“ব্যাকা-কারণ”

জানালার পাশে মেহগনি গাছের পাতায় শরতের বাষ্পভেজা বাতাসের দোল খাওয়া দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম একখানা অনুগল্প হলে খারাপ হয় না। তো যেই কথা সেই কাজ। সে অনেকদিন আগের কথা। রাজা রামমোহন রায় একদা বিয়ে করলেন। বেশ ভালোই আয়োজন করে ধুমধামাকা বাদ্য বাজিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমা-ইঁদুর-বিড়াল মরার পর একে একে দিন-রাত ভালোই কেটে যেতে থাকলো। কিছুদিন অতিবাহিত হয়ে গেলো এভাবে। এরপর আকস্মিকভাবে রাজা সাহেব লক্ষ্য করলেন তাহার স্ত্রী রাতে ঘুমায় না। অনেক ফন্দি-ফিকির করেও লাভ হলো না। একে একে শহরের সব ডাক্তার দেখানো শেষ। কিন্তু রাজার বউয়ের চোখে ঘুম নাই। সারারাত বউয়ের সাথে জেগে থাকতে হয় অগত্য। সারাদিন সমাজ সংষ্কার করে রাজা সাহেবের রাতে বেজায় ঘুম পায়, কিন্তু ঘুমানোর সুযোগ কই? রাজা সাহেব মহা বিপদে পড়ে গেলেন। এভাবে চলতে থাকলো কিছুদিন, মাঝে মাঝে রাজা সাহেব ঘুমিয়ে পড়তেন কিন্তু বদ মেজাজি বউ এমন প্যারা দিতো যে কাঁচা ঘুম থেকে রাজা সাহেব উঠে যেতেন আর ঘুমানোর সুযোগ থাকতো না। যেমন শীতের রাতে কম্বলের উপর পানি ঢেলে দিতো অথবা গরমের রাতে ফ্যানের সুইচ বন্ধ করে বটি হাতে নিয়ে বসে থাকতো। রাজা সাহেবের নড়াচড়ার সুযোগ থাকতো না। রাজা সাহেব মহা বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে চাইলেন।

একদিন রাজা সাহেব মনের দুঃখে চলে গেলেন সুন্দরবনে। মনস্থির করলেন আর পালন করবেন না সংসার ধর্ম।বনের পশুপাখির সাথে বাস করবেন। বনের মধ্যে হাটতে হাটতে একটা অতিকায় সুন্দরী গাছের নিচে রাজা সাহেব বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে আসন পাতলেন। কিন্তু বিধিবাম, বনের নির্জনতা রাজা সাহেবকে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গেলো। রাজা সাহেব ও কষে একটা ঘুম দিয়ে ফেললেন।

ঘুম থেকে উঠে রাজা সাহেবের চক্ষু-চড়কগাছ। একি, মাথার কাছে বসে আছেন এক ঋষি টাইপের লোক। বয়স প্রায় ১০০০ বছর। চুল দাড়ি একেকটা কয়েক মাইল লম্বা , ইয়া বড় বড় জট আর হাতে বেলচার মতো নখ। রাজা সাহেব প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেন, কিন্তু পরে ঋষি কর্তৃক আশ্বস্ত হওয়ার পর রাজার ভয় কমে আসলো।

ঋষি সাহেব পরিচয় দিলেন- তার নাম হু লা লা বাবা। তারপর তিনি রাজা সাহেবের পরিচয় জানতে চাইলেন এবং বনে আসার কারণ জানতে চাইলেন। রাজা সাহেব নিজের পরিচয় দেওয়ার পর বনে আসার পূর্ণবৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। রাজার দুঃখের কথা শুনে হু লা লা বাবা মনে খুব কষ্ট পেলেন এবং হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। রাজাও কান্না শুরু করলেন। রাজা সাহেবের কান্না আর হু লা লা বাবার কান্নায় এলাকায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলো। হু লা লা বাবা চোখ মুছতে মুছতে রাজা সাহেবকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করলেন। বনের পশু-পাখিদের এসময় দূরে দাঁড়িয়ে কাদতে দেখা গেলো। অনেককে হোগলা পাতার রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে দেখা গেলো। একটা হনুমান অনেক দূর থেকে একটা ইয়া লম্বা টেলি লেন্স দিয়ে কিছু ছবি তুললো। একটা বাঁদর রাজা সাহেবের সাথে সেলফি তুললো। আর কিছু ছিপছিপে দেহের হরিন কড়া মেকাপ নিয়ে কাদতে পারছিলো না। কিছুক্ষণ পর পরিবেশ হালকা হওয়ায় তাহারা কিছু সেলফি শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মুখ ভেটকিয়ে, কোমড় বাকা-তেড়া করে তারা বেশ কিছু সংখ্যক সেলফি তুললো।

অতিকায় সুন্দরী গাছটার নিচে বিশাল মিলন মেলা শুরু হয়ে গেলো। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক লাগলো হু লা লা বাবার কাছে। তিনি এক ফাকে রাজাকে ডেকে নিয়ে গেলেন একটু দূরে একটা ঝোপালো গোলপাতার ঝোপের নিচে। এবার তিনি রাজাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার বুদ্ধি বের করতে চাইলেন। রাজাও বাবার পা ধরে মাটিতে শুয়ে থাকলো। বাবা ধ্যানে বসলেন। অনেকক্ষণ ধরে ধ্যান করার পর হু লা লা বাবা সম্ভাব্য একটা উপায় খুজে পেতে সমর্থ হলেন।

অতঃপর রাজাকে তুলে সামনে বসিয়ে তিনি বললেন, উপায় বের হয়ে গেছে। রাজা মশাই তো এক লাফে ঝোপ থেকে বের হয়ে গেলেন। তারপর শান্ত হয়ে বাবার সামনে বসলেন। বাবা রাজাকে বললেন- এই নাও কাগজ আর এই নাও বাশের কঞ্চির কলম আর কালির দোয়াত। এবার তুমি বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লেখা শুরু করো এই কাজ আগে কেউ করে নাই, মানে পারে নাই বোধ হয়। রাজা গাই-গুই করলেন কিন্তু বাবার কথার জোর ছিলো তাই বাবার কথার বাইরে তিনি গেলেন না। শুরু করে দিলেন বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লেখা। চলতে থাকলো ব্যাকরণ রচনা। এবং একদিন রাজা লিখেই ফেললেন। তারপর হু লা লা বাবার কাছে পান্ডুলিপি খানা জমা দিলেন। হু লা লা বাবা প্রুফ দিতে গিয়ে কয়েকবার ঘুমিয়ে পড়লেন। অতঃপর পান্ডুলিপিখানা রাজা মশাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললেন- খাসা জিনিস হইছে, এবার বাড়িতে যাও। বাড়িতে গিয়ে তোমার স্ত্রীকে আজকে রাতে ইহা পড়ে শোনাবে। রাজা বাড়িতে ফিরে গেলো এবং হু লা লা বাবার আদেশ মোতাবেক পান্ডুলিপি খানা বাড়ির সদর দরজা থেকেই পড়া শুরু করিলেন। পড়তে পড়তে ঘরে প্রবেশ করিলেন। দেখলেন উনার বদমেজাজী বউ শুয়ে আছে। রাজা কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ব্যাকরণ পাঠ করে চলিলেন। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হলো এবং রাজা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন তাহার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছেন। সে এক বিশাল ঘুম ঘুমানোর পর রাজার বউয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এবং তারপর রাজা রামমোহন রায় এবং তাহার বউ বাকী জীবন সুখে শান্তিতে কাটাতে লাগলেন। কারণ রাজার বউয়ের ঘুম না আসলে রাজা মশাই বসে পড়তেন ব্যাকরণের পান্ডুলিপি খানা হাতে আর দুই পাতা পড়ার সাথে সাথেই বউ ঘুমিয়ে কাদা কাদা।।

08-09-16,
Dhaka

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *