ছাতা

আজকাল আকাশের মনের ভাব বোঝা বেশ মুশকিল। এই মাথার পোকা নাড়িয়ে দেয়া রোদ তো এই প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি। অবশ্য তাতে গরমের কমতি নেই। বৃষ্টি ভেজা শরীরে প্রাগৈতিহাসিক ঘামের গন্ধ এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে চলে যায়। কার শরীর থেকে গন্ধ আসে সেটা বোঝা যায়না। অপেক্ষাকৃত আধুনিক তরুণী পার্স থেকে বের করে পারফিউমটা একটু লাগিয়ে নেয়। কিন্তু তাতে হাজার বছরের পচে যাওয়া গন্ধ থেকে মুক্তি মেলেনা। বাসের হাতলে বাঁদরের মতো ঝুলতে ঝুলতে এইসবই ভাবে শফিকুর। যদিও শফিকুলের বৃষ্টিতে ভিজতে হয়না। বহুকাল আগে প্রেমিকার কিনে দেয়া ছাতাটা সে প্রায় সবসময়ই সাথে রাখে। একটা ডাঁট ভেঙ্গে গেছে তবু প্রেমিকার মায়া ছাপিয়ে ছাতার মায়া বড় হয়ে গেছে তার।

দু মিনিট চলা শেষে আবার সিগনালে থামে ভেঙ্গে প্রায় লুটিয়ে পড়া বাসটি। ৪ কিমি রাস্তা যেতে পাক্কা ১ ঘণ্টা। এইসব অবশ্য গা সওয়া হয়ে গেছে। বাসে ঝুলতে ঝুলতে প্রায়ই রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মেয়েদের দেখে সে। এই পথে তার বহুবার পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো হয়েছে। প্রেমিকার সাথে। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মেয়েদের মাঝে খুঁজতে থাকে সে। যদি দৈবক্রমে দেখা হয়ে যায় প্রেমিকার সাথে।

খানকির পোলা ড্রাইভার মানুষের বাচ্চা না। সিটে বসা এক ধোপদুরস্ত লোক চেঁচিয়ে ওঠে। পাশ থেকে আরেকজন টিপ্পনী কেটে বলে ওঠে, মানুষের বাচ্চা হইলে কি এইভাবে বাস চালাইত নাকি। এমনেই জ্যাম তারউপ্রে আবার একটু পর পর বাসা থামাইয়া প্যাসেঞ্জার লয়। শুয়োরের চেয়েও খারাপ এইগুলা। এমন সময় হেল্পার চেঁচিয়ে ওঠে, আরে ভাই একটু ভিত্রে যান, যাত্রী উঠবো। প্রায় সাথে সাথে একজন বেঁটে মতো লোক কষে একটা চড় বসিয়ে দেয়। বেচারা বাচ্চা হেল্পার গাল ডলতে ডলতে যাত্রী ডাকে। এই মিরপুর-বনানী-কাকলী-মিরপুর ১০-১১-১২।

আজ ভয়াবহ জ্যাম। সবগুলো রাস্তা জ্যামে আটকে গেছে। ট্রাফিক পুলিশ মাথার উপরের ছাতাটা কোথাও ফেলে ঘামে-গরমে ভিজতে ভিজতে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। শফিকুরের হঠাত খুব খারাপ লাগে। প্রেমিকাটি থাকলে এখন দুজন হাঁটতে হাঁটতে বেশ গল্প করে অফিসে চলে যাওয়া যেত। পুরনো দু- একটি কথা মনে করে হাসিও পায় তার। একবার এইরকম জ্যামের সময় হেঁটে হেঁটে যাবার সময় হঠাত একপাশের সিগনাল ছেড়ে দিল। তারা রাস্তার মাঝখানে তখন। প্রেমিকা প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিল যাতে গাড়ির গগনবিদারী হর্ণও ম্লান হয়ে গেলো। আর শফিকুর বাঙলা সিনেমার নায়কের মতো প্রেমিকাকে কোলে নিয়ে এক লাফে রাস্তা পার হয়ে গেল। তারপর পেছনে তাকিয়ে দেখা গেল সিগনাল ছেড়ে আসা একগাদা গাড়ি হঠাত ব্রেক করে তাদের পেছনে থেমে আছে। এমনকি রাস্তার দুপাশের লোকগুলোও তাদের তাকিয়ে দেখছিল।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত লাগে শফিকুরের। বাসের ভেতরটা অসহ্য লাগে। হঠাত তার মনে হয় এই মুহুর্তে প্রেমিকার দেখা পাওয়াটা খুব খুব দরকারি ছিল। অফিসেও দেরী হয়ে যাচ্ছে ওদিকে। বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে সে। ছাতাটা ভালোমতো মেলে সজোড়ে হাঁটা দেয়। রাস্তায় প্রচণ্ড কাঁদা আর আকাশে প্রকাণ্ড রোদ। যতো জোড়ে হাটে তারচেয়ে জোড়ে কাঁদায় প্যান্টের পেছনটা মাখামাখি হয়ে যায়। আবার ধীরে হাঁটলে আগুনে সেকা বাতাসে শরীর পুড়ে যেতে যায়।

মোড়ের রাস্তাটা পার হতে গেলে হঠাতই সিগনাল ছেড়ে দেয়। পুরনো রং উঠে যাওয়া গাড়িটি ঠিক পাশে এসে পড়লে শফিকুর আবিষ্কার করে গাড়ির সামনের সিটে আছে তার বহুকালের প্রেমিকা। গালের চামড়া আরও অনেক উজ্জ্বলতায় চকচক করছে। ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি বেজে ওঠে। একদল লোক ধর ধর বলে ছুটে আসে। সব গাড়ি থেমে যায়। শুধু একটি গাড়ি পেছনা না ফিরেই সজোড়ে ছুটে পালায়। কাঠের হাতলওয়ালা কালো ছাতাটা দূরে পড়ে থাকে। একজন নেমে এসে কালো ছাতায় থেঁতলে যাওয়া মাথাটা ঢেকে দেয়। আরও চড়াও হয়ে রোদ নেমে আসে। আট রাস্তার মোড়ে সবগুলো গাড়ি থেমে থাকে। শুধু একটি রাস্তায় হাত-পা ছড়ানো, দুমড়ানো একজন কালো ছাতায় আড়াল হয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *