জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম

পাঠান শের শাহ ঢাকার চকবাজার এলাকায় একটা কেল্লা বানিয়েছিলেন। পাঠানদের পরাজিত করে পরবর্তিতে মুঘোলরা বাঙলা জয় করে। কিন্তু বাঙলার উপর নিয়ন্ত্রন পোক্ত করতে আর বারো ভুইয়াদের বিদ্রোহ সামাল দিতে মুঘোলদের বহু বছর লেগেছে। এসময়ই ঢাকার কৌশলগত গুরুত্ব বুঝতে পেরে তারা সুবা বাঙলার রাজধানী হিসাবে শহরটিকে গড়ে তোলে। মির্জা নাথানের বাহারিস্তান মোতাবেক, মুঘোল সেনাপতি ও সুবা বাঙলার সুবেদার ইসলাম খান পঞ্চাশ হাজার সেনা সমেত ঢাকায় প্রবেশ করার সময় চকবাজারের এই কেল্লাটিকে মেরামত করে নিজের বাসভবনে পরিণত করেন। পরবর্তি সুবেদার ইব্রাহিম খানকেও বিদ্রোহ সামাল দিতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে, তিনি এই কেল্লাটির আরো বিস্তৃতি ঘটান। ব্রিটিশ আমলের আগে পর্যন্ত এই কেল্লাটি ছিল মুঘোল নায়েবে নাজিমদের বাসভবন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাঙলা দখল করে নেয়ার পর তৎকালিন নায়েবে নাজিমকে তার বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করে কেল্লাটির নিয়ন্ত্রন নিয়ে নেয়। ধিরে ধিরে ব্রিটিশরা কেল্লাটি কেন্দ্র করে একটি জেলখানা গড়ে তোলে। বাঙলায় উপনিবেশ স্থাপনকারী আধুনিক ইউরোপিয় জাতিগুলোর ‘ডিসিপ্লিন এবং পানিশমেন্টে’র পদ্ধতির আমদানি হিসাবে মুঘোল কেল্লাটি একটি আধুনিক জেলে রূপান্তরিত হয়েছিল। তবে এই জেল শুধুমাত্র অপরাধীদের শাস্তির জায়গা ছিল না। এখানে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহীরা আটক থাকতেন, জেলের মধ্যে নেহায়েত শাস্তি মেনে নেয়ার বাইরেও তারা নানান মানবাধিকারের ও রাজনৈতিক দাবিতে বিদ্রোহ করতেন। জেল এমনিতেই একধরণের লিমিনাল স্পেস, তত্ত্বগতভাবে সেখানে অপরাধীরা প্রবেশ করে পাপমোচন করে নিরপরাধ হয়ে ওঠার জন্যে। কিন্তু উপনিবেশ স্থাপনকারী অপরাধীরা যখন সেই জেল চালায়, তখন জেলের মধ্যে ঘটা ন্যায় সঙ্গত বিদ্রোহ জেলকে আরো বেশি কিছুতে পরিণত করে। ঢাকার কেন্দ্রীয় জেলটিও এমন বহু ইতিহাসের সাক্ষি বহন করে। এই জেলতো শুধু জেল নয়, একটা হেটেরোটপিয়া।

ব্রিটিশরা যাওয়ার পরও পুরান ঢাকার এই জেলটির চরিত্র খুব পরিবর্তন হয়েছে বলা যায় না। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষের রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা জেলটিতে আটক থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনেকে আটক ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা স্বাধীন হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধারা জেলটিকে খুলে সবাইকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। পচাত্তরের ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী জাতীয় চার নেতাকে এই জেলটিতেই বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। এই জেলটিতেই সম্প্রতি বিচারিক প্রক্রিয়ায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ফাসিতে ঝোলানো হয়েছে। ফলে এই জেলটি বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাক্ষি হয়ে আছে। সাক্ষি হয়ে আছে একটি জাতির দাস হওয়ার, স্বাধীন হওয়ার, বেড়ে ওঠার। সাক্ষি হয়ে আছে বিচার ও অবিচারের। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই জেলটিকে ছাত্রাবাসে পরিণত করার যে আন্দোলন শুরু করেছে তা যে কতোটা বৈপ্লবিক এবং অসাধারণ একটি আন্দোলন তা কম কথায় লেখার ভাষা আমার জানা নাই। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে দেখছি। শত বছরের বিচার ও অবিচারের সাক্ষি বহন করা একটি হেটেরোটপিক স্পেসে’র মালিকানা দাবি করে স্পেসটির মধ্যে যে বৈপ্লবিক সম্ভাবনা জবির শিক্ষার্থীরা হাজির করতে চাচ্ছে তা শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নয়, গোটা জাতির ভবিষ্যত পালটে দেয়ার শক্তি রাখে বলে ধারণা করি। ফানোঁ যথার্থই লিখেছিলেন যে উপনিবেশিত জনতার স্বাধীনতার জন্যে প্রথম ও মৌলিক দাবি হলো মালিকানার দাবি। নিজের জমির উপরে যার মালিকানা নাই, তাকে স্বাধীন বলা যায় না। আমরা নামে স্বাধীন হয়েছি বটে, কিন্তু আমাদের নিজেদের সুন্দরবন অথবা তিস্তা নদীর উপরেই আমাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। জেলের জমিটিতো বাংলাদেশ সরকারেরই জমি। পাঠান, মুঘোল বা ব্রিটিশ রাজদের নয়। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তাহলে এই জেলের জমিতে ছাত্রাবাসের দাবি নিয়ে নেমে লাঠি, গুলি, টিয়ার শেলের মোকাবেলা করতে হচ্ছে কেনো?

শত শত বছরের পরাধীনতা ও বন্দিত্বের সাক্ষি ঢাকার বুকের এক টুকরো জমিতে স্বাধীন ও সম্ভাবনাময় জনতার মালিকানা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমর্থন জানাই। জবির শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আপনাদের বিজয় কামনা করি। আপনারা জিতলেই বাংলাদেশ জিতবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *