এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেই!

খুব বেশী খারাপ লাগতেছে। চোখ বন্ধ করলেই মাথার ভেতরে চলতে থাকে কিছু হাহাকার আর আকুতির প্রতিধ্বনি, বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টাটাও ব্যর্থ হবার দৃশ্য, জীবনের শেষ কথাগুলো প্রিয়জনদের কাছে পৌছে দেওয়ার আকুল আবদার। প্রতিটা ঘটনাই আলাদাভাবে আঘাত করে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে।
“ভাই আমার মাকে বইলেন,আমাকে মাফ করে দিতে,আমার বাড়ি পিরোজপুর ,হুলার হাট। ভাই আমি মারা গেলে লাশ টা বাড়িতে পাঠাইয়েন…”
“ভাই দরকার হলে আমার পা কেটে বের করেন,তবুও আমাকে বাচান,আমি আর এই যন্ত্রনা সইতে পারিনা।”
“ভাই আমাকে একটা হাতুড়ে দেন,আমি নিজেকে বের করতে পারব…”
“শ্বাস নিতে পারছিনা,লাশের গন্ধে মারা যাবো,ভাই একটু অক্সিজেন আনতে পারবেন।”
“ভাই আমাকে এখান থেকে বের করেন,আমার একটা ২ বছরের ছেলে আছে,ওর জন্য আমাকে বাচান,ওরে দুধ খাওয়াতে হবে।”
ওরা কেউ কোটি টাকার স্বপ্ন দেখেনি কোনদিন, শুধু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল আরো কিছুদিন। ওদের শেষ চেষ্টা ছিল প্রিয়মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাওয়া। মনে আছে একটা মুভি দেখে অনেক কান্না পেয়েছিল। ভেবেছিলাম এত নিষ্টুরতাও আছে পৃথিবীতে? কিন্তু এই অতি সাধারণ মানুষগুলোর জীবনে ঘটে যাওয়া এই নির্মম ঘটনার প্রত্যকটা দৃশ্য আলাদাভাবে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে কষ্টের সিনেমাকেও হার মানায়। আমি অনেক শক্ত মনের মানুষ অন্তত তাই ভাবি নিজের ব্যাপারে। নিজের আত্বীয়-সজন মারা গেলেও কান্না সংবরণ করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারি। কিন্তু গত রাতে যখন একটা টিভি চ্যানেলে শাহানার ঘটনাটা দেখলাম নিজেকে আর সংযত রাখতে পারিনি। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদলাম অনেক্ষন আর দোয়া করলাম পরম করুনাময় যেন পরম আদরে আমার এই বোনটিকে গ্রহণ করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটার চেয়েও যেন হাজার গুন বেশী সুখে থাকে অনন্তকাল।
যারা মারা গেছে তাদের জন্য কষ্ট পাওয়া ছাড়া আমরা যারা সুস্থ সুন্দরভাবে বেঁচে আছি তাদের কিছুই করার নেই। নিজেকে সান্তনা দেওয়া যেতে পারে যারা বেঁচে আছে তাদেরকে রক্ত, টাকা-পয়সা বা যেভাবে সম্ভব সাধ্যমত তাদের পাশে থেকে সাহায্য করে। যারা মারা গেছে এবং পঙ্গুত্ব বরন করেছে তাদের পরিবার, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েও নিজেকে সান্ত্বনা দেয়া যেতে পারে। বায়োলজিক্যালি, তারা অনেক কষ্ট ভোগ করার পর মারা গেছেন এবং মৃত্যুর পরপর তাদের যন্ত্রনার সাথে অস্তিত্বও শেষ হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য। এই পৃথিবীর আলো, বাতাস, আনন্দ কিংবা বেদনা কিছুই তাদেরকে আর স্পর্শ করবেনা। মৃত্যু সার্বজনীন সব প্রানীর ক্ষেত্রে সো আমাদের সবাইকেই মারা যেতে হবে এটা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেই।
ধর্মীয়ভাবে চিন্তা করেও নিজেকে সান্ত্বনা দেই… হাদীসে আল্লাহর পথে যুদ্ধে শহীদ হওয়া ছাড়াও আরো ৭ ধরণের শহীদি মৃত্যুর কথা উল্লেখ আছে
১। যে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় সে শহীদ
২। যে পানিতে ডুবে মারা যায় সে শহীদ
৩। যে প্লুরিসি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় সে শহীদ
৪। যে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন রোগে মারা যায় সে শহীদ
৫। যে আগুনে পুড়ে মারা যায় সে শহীদ
৬। বিল্ডিং ধ্বসের কারনে যে মারা যায় সে শহীদ। আর
৭। যে মহিলা সন্তান দিতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ।
আবু দাউদ ১৪/৩১০৫
প্রতিটা মানুষের নিজ অবস্থান থেকে মানবতার দাবীতে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসা উচিৎ। আর যারা নাস্তিক নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে মুখে ফেনা তুলেছেন এতদিন তাদের বলছি এই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আপনাদের মত ধর্মপ্রানদের ঈমানী দায়িত্ব।

৪ thoughts on “এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেই!

  1. সাভারের শতশত শ্রমিকের লাশ
    সাভারের শতশত শ্রমিকের লাশ আমাদের গালে কষে একটা থাপ্পড় দিয়ে গেছে। জানি এর পরও নির্লজ্জের মতন আমরা আমাদের দিন কাটাবো। ভুলে যাবো শতশত চাপা পড়া হাহাকার।

    ইস্টিশনে আপনাকে স্বাগতম।

    1. ঘটনাগুলো হয়তো অতিসাধারন
      ঘটনাগুলো হয়তো অতিসাধারন মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া কিন্তু কষ্টের তীব্র অনুভুতিগুলো সবার জন্যই এক। ধন্যবাদ ডাঃ আতিক লেখাটি পড়ার জন্য!

  2. সকল সৃষ্টিকেই মৃত্যুর স্বাদ
    সকল সৃষ্টিকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে, এটি চির সত্য। তারপরও কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নেয়া সত্যিই বড় কঠিন ! তেমনি বেশ কিছু মুত্যুর ঘটনা জাতি প্রত্যক্ষ করলো সাভারের রানা প্লাজার ধ্বসে..
    সকল মৃতের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি… আমিন…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *