কিলো ফ্লাইট: মেঘ ফুঁড়ে ওরা এসেছিলো বজ্র হয়ে (Kilo Flight – They Were The Fire From The Clouds) – তৃতীয় পর্ব


পর্ব – ২ এখানে
২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
১১৫ হেলিকপ্টার ইউনিট
তেজপুর এয়ারবেস, আসাম

সকাল ৮ টায় ডাকোটাতে বাগডোগরা থেকে তেজপুরে এসে নামলেন ফ্লাঃ লেঃ সিংলা। অফিসার কমান্ডিং ১১৫ নং হেলিকপ্টার ইউনিট টারমাকে অপেক্ষায় ছিলেন যা একজন ফ্লাঃ লেঃ এর জন্য ভিআইপি মর্যাদার ব্যাপার। এয়ার অফিসার কমান্ডিং তেজপুরের সাথে দেখা করবার পর উনি বললেন,

– “যদি তুমি “চেতাক” (এলিউট হেলিকপ্টারের ভারতীয় বিমান বাহিনীর দেয়া নাম) একা চালাতে জানো তাহলে তা তোমার জন্য প্রস্তুত আছে। সেটাকে নিয়ে ডিমাপুর চলে যাও। চেতাকের জন্য সব ধরনের রক্ষনাবেক্ষন সহযোগিতা তুমি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই পাবে। আর কোন প্রশ্ন আছে? না থাকলে রওনা দাও।”

এরপর একটি ম্যাপ, একটি ভিএইচএফ সেট আর এনডিবি (নন ডিরেকশনাল বিকন, বিমানে ব্যবহৃত নেভিগেশন যন্ত্র) ফ্রিকোয়েন্সি জেনে আরো কিছু সরঞ্জাম ইস্যু করে ডিমাপুরের দিকে একলা উড়ে চললেন সেই “চেতাক” (Alouttee-III) নিয়ে।


পর্ব – ২ এখানে
২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
১১৫ হেলিকপ্টার ইউনিট
তেজপুর এয়ারবেস, আসাম

সকাল ৮ টায় ডাকোটাতে বাগডোগরা থেকে তেজপুরে এসে নামলেন ফ্লাঃ লেঃ সিংলা। অফিসার কমান্ডিং ১১৫ নং হেলিকপ্টার ইউনিট টারমাকে অপেক্ষায় ছিলেন যা একজন ফ্লাঃ লেঃ এর জন্য ভিআইপি মর্যাদার ব্যাপার। এয়ার অফিসার কমান্ডিং তেজপুরের সাথে দেখা করবার পর উনি বললেন,

– “যদি তুমি “চেতাক” (এলিউট হেলিকপ্টারের ভারতীয় বিমান বাহিনীর দেয়া নাম) একা চালাতে জানো তাহলে তা তোমার জন্য প্রস্তুত আছে। সেটাকে নিয়ে ডিমাপুর চলে যাও। চেতাকের জন্য সব ধরনের রক্ষনাবেক্ষন সহযোগিতা তুমি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই পাবে। আর কোন প্রশ্ন আছে? না থাকলে রওনা দাও।”

এরপর একটি ম্যাপ, একটি ভিএইচএফ সেট আর এনডিবি (নন ডিরেকশনাল বিকন, বিমানে ব্যবহৃত নেভিগেশন যন্ত্র) ফ্রিকোয়েন্সি জেনে আরো কিছু সরঞ্জাম ইস্যু করে ডিমাপুরের দিকে একলা উড়ে চললেন সেই “চেতাক” (Alouttee-III) নিয়ে।

২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
ডিমাপুর এয়ারফিল্ড, নাগাল্যান্ড
এতোদিন একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্টের অধীনে ১৫ জন এয়ারমেন দিয়ে তদারকি চলছিলো ডিমাপুর এয়ারফিল্ডের। মাঝে মাঝে কিছু ডাকোটা উড়ে আসতো সেনা নিয়ে, সেই কাজের তদারকি আর এয়ারফিল্ডের মেইন্টেন্যান্সের জন্য এই অল্প জনবলই যথেষ্ঠ ছিলো। জোড়হাট এয়ারবেসের স্টেশন কমান্ডার চন্দন সিং এর অধীনে ছিলো এই এয়ারফিল্ড। সকালেই চন্দন সিং স্কোঃ লীঃ চৌধুরী সহ ডিমাপুর এসে পৌছেছেন। এর আগে ২৬শে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বাঙ্গালী বৈমানিকেরা ডিমাপুরে এসে জড়ো হয়েছিলেন।

২৭শে সেপ্টেম্বর যশোর আর আগরতলার কাছাকাছি সেক্টরগুলো থেকে বাঙ্গালী গ্রাউন্ড ক্রুদের বাছাই করে নিয়ে আশা হয়। সর্বমোট ৪৯ জন গ্রাউন্ড ক্রু উপস্থিত হন, এদের সহ ৯ জন বৈমানিক মিলে সর্বমোট ৫৮ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হবে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম এয়ার উইং। তিনটি বিমানের জন্য নয়জন বৈমানিককে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে দেয়া হয়।

এলিউট-৩ এর জন্যঃ
স্কোঃ লীঃ সুলতাম মাহমুদ (পিএএফ)
ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম (পিএএফ)
ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ (পিআইএ)

ডাকোটার জন্যঃ
ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ (প্লান্ট প্রটেকশন পাইলট)
ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম (পিএএফ)
ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন (সিবা-গেইগী)

ডিসি-৩ এর জন্যঃ
ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তার (পিআইএ)
ক্যাপ্টেন খালেক (পিআইএ)
ক্যাপ্টেন মুকিত(প্ল্যান্ট প্রটেকশন পাইলট)

ইন্সট্রাকটর পাইলট হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করবেনঃ
ডাকোটার জন্য স্কোঃ লীঃ সঞ্জয় কুমার চৌধুরী
অটার এর জন্য ফ্লাঃ লেঃ ঘোষাল
এলিউট-III হেলিকপ্টারের জন্য ফ্লাঃ লেঃ সিংলা।

সকাল ১১টা, এয়ার চীফ মার্শাল পিসি লাল এবং এয়ার মার্শাল দেওয়ান আরো কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ ডিমাপুরে পৌছেছেন। এ কে খন্দকারের অধীনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমানসেনারা তাদের এয়ারফিল্ডে অভ্যর্থনা জানান। এ কে খন্দকার এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী গঠনের ঘোষনা দেন। এরপর প্রধান অতিথি হিসেবে পিসি লাল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য শুভকামনা জানান এবং দেশ মাতৃকার লড়াইয়ে নিজেদের উজার করে দিতে বলেন। শুরু হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এ কে খন্দকার হলেন বাহিনী প্রধান। স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদকে করা হয় এয়ার উইং এর অফিসার কমান্ডিং। উনি অক্টোবরের ১৪ তারিখ থেকে দ্বায়িত্ব বুঝে নেন।

সেদিনই সকালে চন্দন সিং দুইজন বাঙ্গালী পাইলটের সাথে ফ্লাঃ লেঃ সিংলার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তৃতীয়জন উপস্থিত হতে পারেননি তখনো। তারা ছিলেন ফ্লাইট লেঃ বদরুল আলম, ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দীন এবং স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদ। চন্দন সিং তাকে বললেন,

– “এক সপ্তাহের মধ্যে এদের অপারেশনাল করতে হবে।“

ফ্লাঃ লেঃ সিংলা বিস্মিত হয়ে বললেন,

– “যদি আইএএফ এর সিলেবাস ফলো করি, তবে টানা সাতদিন সাতরাত কাজ করলেও তা সিলেবাসে উল্লেখ করা দিবা এবং রাত্রীকালীন কনভার্শনের জন্য নুন্যতম উড্ডয়ন ঘন্টার সমান হবেনা।“

চন্দন সিং জবাব দিলেন,

– “আইএএফ এর সকল নিয়ম এখন থেকেই ভুলে যেতে পারো। কিভাবে সম্ভব করবে তোমার ব্যাপার, কিন্তু অবশ্যই করতে হবে।“

(২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিমান বাহিনী দিবস হিসেবে উদযাপন করা হতো। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে বিভিন্ন বাহিনীর জন্য আলাদাভাবে দিবস পালন না করে ২১ নভেম্বরকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে একত্রে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।)

৪ অক্টোবর, ১৯৭১
থিয়েটার রোড, কলকাতা
গতকাল সকলে কলকাতা ফিরেছেন। আজ অস্থায়ী সরকারে কর্মরত বিমান বাহিনী অফিসারদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলছে নতুন গুঠিত এয়ার উইং এর নাম কি দেয়া যায় তা নিয়ে। ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম প্রস্তাব করলেন,

– “এর নাম ‘কিলো ফ্লাইট” রাখা যেতে পারে। “Khondokar” নামের প্রথম অক্ষর “K” নিয়ে “কিলো ফ্লাইট” (সামরিক বাহিনীতে অক্ষরগুলোকে নিজেদের ব্যবহারের সুবিধার্থে আলাদারুপে প্রকাশ করা হয়, যেমনঃ A=Alpha, B=Bravo, C=Charlie, D=Delta etc )।“

ইতিমধ্যে মুক্তিবাহিনীতে ব্যক্তির নাম নিয়ে ব্রিগেড গঠিত হয়েছিলো, তাই এ কে খন্দকারের প্রচেস্টাকে সম্মান জানাতে এই নামকরন যুক্তিযুক্ত ছিলো। এই নামের আড়ালে বিমান বাহিনীর কার্যক্রমও ছমদনামে চালানো যেত যা নানা ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করতো। সর্বসম্মতিক্রমে এই নাম গৃহিত হলো।

৪ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম অপারেশনাল ইউনিটের নাম হলো “কিলো ফ্লাইট”!

৭ অক্টোবর, ১৯৭১
ডিমাপুর এয়ারফিল্ড, নাগাল্যান্ড
গত একসপ্তাহ যাবত সকাল, দুপুর এবং রাতে বিরামহীন উড্ডয়ন এবং প্রশিক্ষন চলেছে। বাঙ্গালী বৈমানিকদের হেলিকপ্টারে অভিজ্ঞতা না থাকার জন্য ফ্লাঃ লেঃ সিংলার কাজ আরো দুরুহ হয়ে গেছে। ফিক্সড উইং বিমানের পরিচালন পদ্ধতিতে দীর্ঘ্যদিনের অভ্যস্থতা, তাদের বয়স এবং মানসিক অবস্থা সব মিলিয়ে কাজটা এতো অল্প সময়ে অসাধ্যই ছিলো। হোভারিং এর সময় হেলিকপ্টার পুরা এয়ারফিল্ড জুড়ে হেলছে দুলছে আবার ফাইনাল এপ্রোচে স্পিড কন্ট্রোলে অভ্যস্ত করতে গিয়ে উনার ঘাম ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু সবকিছু পেরিয়ে নির্ধারিত সময়েই উনি চন্দন সিং কে জানালেন,

– “আমার লোকেরা দিন রাত ফ্লাই করবার জন্য সম্পূর্ন প্রস্তুত।“

চন্দন সিং জবাব দিলেন,

– “নেভিগেশন ফেজের জন্য রাতের মধ্যে তোমাদের জোড়হাট এটিসিতে দেখতে চাই।“

৮ অক্টোবর, ১৯৭১
জোড়হাট এয়ার বেস, নাগাল্যান্ড
কোন ধরনের বিশ্রাম নেয়ার সুযোগই পাননি ফ্লাঃ লেঃ সিংলা। জোড়হাটে উপস্থিত হতে হয়েছে তাদের। সেখানে একটি চেতাক, সিরিয়াল নং-৩৬৪ (ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এলিউট-৩ চেতাক নামে পরিচিত ছিলো) একটি ট্রান্সপোর্ট বিমানের মাধ্যমে উড়িয়ে আনা হয়েছে ইতিমধ্যে। এই চেতাকে দুটি মাইস্টায়ার জঙ্গী বিমানের রকেটপড মাউন্ট করা ছিলো দুপাশে। প্রতি পডে সাতটি করে মোট চৌদ্দটি রকেট ছিলো, যা পেয়ার হিসেবে কিংবা সবগুলো একত্রে (পেয়ার/সালভো) নিক্ষেপ করা যেতো। সালভো/পেয়ার এর সিলেকশন সুইচ ছিলো ক্যাপ্টেন্স কন্ট্রোল কলামে। দুই ব্যারেলের একটি মেশিনগান হেলিকপ্টারের পাটাতনে সাইড ফায়ারিং পজিশনে মাউন্ট করা ছিলো। বামদিকের স্লাইডিং দরজাটি এয়ার গানারের সুবিধার্থে অপসারন করা হয়।

এই ৩৬৪ নং সিরিয়ালের আর্মড ভার্সন এলিউট-৩ হেলিকপ্টারটিতে কয়জন আর্মামেন্ট ফিটার এবং অনেক অনেক রকেট নিয়ে চন্দন সিং কে কো পাইলটের সিটে বসিয়ে ফ্লাঃ লেঃ সিংলা ডিমাপুরে উড়ে যাবেন কিছুক্ষন পর। বাংলাদেশ বিমান বাহিনিতে যোগ হবে প্রথম ঘাতক পতঙ্গ!!

(পরে এতেও ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমা ফেলার জন্য ব্যবস্থা করা হয়। খুব নিচু দিয়ে উড়তে হয়, তাই আর্মার প্রোটেকশনের জন্য এর তলদেশে এক ইঞ্চি পুরু স্টিল প্লেট লাগিয়ে একেও অতি অল্প সময়ে যুদ্ধের উপযোগী করে তোলে আমাদের বিমানসেনারা।

এর বাইরে কিছুদিনের মধ্যেই কানাডার তৈরি অটার বিমানটির সামরিকীকরনের প্রক্রিয়া শেষ হবে। রকেটপড লাগিয়ে এটিকে যুদ্ধের উপযোগী করা হয়। এলিউটের মতই ১৪টি রকেট নিক্ষেপণের ব্যবস্থা করা হয় এতে পেয়ার/সালভো মোডে। পেছনের দরজা (কারগো ডোর) খুলে লাগানো হয় একটী ৩০৩ ব্রাউনিং মেশিনগান। বিমানের টেইল সেকশনে স্থাপন করা হয় ৩ টি ২৫ পাউন্ড বোম র্যা ক। বোমাগুলো স্বয়ংক্রিয় ছিল না, বলে হাত দিয়ে পিন খুলে নিক্ষেপ করতে হতো। অটারের গতি ছিল ঘণ্টায় ৮০ মাইল। আর ৩ দিন পরেই ১১ অক্টোবর অটারটি জঙ্গী বিমানে রুপান্তরিত হয়ে ওয়ার্কশপ থেকে ফেরত আসবে।

ডিসি-৩ বিমানটিকেও বোমা ফেলবার জন্য উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়। পাচটি র্যারকের প্রতিটি থেকে ১০০০ পাউন্ডের একটি করে বোমা ফেলা যেতো।)

৯ অক্টোবর, ১৯৭১
ডিমাপুর এয়ারফিল্ড, নাগাল্যান্ড
গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং সকালেই ফ্লাঃ লেঃ সিংলার প্রশিক্ষনের অবস্থা দেখতে আসলেন। উনি বললেন ফ্লাঃ লেঃ সিংলা যেনো তার প্রশিক্ষনার্থী বৈমানিকদের দ্রুত সঠিক নিশানায় রকেট নিক্ষেপে পারদর্শী করে তোলেন। সিংলা গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং কে একটু পাশে আসবার অনুরোধ করলেন ব্যক্তিগত কথা বলবার জন্য। উনি বললেন,

– “ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এ ধরনের হেলিকপ্টার দিয়ে কখনোই এমন কাজ করা হয়নি। আমার কোন ধারনাই নেই কিভাবে এসব করা যাবে। কে আমাদের গাইড করবে?“

চন্দন সিং হাসলেন, হেসে জবাব দিলেন,

– “ তুমি শিখে ফেলবে, আমি জানি।“

এই মুহুর্তে ডিমাপুরে দুইটি চেতাক ছিলো, একটী আর্মড ভার্সন, আরেকটি নরমাল প্যাসেঞ্জার ভার্সন। .আর্মড ভার্সন হেলিকপ্টারটী অতিরিক্ত আর্মামেন্ট লোডের কারনে এবং মোডিফিকেশনের কারনে কিছুটা ভারী হয়ে অন্যটির চেয়ে আলাদা আচরন করছিলো। সেটার সাথে অভ্যস্ত হওয়ার ব্যাপারটা আগে সেরে ফেলা হলো। এরপর গানসাইটের কিছু সমস্যা অদ্ভুত মোডিফিকেশনের মাধ্যমে দূর করা হলো।

এই সময় থেকে বাংলাদেশী এবং ভারতীয় প্রশিক্ষক বৈমানিকেরা সমস্ত নিয়ম কানুনের বাইরে নিজেদের বুদ্ধিতে চলার স্বাধীনতা উপভোগ করছিলো, ছিলোনা কোন রাল ফিতা গলায় লাগানো বড় অফিসারের হম্বিতম্বি। কিছুদিনের মধ্যেই তারা নিজেদের সক্ষমতাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। এই কিলো ফ্লাইটের বৈমানিক এবং তাদের প্রশিক্ষকেরা সহ বৈমানিক হিসেবে অনেকের লাভ করবেন নিজেদের দেশের জীবিত হিসেবে বীরত্বের সর্বোচ্চ সম্মান (উদাহরন হিসেবে ফ্লাঃ লেঃ সিংলা, বীর চক্র এবং তার সহ পাইলট স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদ, বীর উত্তম যখন একই মিশনে অংশ নেবেন তখন তা এমন এক কম্বিনেশন তৈরী করবে যাতে ভিন্ন দুই দেশের বীরত্বের সন্মাননা পাওয়া দুই পাইলট একত্রে মিশনে যাচ্ছেন, যা ইতিহাসে বিরল)।

১৬ অক্টোবর, ১৯৭১
ডিমাপুর এয়ারফিল্ড, নাগাল্যান্ড
গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং কিলো ফ্লাইটের ওসি স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদকে ডেকে পাঠিয়েছেন (উনি এর আগে ১৪ অক্টোবর ওসি কিলো ফ্লাইট হিসেবে অফিসিয়ালি দ্বায়িত্বভার গ্রহন করেছেন)। উনি সুলতান মাহমুদ এবং তার দেশের বিমানসেনাদের আর্মড এলুয়েট অথবা চেতাকটির জন্য একটী প্রতীক ডিজাইন করে তা একে দিতে বললেন। এছাড়া এটির জন্য একটি নাম অথবা নাম্বার দেয়ার জন্যও বললেন।

চন্দন সিং এর এই কথা সুলতান মাহমুদ এবং অন্যান্যদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃস্টি করলো। ব্যাপক শোরগোলের মধ্যে দিয়ে তারা এই ব্যাপারে আলোচনা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো যে হেলিকপ্টারের ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজারটিতে একটি লাল বৃত্ত আঁকবেন যার মধ্যে থাকবে সবুজ রঙে আকা বাংলাদেশের ম্যাপ।

এর বাইরেও ঠিক করা হলো যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জন্য এর কলসাইন হবে ইবিআর।

চন্দন সিং সম্মতি দিলেন, রাতারাতি আইএএফ এর রাউন্ডেল মুছে ফেলা হলো এবং চেতাকটি বাংলাদেশী রঙ পেলো।

এই প্রথম কোন এয়ারক্রাফট বাংলাদেশী নাম, কলসাইন এবং রাউন্ডেল পেলো। এবং তাও হলো বিমান বাহিনী প্রধানের কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই। যুদ্ধের অস্থির সময়ে এইসব ব্যাপার কারো জন্য থেমে থাকেনা।

এরপর থেকে সবার লগবুকেই ৩৬৪ এর পরিবর্তে ইবিআর দিয়ে সনাক্ত করা হতো এই হেলিকপ্টারটিকে। অটার এবং ডিসি-৩ বিমানটিও এই সময়েই নিজস্ব রঙ এবং নাম পায়।

অক্টোবর (তৃতীয় সপ্তাহ), ১৯৭১
ডিমাপুর এয়ারফিল্ড, নাগাল্যান্ড
ওয়ার্শপে সামরিকীকরনের জন্য নানা মোডিফিকেশন শেষে ফ্লাঃ লেঃ ঘোষাল অটার বিমানটিকে আবার উড়িয়ে এনেছেন কয়দিন আগে। উনার একজন প্রশিক্ষনার্থী বৈমানিক হলেন ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলম। সবাই আজ তার জন্য তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে রানওয়েতে অপেক্ষা করছে কারন উনি একটি একক মিশনে গিয়ে এখনো ফিরে আসেননি। যদিও যা তেল ছিলো তা বেশ অনেকক্ষন আগেই ফুরিয়ে যাবার কথা। পুরো ক্যাম্প তার খবরের জন্য অপেক্ষা করছিলো।

সুর্য্যাস্তের কিছুক্ষন পর উনি ফিরে আসলেন নিরাপদেই। জানা গেলো যে উনি পূর্ব পাকিস্তানের উপর দিয়ে লো লেভেল ফ্লাই করে কলকাতা চলে গিয়েছিলেন, এরপর ওখান থেকে রিফুয়েল করে ফেরত এসেছেন। ওইদিন আর কিছু হলোনা।

পরদিন রাতে ডিনারের পর ওসি কিলো ফ্লাইট, স্কোঃ লীঃ সুলতান মাহমুদ তার রিভলভার লোড করলেন এবং ফ্লাঃ লেঃ শামসুল আলমকে ডেকে পাঠালেন। সবাই ভয়ংকর কিছুর আশংকা করছিলো। রাতের পোকামাকড়ের ফিসফিসও নিস্তব্ধতার কারনে স্পস্ট শোনা যাচ্ছিলো। সুলতান মাহমুদ ফ্লাঃ লেঃ আলমকে নিয়ে রানওয়ের অন্ধকার অংশে চলে গেলেন।

একটা গুলির শব্দ শোনার ভয়ে ছিলেন সবাই। তারা ফিরে আসবার আগে ক্যাম্পের কেউ নিজেদের মধ্যেও একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেননি!!

অক্টোবর (শেষ সপ্তাহ), ১৯৭১
জোড়হাট এয়ারবেস, আসাম
গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং অপারেশন রুমে আলোচনা করছেন। চন্দন সিং ড্রাফট পরিকল্পনা একে খন্দকারকে বুঝিয়ে বললেন। সিদ্ধান্ত হলো যে ৩ নভেম্বর প্রথম আক্রমন পরিচালিত হবে। এলিউট নারায়নগঞ্জের গদানাইলে এবং অটার ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে আক্রমন করবে (ইস্টার্ণ রিফাইনারীর বদলে পরে বাঙ্গালী বৈমানিকদের আপ্ততির পরিপ্রেক্ষিতে লক্ষ্যবস্তু হবে ওখানের তেলের আধারগুলো)। আর ডাকোটা নিয়ে তেজগাও বিমানবন্দরে ক্যাপ্টেন মুকিত, ক্যাপ্টেন খালেক এবং ক্যাপ্টেন সাত্তার আক্রমন করবেন।

(পরবর্তীতে ডাকোটা মিশন বাতিল করা হয়। কারন ডাকোটায় ব্যবহৃত জ্বালানী তেলের কারনে উড্ডয়নের সময় এর ইঞ্জিনের পেছনে যে ধোয়া বের হয় তাতে অঙ্গিস্ফুলিঙ্গ থাকে যা অন্ধকার রাতে অনেকদুর থেকে দেখা যায়। তাই ডাকোটা দিয়ে অভিযান নিরাপদ নয়। এতে ডাকোটার বৈমানিকেরা অত্যন্ত হতাশ হন। পরে এই ডাকোটা কর্নেল ওসমানীর ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য দেয়া হয় মুক্তিবাহিনীর নানা সেক্টরে আসা যাওয়ার কাজে এবং পরিবহন কাজের জন্য)

পরিকল্পনা করা হয় যে বিমানগুলো আক্রমনের আগে বেশ কয়েক জায়গায় রিফুয়েল করবে এবং শেষ যে জায়গা থেকে উড্ডয়ন করেছে, অভিযান শেষে সেখানেই ফিরে আসবে। কৈলাশহরকে প্রাথমিকভাবে আক্রমন শুরুর ঘাটি হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

(৩ নভেম্বরের কিছু সময় আগে আক্রমনের পরিকল্পনা বাদ দেয়া হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য যান চলাচলে অসুবিধা এবং অপর্যাপ্ত সমর প্রস্তুতির কারনে। সেই বছর বেশ অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছিলো যে কারনে নভেম্বরেও ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য ভারী যান চলাচলের জন্য উপযুক্ত ছিলোনা নানা অন্যা দুর্গত এবং নদীবহুল স্থান। পরবর্তীতে আক্রমনের দিন নির্ধারন করা হয় ২৮ নভেম্বর। সেদিন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রতি আক্রমনের আশংকায় দমদম বিমান ঘাটী থেকে সকল বিমান অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। তবে শেষ মুহুর্তে সবুজ সংকেত না পাওয়ার অভিযানের দিন আরো পাচদিন পিছিয়ে ৩ ডিসেম্বর করা হয়। যা নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষনার দিন হয়ে যায়। তবে কিলো ফ্লাইটের অভিযানের মাধ্যমেই পুর্ব পাকিস্তানে প্রথম বিমান আক্রমন শুরু করবে মিত্র বাহিনী।

হয়তো পি সি লাল তার মৃদু হাসির দিয়ে বেশ কয়মাস আগে একে খন্দকারের অনুরোধ কিংবা দাবীর প্রতি সম্মতিই জানিয়েছিলেন, যার কারনে তার নিজের বাহিনীর আক্রমন সংযত রাখবেন। কিলো ফ্লাইটের আক্রমন শেষ হবার পরপর ভোররাত থেকেই শুরু হবে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একের পর এক এয়ার রেইড)

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *