেই সংগীত মুকুলে দাগিয়ে দিতেন আর আমি পাখির বুলির মতো মুখস্ত করতাম সেসব। পড়া না পারলে মারতেন না বটে কিন্তু এমন চোখে তাকাতেন যে মনে করলে এখনো বুক ঠান্ডা হয়ে যায়। আমার বয়সের ছেলেরা যখন দাপিয়ে বেড়াতো মাঠ তখন আমাকে হেড়ে গলায় গাইতে হতো “বিলাবল ঠাটে ধনি শুধ বিলাবল গাহে!” কিংবা ইমন বা ভৈরবী। নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভীষ্মলোচন খারাপ গাইতেন না। সে গান শুনে সুকুমার রায় লিখেছিলেন-

“গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা—
আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা!
গাইছে ছেড়ে প্রাণের মায়া, গাইছে তেড়ে প্রাণপণ,
ছুটছে লোকে চারদিকেতে ঘুরছে মাথা ভন্ভন্।
মরছে কত জখম হয়ে করছে কত ছট্ফট্—
বলছে হেঁকে “প্রাণটা গেল, গানটা থামাও ঝট্পট্।”
………
জলের প্রাণী অবাক মানি গভীর জলে চুপচাপ্,
গাছের বংশ হচ্ছে ধ্বংস পড়ছে দেদার ঝুপ্ঝাপ্।
শূন্য মাঝে ঘূর্ণা লেগে ডিগবাজি খায় পক্ষী,
সবাই হাঁকে, “আর না দাদা, গানটা থামাও লক্ষ্মী।”

অবশ্য আমার বাবার বোধোদয় হতে খুব বেশিদিন লাগেনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, হারমোনিয়াম বাজিয়ে চিল্লালেই গান গাওয়া হয় না। তিনি আমার গান ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এতে আমার মতো খুশী কেউ হয়নি। তার বোধোদয় হতে সময় লেগেছিল মোটে মাত্র ছয় বছর। এই ছয় বছর আমাকে প্রতিদিন সকালে উঠে প্রতিবেশীর ঘুম ভাঙ্গিয়ে সা রা গা করতে হতো আর বিকেলে ক্রিকেট ছেড়ে ম্যামের অপেক্ষায় বসে থাকতে হতো।

আমার সুপারহিরো ছিলেন একজন। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। যখন ক্রিকেট বুঝতামই না তখন থেকেই তার ফ্যান। উদয় ভাই তখন সবে ক্রিকেট শুরু করেছে। সারাদিন গিলির এতো প্রশংসা করতো যে, আমি না দেখেই তার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। সে জয়সুরিয়া আর সাঙ্গাকারারও প্রশংসা করতো খুব। কিন্তু গিলি কেন জানিনা বেশি টেনেছে। আমি গায়ক, নায়ক কিচ্ছু হতে চাইনি তখন। গিলির মতো উইকেট কিপার ব্যাটসম্যান হতে চেয়েছিলাম। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে গ্লাভস কিনেছিলাম। বল করার জন্য লাগিয়ে দিতাম কাউকে আর আমি কিপিং প্রাকটিস করতাম। কিন্তু বাবা সাপোর্ট করেননি কোনদিন। খুব খারাপ ছিলাম না খেলায়। বাবাকে অনুরোধ করেছিলাম খুব কোন ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি দেননি। ক্লাবে ভর্তি তো দূরের কথা, বিকেএসপিতে পরীক্ষা পর্যন্ত দিতে দিলেন না। অথচ শুধু তার ইচ্ছা, তার মনের সাধ মিটানোর জন্য আমাকে ছয়টা বছর হারমোনিয়াম তবলা নিয়ে চিল্লাচিল্লি করতে হয়েছে। না বুঝে মুখস্ত করতে হয়েছে তাল, মাত্রা, ছন্দ নিয়ে পাতার পর পাতা। রাগ, ঠাট, আরোহী, অবরোহীর সংঙ্গা ঠোটস্ত রাখতে হয়েছে- বইয়ের সাথে মিলিয়ে। না বুঝেও গাইতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের প্রেম, প্রকৃতি, পূজা কিংবা বিচিত্র পর্যায়ের গান। তাল মিললো না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রাকটিস করতে হয়েছে খেয়াল!!!

এখনো কোন দলের সাথে খেলা থাকলে ডাকে আমাকে। কিপ করি, ওপেন ব্যাট করি। কিন্তু কেন জানিনা, এটা ভেবে আফসোস হয় খুব, ” একটা সুযোগ যদি পেতাম। একটা শুধু!”
২১/০৯/২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *