ইস্কন মন্দির হামলা ও আমার কিছু কথা

পুজার্চনার হেতু নামাজে বিঘ্ন ঘটার অজুহাতে সিলেটের কাজলশাহে ইসকন মন্দিরে কিছু সংখ্যক মুসুল্লির হামলার ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি নিন্দনীয় কাজ এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক চরিত্রটা যে এই ঘটনার ফলে খুব স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই ঘটনার হেতু অধিকাংশ নাস্তিক মুসলমানদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছে বা ইসলাম ধর্মের সহিংসতার কথা ঘটা (আসলেই কি ইসলাম সহিংস নয়?) করে প্রচার করছে। আবার অনেক শান্তিকামী মডারেট মুসলমান(যদিও মডারেট মুসলমান বলে কোরানে কোন টার্ম নেই) ও সুশীল ব্যক্তিবর্গ বেশ ইনিয়ে বিনিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন যে আসলেই নামাজের সময় ঢাক ঢোল পিটিয়ে পুজার্চনা করাটা উচিৎ হয়নি। তারা এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নাস্তিকদের দৃষ্টিভংগির কড়া সমালোচনাতেও লেগেছেন। তাদের অভিযোগ শুধু সময়জ্ঞানহীন ইস্কনী পুন্যার্থিদের উপর নয়, নাস্তিকদেরকেও তারা কাণ্ডজ্ঞানহীন ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দেয়ার অবকাশ পাচ্ছেন।

ইস্কনীদের সাথে ঘটে যাওয়া আমার একটা ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বলি ( তখন এটা ফেসবুকেও শেয়ার করেছিলাম)। আমাদের ওখানকার একটা পুরনো আশ্রম ইস্কনিরা তাদের মন্দিরে রূপান্তর করে ফেলে। এই আশ্রমটার আশেপাশের লোকেরা হেটে চলাচলের জন্য এর ভেতর দিয়ে গমনাগমন করত শর্টকাট হিসেবে। তো একদিন আমিও পাশ্ববর্তি কাঁচাবাজার থেকে মাছ কিনে আসছিলাম আশ্রমের ভেতর দিয়ে। ইস্কনিরা এর দখল নেবার পর প্রবেশমুখে সতর্কবার্তা লাগিয়ে দিয়েছিল যে মাছ কিংবা মাংস নিয়ে এর ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। আমি তাদের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করেই মাছ নিয়ে প্রবেশ করি, যথারীতি তাদের একজন পূজারী আমাকে বাধা প্রদান করে। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, আপনার বিশ্বাস মতে ভগবান কৃষ্ণ সর্বত্র বিরাজমান, তাই না? সে হ্যাঁ বোধকভাবে মাথা নাড়ানোর পর বলেছিলাম সর্বত্র বিরাজিত ভগবানের পৃথিবীতে মাছ বেচে থাকলে, তাতে বিচরণ করলে যদি ভগবানের পৃথিবী অপবিত্র না হয়, তাহলে মন্দির অপবিত্র হবে কেন? ভবগানকে মন্দিরে আটকে নয়, তাকে সর্বত্র মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিন। যে ভগবান মাছকে সৃষ্টি করতে পারেন, মাছের স্পর্ষে সে ভগবানের মন্দির অপবিত্র হবার কথা না। সেই পূজারী সেদিন আমাকে তো ছেড়েই দিয়েছিল, পরবর্তীতে সে আমার দোকানে এসে অনেক সময় কাটাতো আর বলত ভাই আপনার কথাটার অনেক অর্থ আছে, বড় ভাবনার একটা কথা।

সে যাই হোক, মন্দির হামলার প্রেক্ষিতে ইনবক্সে এবং আমার ফেসবুক ওয়ালে এই বলে আমাকে নিন্দা জানানো হয়েছে যে, আমি প্রকৃত মুক্তমনা কিংবা নাস্তিক নই, আমি ইসলাম বিদ্বেষী। না হলে ইস্কন মন্দির হামলার ঘটনায় শুধু কেন মুসলমানদেরকেই দায়ী করছি, কেন ইস্কনীদের সময়জ্ঞানহীনতাকে প্রশ্ন করছি না। তাদের অভিযোগগুলোর পেছনে যুক্তি হলো একজন নাস্তিকের কাছে নামাজ যা, পূজাও তা। আমি কেন পুজারীদের পক্ষ নিলাম, আমার তো নিরপেক্ষ থাকা উচিৎ ছিল। হ্যাঁ, তাদের অভিযোগ সত্য যে আমি হামলার ঘটনায় শুধুই মুসলমানদের সমালোচনা করেছি, তাদের হিংসাত্মক মনোভাবের রসাত্মক উপস্থাপনায় বিদ্রুপ করেছি। তাই বলে, মুসলমানদের বিরুধীতা এই প্রমান করে না যে আমি হিন্দুদের পূজার্চনাকে ভাল বা করনীয় কিছু বলে উপস্থাপন করতে চেয়েছি। আমি বরং হামলার ঘটনায় নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছি, এর বাইরে কিছু নয়। আপনি আপনার ধর্মীয় অধিকার থেকে একজনকে আক্রমণ করার বৈধতা দান করতে পারলে, একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে আমি কি পারি না নির্যাতিতের ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে কথা বলতে? আপনার যেমন নির্বিঘ্নে নামাজ পড়ার অধিকার আছে, তেমনি একজন হিন্দুরও কিন্তু তার পূজার্চনা করার অধিকার রয়েছে সমানভাবে।

হ্যাঁ, এটা হয়ত সত্য যে ইস্কনের মন্দিরে খামোখাই কেউ ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে আক্রমণ করেনি, করেছে নামাজের বিঘ্ন ঘটায়। ইস্কনী পূজারীরা নামাজের পর তাদের পূজার কাজ করতে পারত বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা কতটুকু যুক্ত? এমন যদি হয়, সান্ধ্যকালীন কোন পূজার সময় মন্দিরের পার্শ্ববর্তী কোন মসজিদে অনুরোধ করা হলো মাগরিবের নামাজ আধাঘন্টা পর আদায় করতে। বলবেন এটা কিভাবে সম্ভব? মাগরিবের নামাজের ওয়াক্ত তো থাকে মাত্র কিছু সময়, আধাঘন্টা পরে তা ক্বাজা হয়ে যাবে, মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে সুর্যাস্তের সাথে সাথেই। মাগরিবের নামাজের স্বল্প সময়ভিত্তিক বাধ্যবাধকতার কারণে তা পেছানোর কিংবা আগানোর কোন অবকাশ নেই। আমার জানামতে হিন্দুদের অধিকাংশ পূজার্চনা একেবারে ঠিক ঠিক লগ্ন ধরে পালন করতে হয়, একদণ্ড এদিক সেদিক হবার কোন সুযোগ থাকে না, একবার ভেবে দেখবেন কি ওয়াক্ত ভিত্তিক ইবাদত করার যেমন অধিকার রয়েছে মুসলামনদের, তেমনি লগ্ন ধরে পূজার্চনার অধিকার হিন্দুদের থাকা দরকার কী না!

আমার মত যারা ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকতায় অভিযুক্ত, এই বলে তাদের নিন্দা করা হয়েছে যে সত্যিই যদি নাস্তিকরা শান্তির পথে থাকতো, তাহলে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা না বলে সমজোতার কথা বলত। কিন্তু, নাস্তিকরা হামলার সময় মুসলমানদের নিন্দা করে বরং সংঘর্ষকে উস্কে দিয়েছে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই আমার মত নাস্তিকরা ইসলাম বিদ্বেষী, তারা সংঘর্ষকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছে, উল্টো শান্তিকামী সুশীল এবং মডারেট মুসলমানদের বিরুদ্ধেও তো একই অভিযোগ করা যেতে পারে যে আপনারা ক’জন সংঘর্ষ থামানোর জন্য চেষ্টা করেছেন? ধরে নিলাম, যারা হামলায় অংশ নিয়েছে তারা প্রকৃত মুসলমান নয়, তারা পথভ্রষ্ট, উগ্র, দুর্বৃত্ত। ভাই, সংঘর্ষের সময় কতজন প্রকৃত মুসলমান তা থামানোর চেষ্ট করেছেন সে পরিসংখ্যানটা কেউ দিতে পারবেন? একজন শান্তিকামী মুসলমান, একজন সুশীল হিসেবে সংঘর্ষের বিরুদ্ধে তো কাউকে দাঁড়াতে দেখলাম না, উল্টো নামাজের সময় ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পূজা করা ঠিক হয়নি বলে হামলার পক্ষে সাফাই গাইতেই দেখলাম তথাকথিত শান্তিকামী প্রকৃত মুসলমানদের। বলতে পারেন? ঢাক-ঢোল পিটানো ব্যতিরেকে কয়টা পূজার কাজ সাড়া যায়? আর ঢাক-ঢোলের শব্দ যদি নামাজের ব্যঘাত ঘটিয়েই থাকে, তাহলে ভেবে দেখুন তো ঢাকার মসজিদগুলোতে এত শব্দের মধ্যে কিভাবে নামাজ আদায় করছে শতশত মুসুল্লীরা?

আর শব্দ দূষণের কথাও যদি বলি, তাহলেও তো মুসলমানদের বিরুদ্ধে দেয়া যায় বিস্তর অভিযোগ। নামাজের সময় হলে দিকে দিকে শত শত মাইকে যে একযোগে আযান দেয়া হয়, তা কি শব্দ দূষণ নয়? বাদ দিলাম মুসলমানদের কথা, একটা মসজিদের পাশে তো ভিন্ন ধর্মের কেউ থাকতে পারে, থাকতে পারে একজন মরণাপন্ন রোগী। আপনার আজান অন্যের মনযোগে, কর্মে সমস্যা তৈরী করছে কি না, তা ভেবে দেখবেন কী? না কি এই অভিযোগের কারণেও আমার মত নাস্তিকেরা ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা পাবে! বাদ দেন আযানের কথা, এটা নামাযের অপরিহার্য একটা অংশ, লোকেরাও শুনে শুনে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু, সামনে শীতকাল আসছে। শত শত মাইক লাগিয়ে, সারা রাত ধরে ওয়াজ মাহফিল করার সময় কী অন্য কারও স্বাভাবিক জীবনাচরনে, ধর্ম পালনে কোন সমস্যা হয় না? বাদ দিলাম মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশে ভিন্ন ধর্মের অধিকারের কথা, ওয়াজ মাহফিলের পাশে থাকা রোগীদের জন্যও কি শান্তিকামী মুসলমানেরা একদন্ড ভেবে থাকেন?

নাস্তিকদের বিরুদ্ধে ইসলাম বিদ্বেষের অভিযোগই নয়, তাদের বিরুদ্ধে বড় একটা অভিযোগ যে, নাস্তিকরা নাকি ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে ইউরোপ আমেরিকায় যাবার জন্য। এই অভিযোগটা শুধু যে মুসলমানরা করে থাকে তা নয়, হালের অনেক তথাকথিত প্রকৃত(!) নাস্তিকের মুখেও শোনা যায়। খুব ভাল কথা, একটা চ্যালেঞ্জ কি কোন ধার্মিক কিংবা প্রকৃত (!) নাস্তিক নেবেন যে আপনি লেখালেখি করে আমেরিকা কিংবা ইউরোপ গিয়ে একবার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। আর ইউরোপ আমেরিকাতেই বা যাওয়া কেন বাপু? ওখানে কি ইসলামী দেশের চেয়ে সুখ-শান্তি বেশি? আমি তো বরং দেখি, নাস্তিকের কোন দেশ নাই, সুযোগের প্রয়োজন নাই, সে তার কর্মদক্ষতায় পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই গড়ে নিতে পারে সুন্দর স্বচ্ছল একটা জীবন। আমাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চেনেন বা জানেন, প্রয়োজন হলে তাদেরকে স্বাক্ষীর জন্য ডাকতে পারি, কিভাবে আমি আমার জীবনকে গড়ে নিয়েছিলাম তা বলার জন্য। সফল ব্যবসার পাশাপাশি, একটা সরকারী চাকরীও কোন ধরনের ঘুষ উৎকোচ ছাড়াই জুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজের দক্ষতায়। নাস্তিকের জন্য কোন বৈদেশিক সাহায্য লাগে না জনাব, সে জানে কিভাবে জীবনকে গড়তে হয়, উপভোগের উপকরণ আহরণ করতে হয়। আপনারাই বরং লালায়িত থাকেন দেশ ছেড়ে ইউরোপ আমেরিকায় গিয়ে জীবন ধারন করার জন্য, নাস্তিকেরা নয়। নাস্তিকদেরকে শুধু বেঁচে থাকার গ্যারান্টিটুকু দিন, কথা বলার সুযোগ দিন। দেশ পালটে যাবে।

সে যাই হোক, কথা উঠেছিল মন্দির হামলা নিয়ে। হ্যাঁ, নাস্তিক হিসেবে যে কোন ধরনের ধর্মীয় কার্যকলাপের বিপক্ষেই আমার অবস্থান। কিন্তু যখন অধিকারের প্রশ্ন আসবে, তখন আমার কাছে একজন বিপদাপন্ন মুসলমানের পাশে দাঁড়ানো যেমন কর্তব্য, তেমনই কর্তব্য হলো একজন বিপদাপন্ন অমুসলিমের পাশে দাঁড়ানো। এতে আমাকে ইসলাম বিদ্বেষী বলেন আর যাই বলেন তাতে আদতেই একজন মানবতাবাদী নাস্তিক হিসেবে আমার কিছু যায় আসে না।

১ thought on “ইস্কন মন্দির হামলা ও আমার কিছু কথা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *