“শবদাহ” একটি আদিম বর্বর প্রথা…..


হিন্দু ধর্ম পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্মগুলোর একটি। যা আজও অপরিবর্তিত বা আংশিক পরিবর্তিত হয়ে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে। প্রতিটি আচার অনুষ্ঠান, রীতি নীতি হয়তোবা প্রাচীনকালের মতো পালিত হয় না, কিন্তু খুব বেশি পরিবর্তিত হয় নি, এই আধুনিক যুগে এসেও। অঞ্চলভেদে, গোত্রভেদে কিছু নতুন দেব দেবী, রীতি নীতি, আচার অনুষ্ঠান ও সংস্কার যুক্ত হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অনেক প্রথা মানুষের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে অবলুপ্ত হয়েছে। মানুষ যুগে যুগে সমাজের রীতি নীতি, প্রথাগুলোকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। সময় এগিয়ে চলছে, সমাজ পরিবর্তিত হচ্ছে, আর সমাজের পরিবর্তন মানেই সমাজে বিদ্যমান রীতি, নীতি, আচার অনুষ্ঠান, প্রথা ও ধর্মের পরিবর্তন। এটা একদিনে হয় না, এটা হতে লাগে শত সহস্র বছর। যুগে যুগে মনিষীদের দ্বারা নতুন নতুন নিয়ম নীতি, সংস্কার, আচার অনুষ্ঠান, সংস্কার সৃষ্টি হয়েছে, হয়েছে প্রতিটি ধর্মের শাখা প্রশাখার সৃষ্টি।

যেমন, প্রাচীন কালে হিন্দুধর্মে সতীদাহ প্রথা ছিল না, এটা অনেক পরে যুক্ত হয়। আবার তা সময়ের সাথে মিলিয়ে গেছে, মানুষের ভালোর জন্যে, সমাজের কল্যাণের নিমিত্তে। আবার প্রাচীনকালে নরবলীর প্রচলন থাকলেও, এখন তা শুধুই একটি বর্বরদের বর্বর একটি প্রথা। নরবলী, সতদাহ শব্দগুলো শুনলে গা শিহরিত হয়। মানুষ আস্তে আস্তে এসব কুসংস্কাচ্ছন্ন প্রথাকে ঠাই দিয়েছে ডাস্টবিনে। মানুষ, সমাজ ধীরে ধীরে আধুনিক হচ্ছে, সাথে চিন্তা ধারাও হচ্ছে বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিসম্মত। আগেরকার দিনের বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ আজকে শূনের কোঠায়। আগে ৬০ বছরের দন্তহীন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ বিয়ে করত ৯ বছরের শিশুকে। ফলে কিছু বুঝে উঠার আগেই সে বিধবা। একেকজন বিয়ে করতো ৮-১০ করে। এখন আর এসবের অস্তিত্ব নেই। মানুষ যত বেশি শিক্ষিত হচ্ছে, সমাজ থেকে কুসংস্কার তত বিদায় নিচ্ছে।

“শবদাহ” পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রথাগুলোর একটি। আদিম যুগে পৃথিবীর সব সভ্যতায় এই প্রথা বিদ্যমান ছিল। সময়ের সাথে অনেক প্রাচীন প্রথা বিলুপ্ত হলেও এটি আজও টিকে আছে কিছু সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মে। পৃথিবী যত এগিয়েছে, মানুষ যত আধুনিক হয়েছে, প্রাচীন প্রথাগুলো হারিয়ে গেছে কালের অতল গহ্বরে। পূর্বে সব সভ্যতার মানুষই ছিল বহুঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী অর্থাৎ বিভিন্ন দেব দেবীর পুজা করতো। মানুষ তার চিন্তা, যুক্তি ও মনীষার দ্বারা উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন ধর্মের। সৃষ্টি হয়েছে একঈশ্বরবাদের ধারনা। শুরু করেছে মৃতদেহকে কবর দেয়া, সময়ের প্রয়োজনে, মানুষের মননের বিকাশের সাথে সাথে।

শবদাহ প্রথাটা মূলত টিকে আছে হিন্দু, বৌদ্ধসহ প্রাচীন কিছু ধর্মে। আমার দৃষ্টিতে এটা শুধু একটা বর্বর প্রথাই নয়, প্রাচীন মানুষের নৃশংস রুপ। সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে কিন্তু এই ভয়ঙ্কর প্রথা বদলাতে পারি নি। একটা মানুষ মারা গেলে কি ভয়ঙ্করভাবেই না তাকে চিতায় পোড়ানো হয়। যদি আপনি দেখে থাকেন তাহলে আর আপনাকে বলতে হবে না। তবু বলি, মৃত মানুষটাকে তার ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজনরা খুবই নৃশংসভাবে কুড়াল, দা, কোদাল ও লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুচিয়ে পোড়ে। যা স্বাভাবিক মস্তিস্কের মানুষের জন্য অবলোকন করা অসম্ভব।

অনেক ভেবেছি কিভাবে একজন মানুষের পক্ষে তার পিতামাতাকে এভাবে পোড়ানো দেখা সম্ভব? অবশেষে একটা সাত্বনা সমাধান বের করেছি, হয়তোবা সে তার বাবা মার মৃত্যুতে এতই হতবিহ্বল হয়ে পরে যে তার কোন ইন্দ্রিয়ই কাজ করে না। অথবা সে ছোটবেলা থেকে এসব দেখে অভ্যস্ত নতুবা সে জানে এটার আর কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু এটার বিকল্প আছে। সমাধি হল দাহ করার উত্তম বিকল্প সমাধান। হিন্দু ধর্মের ইস্কন বা বৈষ্ণব মতালম্বিরা মৃতদেহ সমাধি করে।

৮ thoughts on ““শবদাহ” একটি আদিম বর্বর প্রথা…..

  1. সবদেহ কিভাবে সতকার করা হয় তার
    সবদেহ কিভাবে সতকার করা হয় তার মাঝে বর্বরতা বা সভ্যতার কিছু আছে কিনা সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান। সম্ভবত আরবাঞ্চলে জ্বালানী কাঠ পাওয়া দুস্কর ছিল বিধায় মৃতদেহ মাটিতে পুতে রাখার সংস্কৃতি গড়ে উঠে, যা মুহাম্মদ/ইসলাম গ্রহণ করেছে। মুহাম্মদ ভারতে জন্মগ্রহণ করলে শবদাহই ইসলামের প্রথা হতো। সম্প্রতি এক সাবেক মুসলিম বন্ধু জানালো, সে তার মৃতদেহ দাহ করার জন্য ‘উইল’ করেছে।
    মুসলিমরা বাবা-মা মরার পর যত তারাতারি সম্ভব কবর দিয়ে ঝামেলা-মুক্ত হতে চায়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনে তারা আর কোনদিন কবরস্থানে ঢু-ও মারে না, যদিও শিক্ষার সাথে তার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। অথচ চাইনিজ সংস্কৃতিতে শবদেহ নিয়ে ৩ দিন ধরে পরিবার-পরিজন শোক করে, তারপর দাহ করে ছাই সংগ্রহ করে রাখে সারা জীবন ভর। প্রত্যেক মৃত্যু বার্ষিকীতে মন্দিরের গিয়ে স্মরণ করে মৃত বাবা-মা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, পর দাদা-দাদী, পর নানা-নানী পর্যন্ত।

    1. আমি আমার বেশ কয়েকজন স্বজনকে
      আমি আমার বেশ কয়েকজন স্বজনকে দাহ করা দেখেছি। ব্যক্তিগতভাবে পদ্ধতিটা আমার কাছে ভয়ংকরই মনে হয়েছে। তাড়াতাড়ি পোড়ানোর জন্য হাত পা ভেঙ্গে দেয়, বারবার বাঁশ দিয়ে লাশটাকে খোঁচাচ্ছে। এটা আমার কাছে বর্বরতাই মনে হয়েছে…………।

      1. আমার মনে হয়, এটা যার যার
        আমার মনে হয়, এটা যার যার ভাবনা বা সংস্কৃতির ফসল মাত্র। কেউ বলতে পারে, লোকটা কেমন মানুষ নিজ পিতাকে মাটিতে পুতে ফেলল; আবার কেউ বলতে পারে, লোকটা কেমন মানুষ নিজ পিতাকে আগুনে পুড়িয়ে দিল। দু’টো প্রক্রিয়াই অনুরূপ মানসিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, যা হচ্ছে নির্মমতা। ছিটে-ফোটা কমবেশি থাকতে পারে, তথাপি দুই-ই নির্মমতার পরিচায়ক।

  2. কবর সংরক্ষন করার প্রবনতা থেকে
    কবর সংরক্ষন করার প্রবনতা থেকে মুক্তির পথ হচ্ছে শবদাহ। তারচেয়ে বড় মুক্তি দেহদান। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পোঁড়ানোর বিকল্পতো আছে।

  3. আমি আপনার লেখাটির সাথে একমত।
    আমি আপনার লেখাটির সাথে একমত। যদি আমাদের সবার সামর্থ্য থাকত তাহলে প্রিয়জনদের মৃতদেহ আমরা মমি করে রাখতাম। আমরা যারা মৃত্যুর পর প্রিয়জনদেরকে কবরে রেখে আসি তারা পরিবেশ বিশুদ্ধ রাখার জন্য তা করতে বাধ্য হই।কিন্তু অত্যন্ত যত্নের সাথে, আদরের সাথে প্রকৃতি প্রদত্ত শরীরটাকে কবরে রাখা হয়। তবে মৃতদেহ পোড়ানোটা বিকৃত এবং অমানবিক মনে হয় আমার কাছে।আমি এটা নিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কারও কারও সাথে আলোচনাও করেছি। আজ যাকে আমি ভালবাসি তার শরীরটার প্রতি অত নির্মম হওয়া কি করে সম্ভব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *