কুরবানি প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহারের ‘রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব’ ও তার বিপদ। পর্ব – ১

ফরহাদ মজহার লিখেছেন – পরমের সন্তুষ্টির জন্য প্রাণী উৎসর্গ করার বিধানের বিরোধিতা করা একান্তই একটি খ্রিস্টিয় চিন্তা। এই দাবি তিনি করেছেন চিন্তাডটমে প্রকাশিত একটি লেখায়। তার এই দাবি কতোটা সঠিক? পরমের সন্তুষ্টির জন্যে প্রাণী উৎসর্গের বিরোধিতা কি ‘একান্তই খ্রিস্টিয় চিন্তা’? খ্রিস্টিয় চিন্তার বাইরে ‘পরমের উদ্দেশ্যে কুরবানির বিরোধিতা’র আর কোন ইতিহাস কি নাই? আছে তো। পশু কুরবানির বিরোধিতার ইতিহাস বৌদ্ধ ধর্মে আছে, জৈন ধর্মে আছে। বিশেষ করে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে পশু কুরবানির বিরোধিতা ভারতিয় উপমহাদেশে এতোটাই প্রভাবশালী যে তা পরবর্তিতে ব্রাহ্মণ্যবাদকেও প্রভাবিত করেছে, পরোক্ষভাবে হয়তো কিছু মুসলিম সুফি তরিকাকেও। গৌতম বুদ্ধ সম্বন্ধে একটি গল্প প্রচলিত আছে যে একদা দেবতাদের উদ্দেশ্যে কুরবানি দিতে উদ্যত একজন ব্যক্তির কাছে তিনি কুরবানির পশুর বদলে নিজে কুরবানি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বুদ্ধের দাবি ছিল, দেবতাদের সন্তুষ্টিই যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে পশুর চাইতে মানুষের জীবন কুরবানিতে দেবতাদের আরো বেশি সন্তুষ্ট হওয়ার কথা। ভারতবর্ষে এমন কিছু সুফি তরিকার অস্তিত্ব আছে যার অনুসারিরা সরাসরি পশু কুরবানির বিরোধিতা না করলেও নিজেরা পশু হত্যা করে না এবং গোস্তও খায় না। এর পেছনে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রভাব থাকতে পারে, নাও পারে। তবে মূল কথা হলো, পশু কুরবানির বিরোধিতা ‘একান্তই খ্রিস্টিয় চিন্তা’ এবং তা ইউরোপিয় সাদা চামড়ার উপনিবেশকদের মাধ্যমেই ভারতবর্ষে হাজির হয়েছে, ফরহাদ মজহারের এই দাবি ধোপে টেকেনা। আর খ্রিস্ট ধর্ম আসলেই কি এসেনশিয়ালি ‘পরমের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি’র বিরোধী? যেমনটা ফরহাদ মজহার দাবি করছেন? মোটেই না। বিষয়টা পরিস্কার করি। ফরহাদ মজহার কুরবানি সংক্রান্ত খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে যা লিখেছেন এবং তার সাথে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের যে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন, তাতে অনেক বড় বড় কিছু দাবি আছে। কিন্তু এইসব দাবিকে শক্ত ভিত্তির উপর দাড় করাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই ব্যর্থতা দোষের কিছু নয়। কিন্তু কুরবানির ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্র করে খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের মধ্যে যেসব এসেনশিয়াল পার্থক্য তিনি তুলে ধরেছেন তা যতোটা বিভ্রান্তিকর তার চাইতে অনেক বেশি বিপদজনক। ফলে এসব দাবির অসারতা তুলে ধরা জরুরি। যেমন, কুরবানি বিষয়ে খ্রিস্টিয় চিন্তা তুলে ধরতে ফরহাদ মজহার লিখেছেন –

দাবি করা হয়,খ্রিস্ট ধর্মই একমাত্র সত্যিকারের ধর্ম। যীশু নিজেকে নিজে ক্রসে ‘কোরবানি’ দিয়ে সেটা প্রতিষ্ঠা করেছেন।এর চেয়ে বড় কোরবানি আর কিছুই হতে পারে না। এটাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ কোরবানি। কোরবানির চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তিনি। এরপর অন্য সকল কোরবানি নিরর্থক। কারণ সত্যিকারের ধর্ম হাজির হয়েছে। এখন কর্তব্য হচ্ছে ক্রুসেড পরিচালনা ও সকল জনগোষ্ঠিকে ধর্মান্তরিত করা। আল্লার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য পশু কোরবানি বন্ধ করা। পাগান বা বর্বরদের বিপরীতে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম প্রমাণের জন্যই পশু কোরবানি খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করেছে।

ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্য পড়লে মনে হয় যে, পশু কুরবানির বিরোধিতা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের খুবি কেন্দ্রীয় একটি বিষয়। এবং শুধু কেন্দ্রীয়ই নয়, বরং খ্রিস্টান ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান এবং অপর ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে ক্রুসেড পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি দেয়ার ক্ষেত্রেও এর ভুমিকা আছে। এইসব দাবির পেছেন তিনি কোন খ্রিস্ট ধর্মিয় টেক্সটের ফিলোলজিকাল ব্যাখ্যা বিশ্লেষন হাজির করেন নাই, কোন ঐতিহাসিক তথ্য প্রমানও দেন নাই। এইটা সত্যি যে খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বে ঈসা মসিহাকে ‘ল্যাম্ব অফ গড’ গণ্য করার প্রচলন আছে। এবং ঈসার ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গোটা মানব জাতির পাপমুক্তির বিশ্বাস খ্রিস্টান ধর্মের সবচাইতে কেন্দ্রীয় ধারণা। কিন্তু ঈসার মৃত্যুকে প্রধানত কুরবানির ভাষায় ব্যাখ্যা করা এবং পশু কুরবানির বিকল্প হিসাবে দেখানোর ধর্মতত্ত্ব খ্রিস্ট ধর্মচিন্তায় অপেক্ষাকৃত নতুন। এই ধরণের চিন্তা প্রটেস্টান্ট রিফর্মিস্ট আন্দোলনের সময় থেকে পশ্চিম ইউরোপিয় খ্রিস্টানদের ধর্মতত্ত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রটেস্টান্ট ধর্মতত্ত্বে এর নাম – প্যানাল সাবস্টিটিউশন। এই ধর্মতত্ত্ব অনুসারে, ঈসার কুরবানি বহু পশুর কুরবানির বিকল্প। অর্থাৎ, ঈসা সেচ্ছায় কুরবান হয়ে সকল মানুষের পাপের শাস্তি গ্রহণ করেছেন। রিফর্মিস্ট আন্দোলনের আগে এই ধরণের চিন্তা জনপ্রিয় ছিল না। আদি খ্রিস্টিয় চিন্তায় বরং ‘মোরাল ইনফ্লুয়েন্স’ এবং ‘র‍্যানসম থিওরি’র প্রচলন ছিল। প্রথম তত্ত্ব মোতাবেক, ঈসা মসিহার শাহাদাত ও পুনরুত্থান ছিল মূলত দুনিয়ার মানুষের মধ্যে বড় ধরণের নৈতিক পরিবর্তনে ভুমিকা রাখার জন্যে। দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুযায়ি, শয়তানের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আদম ও হাওয়া যে আদি পাপ করেছিলেন তার ফলেই মানব জাতি আল্লাহর কাছ থেকে পতিত হয়ে শয়তানের করায়ত্ব ও মৃত্যুর অধিন হয়েছিল। ঈসা মসিহার মৃত্যু ছিল শয়তান অথবা মৃত্যুর কাছে আল্লাহর দেয়া মুক্তিপন। অর্থাৎ, ঈসার মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে শয়তান ও মৃত্যুর কবল থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আদি খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে ঈসার মৃত্যু ও পুনরুত্থান একসাথে আলোচনা হয়েছে, একটা থেকে আরেকটাকে বিচ্ছিন্ন করে নয়। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে ঈসার মৃত্যু ও পুনরুত্থানের যে কাহিনি ছড়িয়ে পরেছিল তা তৎকালিন মানুষের কাছে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যু থেকে মুক্ত হয়ে অমরত্ব লাভের প্রমান হিসাবেই হাজির হয়েছিল। ঈসাকে বিশ্বাস করে আর সকল মানুষও অমরত্বের ভাগিদার হতে পারে, এই ছিল খ্রিস্টান ধর্মের জনপ্রিয়তার সবচাইতে প্রধান কারন। ইসলাম ধর্মে মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের যে বিশ্বাস প্রচলিত আছে, তার উৎস ঈসার মৃত্যু ও পুনরুত্থানের খ্রিস্টিয় চিন্তা। মুসলমানরা তা বিস্মৃত হয়েছে, কারন ইসলামে মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের বিশ্বাসকে ঈসার পুনরুত্থানের ধর্মতত্ত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। হতে পারে যে, সাত শতকে যে সময়ে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে, সে সময় মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের ধারণাটি মধ্যপ্রাচ্যে এতোটাই সাধারণ বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল যে তা আর ঈসার পুনরুত্থানের ধর্মতত্ত্বের উপর নির্ভরশিল ছিল না।

আবার কুরবানির প্রশঙ্গে ফিরি। প্রশ্ন হলো, খ্রিস্টান রিফর্মিস্ট ধর্মতাত্ত্বিক যারা ঈসার মৃত্যুকে কুরবানির সাথে তুলনা করেছেন, তারা কি এই যুক্তি দিয়ে পশু কুরবানিরও বিরোধিতা করেছেন? ফরহাদ মজহারের দাবি মেনে নিলে করার কথা। রিফরমিস্ট আন্দোলন সম্বন্ধে যতোটা পড়েছি তাতে এই ধরণের কিছু কখনো পাই নাই। যদি এমন কিছু রিফর্মিস্ট আন্দোলনের নেতারা করেও থাকেন, আমার জানা নাই। ফরহাদ মজহার যেহেতু তার লেখায় কোন তথ্যসূত্র উল্লেখ করেন নাই, তাই তার বক্তব্যের উৎস যাচাই করে দেখারও উপায় নাই। তবে এইটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি যে পশু কুরবানির বিরোধিতা রিফর্মিস্ট আন্দোলনের কোন কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল না, ঐতিহাসিক কারনেই তার কোন প্রয়োজনও ছিল না। শুধু রিফর্মিস্ট খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বই নয়, পশু কুরবানির বিরোধিতা আমার জানামতে কোনকালেই কোন খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল না। অর্থাৎ, পরমের সন্তুষ্টির জন্য প্রাণী উৎসর্গ করার বিধানের বিরোধিতা করা খ্রিস্টিয় ধর্মতত্ত্বে এসেনশিয়াল কিছু না, যেমনটা ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন। এমন কি ফরহাদ মজহারের দাবি অনুযায়ি – প্যাগান বা বর্বরদের বিপরীতে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম প্রমাণের জন্যই পশু কোরবানি খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করেছে। এখানে প্যাগান ও বর্বর এই দুই শব্দের একত্র ব্যবহারের সমস্যা নিয়ে পরবর্তি পর্বে লিখবো। কিন্তু এই নিষিদ্ধের ঘটনা কবে ঘটেছে, কোথায় ঘটেছে, খ্রিস্ট ধর্মের কোন কেতাব বা কোন চার্চ এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তা ফরহাদ মজহার লেখেন নাই। ওল্ড টেস্টামেন্ট তো বটেই, নিউ টেস্টামেন্টেও কুরবানির বর্ণনা পাওয়া যায়। ফলে কোন খ্রিস্টান চার্চ প্রবল উৎসাহে ‘পরমের উদ্দেশ্যে পশু উৎসর্গে’র বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে এই ধারণা করা কঠিন। কোন খ্রিস্টান চার্চ কখনো এই কাজ করেছে বলে আমার জানা নাই। তবে রোমান আমলে, বিশেষ করে চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দিতে বেশ কয়েকজন রোমান সম্রাট প্যাগানদের পশু কুরবানির বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, এবং এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে খ্রিস্টান ধর্মিয় নেতাদের প্রভাবও ছিল। ফরহাদ মজহার সেখান থেকেই কুরবানির বিরুদ্ধে খ্রিস্ট ধর্মিয় নিষেধাজ্ঞা আবিস্কার করেছেন কি না জানি না। কিন্তু এইসব নিষেধাজ্ঞাকে কোনভাবেই ‘সকল প্রকার’ কুরবানির বিরুদ্ধে ‘খ্রিস্ট ধর্মিয় নিষেধাজ্ঞা’ বলা যায় কি? কেউ সেই দাবি করলে তা জোর করে দাবি করা হবে। কারন এই খ্রিস্টান তৎপরতা শুধু প্যাগানদের পশু কুরবানির বিরোধিতা ছিল না, ছিল সকল প্রকার প্যাগান ধর্মাচারের বিরোধিতা।

উল্লেখ করা দরকার যে, রোম সম্রাটরা ও রোমানরা গণহারে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার কয়েক শতাব্দি পার হয়ে যাওয়ার পরেও রোমানদের মধ্যে বহু প্যাগান আচার অনুষ্ঠান টিকে ছিল। খ্রিস্টান ধর্মিয় নেতারা পাবলিক স্পেসে এইসব ধর্মাচারের বিরোধিতা করতেন। অন্যদিকে এইসব আচার অনুষ্ঠান যারা পালন করতেন তারা এগুলোকে রোমিয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে প্রচার করতেন। কিন্তু রোম সম্রাট থিওডোসিয়াস, আরকেডিয়াস, হনোরিয়াস প্রমুখের প্রচেষ্টায় শুরুতে প্যাগানদের পশু কুরবানিকে পাবলিক স্পেসে ও পরবর্তিতে প্রাইভেট স্পেসেও নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু‘প্যাগানদের পশু কুরবানি’ নিষেধাজ্ঞা আর ‘পরমের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি’র নিষেধাজ্ঞা তো এক জিনিস না। রোম সম্রাটদের এইসব নিষেধাজ্ঞা ছিল প্যাগান ধর্মাচারের বিলোপের উদ্দেশ্যে, খোদ ‘পশু কুরবানি’র বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নয়। অর্থাৎ ইব্রাহিম, মুসা কিংবা ঈসার মাবুদ যে আল্লাহ, সেই মাবুদের উদ্দেশ্যে কুরবানি দেয়া তো নিষিদ্ধ হয় নাই। যদি খ্রিস্টান ধর্মে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানি নিষিদ্ধই হতো তাহলে এই আধুনিক যুগেও গ্রিস, আরমেনিয়াসহ কিছু ভুমধ্যসাগরিয় অঞ্চলের খ্রিস্টানরা যে পশু কুরবানি দেয় তা কিভাবে দেয়? এসব অঞ্চলের ক্যাথলিক এবং গ্রিক অর্থডক্স খ্রিস্টানরা হাজার বছর ধরে এই ধরণের কুরবানি দিয়ে আসছে। ক্যাথলিক বা অর্থডক্স চার্চ কখনো তা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বন্ধ করে নাই। অবশ্য পশ্চিম ইউরোপিয় প্রটেস্টান্ট খ্রিস্টানরা এখন এর বিরুদ্ধে সমালোচনা করে, দাবি করে যে খ্রিস্টান ধর্মে পশু কুরবানির কোন গুরুত্ব নাই। কিন্তু স্থানীয় ক্যাথলিক পুরোহিতদের দাবি হলো যে, এটা তাদের ঐতিহ্যের অংশ এবং এই কুরবানির গোস্ত গরিব ও বৃদ্ধদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়। পাঠক হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, খ্রিস্টান ধর্মে কোন নিষেধাজ্ঞা যদি নাই থাকে তাহলে খ্রিস্টানদের মধ্যে কুরবানির ব্যাপক প্রচলন নাই কেনো? এর উত্তর খুব সম্ভবত পাওয়া যাবে খ্রিস্টান ধর্মের উৎপত্তিতে। খ্রিস্টানরা ছিল আদিতে জেরুজালেমের দ্বিতীয় বায়তুল মুকাদ্দাস কেন্দ্রীক বহু ইহুদী (Second Temple Judaism) মজহাবের একটি। সত্তর খ্রিস্টাব্দে রোমানদের হাতে বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ইহুদীরা আর কুরবানি দেয় না, কারন তাদের কুরবানি দেয়ার জায়গাটিই ধ্বংস হয়ে গেছে। বায়তুল মুকাদ্দাস কেন্দ্রীক মজহাব থেকে জন্ম হওয়ার ফলেই হয়তো খ্রিস্টিয় প্রথম শতক থেকেই খ্রিস্টানরাও কুরবানি দেয় না। আর পরবর্তিতে খ্রিস্টান ধর্মের বিকাশ হয়েছিল ঈসা ও খ্রিস্টান সাধুদের শাহাদাতের ধর্মতত্ত্ব কেন্দ্র করে, যার ফলে পশু কুরবানি কখনোই খ্রিস্টান ধর্মে জনপ্রিয় হয় নাই। আর রোম সম্রাটদের কুরবানি নিষিদ্ধের সাথে ক্রুসেডেরই বা সম্পর্ক কি? কোনই ঐতিহাসিক সম্পর্ক নাই। পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টান রাজারা তাদের যেসব যুদ্ধকে ক্রুসেড বলে প্রচার করেন সেগুলো সংগঠিত হয়েছে পশ্চিমা রোম সাম্রাজ্যের পতনেরও অনেক পরে, এবং খ্রিস্টান রিফর্মিস্ট আন্দোলনের পূর্বে। অথচ পরস্পর বিচ্ছিন্ন এসব বিষয়কে ফরহাদ মজহার এক সুতায় মালার মতো গেথে ফেলেছেন।

যুগান্তর পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত ‘কোরবান’ নামক একটি লেখা ফরহাদ মজহার শুরুই করেছেন ‘ধর্ম’ নামক নামচিহ্নের মধ্যে দিয়ে একটি ধারণাকে সার্বজনীন প্রচার করার সমস্যা নিয়ে। তার ভাষায় – কোনো একটি ধারণাকে সার্বজনীন গণ্য করলে পর্যালোচনামূলক চিন্তার জন্য সেটা বিশাল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এইক্ষেত্রে তার সাথে পুরোপুরি একমত। কিন্তু তিনি নিজেই প্রবলভাবে এই সমস্যায় আক্রান্ত, আর তার প্রমান বিশেষ করে এই লেখাটিতে পদে পদে পাওয়া যায়। ধর্ম বলতে বাংলাদেশের আধুনিকেরা সেকুলারিজমের বিপরীত একটি বর্গ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না, ফরহাদ মজহার এই দাবি করেছেন। কিন্তু তিনি নিজেই বাংলাদেশে ‘সেকুলারিজম’ নামচিহ্নকে ইসলাম বিরোধী একটি বর্গের অধিক মর্যাদা দিতে চান না। এই ধরণের বহু স্ববিরোধিতা তার লেখায় পাওয়া যায়। সেকুলারিজম শব্দের যে সার্বজনিন অর্থ তিনি ও তার অনুসারিরা দাড় করাতে চান, সেই বিষয়ে এই লেখায় আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ নাই। অন্য কোন লেখায় করার ইচ্ছা আছে। প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু কুরবানির ধর্মতত্ত্ব নিয়ে ফরহাদ মজহারের আলোচ্য এই দুইটি লেখাতেই তিনি নির্দ্বিধায় ‘খ্রিস্টান’ ও ‘ইসলাম’ নামচিহ্নের মধ্যে কিছু সার্বজনিন ধারণার প্রচার করেছেন, যার সমালোচনা না করলে চলে না। বহুল প্রচলিত এইসব শব্দ নিয়ে সর্বদাই নন এসেনশিয়ালিস্ট আলোচনা করা সম্ভব হয়তো না, এবং নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিন্তু ফরহাদ মজহার সেই চেষ্টাই করেন নাই, বরং ঠিক উলটো চেষ্টা করেছেন। কুরবানি বিষয়ে তিনি খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের যে সার্বজনিন বৈশিষ্ট তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তার ভ্রান্তিগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে কিছু আলোচনা করেছি। সামনের পর্বে আরো করবো। পাশাপাশি কুরবানি বিষয়ে খ্রিস্টান ও ইসলামি ধর্মতত্ত্বের যে তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেছেন, তারও বিচার বিশ্লেষন করবো।

বলে রাখি যে, ফরহাদ মজহারের ভুল বের করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এবং ইসলাম অথবা খ্রিস্টান নামগুলোকে কেন্দ্র করে এসেনশিয়ালিস্ট চিন্তা ভাবনা প্রচার করাও এসেনশিয়ালি কোন খারাপ কাজ না। কিন্তু ফরহাদ মজহার এই লেখাগুলোতে এই দুই ধর্মের কুরবানি বিষয়ক ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করতে গিয়ে দুই ধর্মের যে সার্বজনিন রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তার সাথে কলোনিয়ালিজম, রেসিজম, ক্রুসেড ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচিত শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার করে যে ‘রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব’ প্রচার করছেন তার সমালোচনা করাই এই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য। বিভিন্ন কারনে এই রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বকে বিপদজনক মনে করি, আর সেই বিপদের মোকাবেলা করতেই লিখতে বাধ্য হলাম।

(চলবে)

নোটসঃ
১।মজহার(২০১৫)ইসলামের কোরবানি, ‘মনের পশু’ তত্ত্ব ও খ্রিস্ট ধর্ম। সেপ্টেম্বর ২০১৬। chintaa.com
২।Packer.J.I. (1973). What did the Cross Achieve? The Logic of Penal Substitution. Tyndale Biblical Theology Lecture.
৩।Salzman.M.R.(2011).The End of Public Sacrifice. CHANGING DEFINITIONS OF SACRIFICE IN POST CONSTANTINIAN ROME AND ITALY. ed. J. Knust and Z. Varhelyi.Oxford University Press.P.177.
৪।Georgoudi.S.(1989).Sanctified Slaughter in Modern Greece: The “Kourbania” of the Saints.THE CUISINE OF SACRIFICE AMONG THE GREEKS. ed. Detienne and Vernant. University of Chicago Pres.pp.183-197.
৪।মজহার(সেপ্টেম্বর ১০)কোরবানি। উপসম্পাদকীয়। যুগান্তর।

৮ thoughts on “কুরবানি প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহারের ‘রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব’ ও তার বিপদ। পর্ব – ১

  1. ফরহাদ মজহার অত্যন্ত অজ্ঞ, ইতর
    ফরহাদ মজহার অত্যন্ত অজ্ঞ, ইতর ও ধান্দাবাজ একটা লোক। এ ধরণের লোক কিভাবে বুদ্ধিজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় সেটাই অবোধগম্য। এদের বিরোধিতা, লেখা খণ্ডানোও বিরক্তিকর।

    পাগান বা বর্বরদের বিপরীতে খ্রিস্টধর্মের মাহাত্ম প্রমাণের জন্যই পশু কোরবানি খ্রিস্টধর্ম নিষিদ্ধ করেছে।

    খ্রিস্ট মিথের দোহাই দিয়ে মানবিক চিন্তার কিছু মানুষ ইহুদিদের মধ্যে প্রচলিত পশু কোরবানি কু-প্রথা বন্ধ করেছে। এত আগে এ কাজটা করা হয়েছে যে তা বিস্ময়কর। আমরা আজকের যুগেও কোরবানির অমানবিক দিকটা তোলে ধরতে পারিনা। অথচ মজহার নামক বদ লোকটি একে কিভাবে ব্যাখ্যা করল!

    কোরবানি নিয়ে ভিন্ন একটা ভাবনা উঁকি দেয় মনে। মুহাম্মদ খ্রিস্টধর্মের বিপরীতে ইহুদিদের কাছ থেকে কোরবানির ধারণাটা নিতে গেলেন কেন? মুহাম্মদ ও যারা ইসলাম ধর্ম তৈরী করেছেন তারা ইহুদিদের দ্বারা বড্ড বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন।

    1. “মুহাম্মদ খ্রিস্টধর্মের
      “মুহাম্মদ খ্রিস্টধর্মের বিপরীতে ইহুদিদের কাছ থেকে কোরবানির ধারণাটা নিতে গেলেন কেন?”
      তিনি ইহুদিদের কাছ থেকে নেন নাই; তিনি নিয়েছেন মক্কার নিজের জ্ঞাতি প্যাগানদের কাছ থেকে।

    2. আপনারা ওদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ,
      আপনারা ওদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ, পেইড এজেন্ট হিসাবে দেখেন, ওরাও আপনাদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ, পেইড এজেন্ট হিসাবে দেখে। কাটাকুটি হয়ে যায় এভাবে।

  2. ফরহাদ মজহারের এই রাজনৈতিক
    ফরহাদ মজহারের এই রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব প্রচার না বুঝে নয়, বুঝে শুনে স্বজ্ঞানেই করছে। এসবের বিরুদ্ধে ব্যাপক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

    1. প্রচুর হয়ে গেছে, ইংরেজী ভাষায়
      প্রচুর হয়ে গেছে, ইংরেজী ভাষায়। সার্চ ইঞ্জিনগুলো ব্যবহার করে সিনট্যাক্স ফিল্টারকৃত সার্চ দিলে আসে। ইউজনেটে প্রচুর পড়ে আছে অবশিষ্টাংশ।

  3. আপনারা ওদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ,
    আপনারা ওদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ, পেইড এজেন্ট হিসাবে দেখেন, ওরাও আপনাদেরকে প্রতারক, অজ্ঞ, পেইড এজেন্ট হিসাবে দেখে। কাটাকুটি হয়ে যায় এভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *