‘বাংলাদেশ অনুপ্রবেশী লীগ’

কিছুদিন আগে দেখলাম চোখ উপড়ানো হয়েছে। অচিরেই হয়তো বক্তব্য আসবে, এরা ছাত্রলীগ নয়, অনুপ্রবেশকারী। বক্তব্যটি কে দিবেন জানি না, তবে আসবে তা নিশ্চিত। সেই সঙ্গে আরও কিছু ঠিকুজি যুক্ত হবে, এই অনুপ্রবেশ কারীদের পিতা কিংবা পিতামহ কোন এক সময় অন্য কোন দলের সক্রিয় সদস্য ছিল। আর সেই দলের রচিত এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বর্তমানে তাই তাঁরা ছাত্রলীগকে বদনাম করতে এই মহান দলে অনুপ্রবেশ করেছে।

তাঁরা যে শুধু অনুপ্রবেশ করে তাইই না মহান এই দলের কর্মী সেজে ঢুকে, ষড়যন্ত্র করে এই দলের ছাত্র শাখার সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের পদ ও অর্জন করে ফেলে। যেমনটা ময়মনসিংহের ককৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে। অতঃপর তাঁরা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে টেন্ডার বাজিতে অংশ গ্রহণ শুরু করে। কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতি উত্তপ্তও করে এবং ঘটনার দিন সেই ষড়যন্ত্রকারী দলটির নির্দেশেই এই নেতাদ্বয় তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গ সহ গোলাগুলি শুরু করে। পরিস্থিতি সরকারী দলের জন্য আরও লজ্জাজনক করতে, সেই গোলাগুলির সময় এগারো বছরের এক শিশুকে সেখানে ইচ্ছে করে পাঠায় সেই ষড়যন্ত্রী দল। আসলে এসব সবই বর্তমান সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করবার প্রচেষ্টার ই অংশ।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় অবশ্য ওপর একটি দল জড়িত। তাই ব্যাপারটি অনুপ্রবেশ না আত্মরক্ষা কিংবা সেই দলের হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা কোন শিরোনামে বর্ণিত হবে, সেই অপেক্ষায় আছি। তবে পুলিশের হাত থেকে একটি অনুপ্রবেশি লাঠি কেমন করে যেন সরকারী দলের হাতে চলে আসে আর সেই লাঠি কেমন করে যেন বিরোধী দলের গায়ে আঘাত শুরু করে দেয়।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারটায় যেহেতু ‘বহিরাগত’ শিরোনাম দেয়া হয়েছে, তাই কোন দলের সদস্য তা আর নির্ধারণের উপায় নেই। এক্ষেত্র যথারীতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি হবে। একদল বলবে ষড়যন্ত্র আর অন্য দল বলবে সরকারী দল দায়ী। কিংবা ভিসি পন্থী অনুপ্রবেশকারী এবং ভিসি বিতারণ পন্থী অনুপ্রবেশকারী এমন বলা হতে পারে। তবে ছাত্র দের ব্যবহার করে শিক্ষকদের অপদস্থ করার যে নতুন প্রথা চালু হয়েছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বুয়েট ঘুরে এখন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করছে। যে শিক্ষক গ্রুপ এধরনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছেন তাঁরাও অনুপ্রবেশকারি কি না তা এখনও কেউ জানান নি। অপেক্ষায় আছি।

শুধু কি ছাত্র শাখায় অনুপ্রবেশ? মন্ত্রী এম পি দের রাজনৈতিক এ পি এস হিসেবেও অনুপ্রবেশকারীর ছড়াছড়ি। এরা কখনও মন্ত্রীকে বস্তায় করে অর্থ দিয়ে আসতে চায়, কখনও স্ত্রী সহযোগে গৃহ পরিচারিকাকে ধর্ষণ শেষে পা থেঁতো করেন, গরম তেলে হাত জ্বালিয়ে দেন। তবে সব ক্ষেত্রেই একটি বৈশিষ্ট লক্ষণীয়, অনুপ্রবেশকারীরা খুবই সার্থক ভাবে তাঁদের ষড়যন্ত্র সম্পন্ন করেন এবং ধরা পরার পরে প্রথম বারের মত আবিষ্কৃত হয় তাঁরা ‘অনুপ্রবেশ’ কারী।
শুধু মানুষ অনুপ্রবেশকারী নিয়েই যে এই সরকার বিব্রত হচ্ছেন এমন না। কিছু অনুপ্রবেশকারী অস্ত্র নিয়েও তাঁরা বেশ সমস্যায় আছেন। সম্প্রতি তাঁরা পুলিশের ‘লাঠিয়াল’ ইমেজ পরিবর্তনের জন্য ‘পিপার স্প্রে’ প্রবর্তন করেন। পুলিশ লাঠি হাতে দৌড়ে যাচ্ছে, বিচ্ছিরী দেখায় বিধায় নতুন এই ‘মৃদু’ অস্ত্র। এই নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা যতটা ফুলেল শুভেচ্ছা পাবে আশা করা হয়েছিল, তা পায় নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এখনও পর্যন্ত নিজেদের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইছেন। তবে পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে, অবস্থা বেগতিক দেখলে, হয়তো যুক্তি হিসেবে উপস্থিত হবে, এই ‘স্প্রে’ ও একজন ‘অনুপ্রবেশ’ কারী। পূর্বে এরা অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

বিশ্বব্যাংক সরকারকে ফেলেছে মহা এক ফ্যাসাদে। দিবে তো লোন, তা তো আমরা নিজের ট্যাক্সের পয়সা দিয়েই শোধ করবো, তা দিতেও আবার একরাশ বাহানা। ছুটি দেয়া, পদ থেকে সরিয়ে দেয়া, এসব শর্ত মানবো না মানবো করেও মানা হল। তাতেও বেটা দের শখ মেটে না। এখনও আবার বলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। নতজানু দুদক কে দিয়ে তা ও করা হল। তা দেখেও আবার নাক শিটকায়। মনে বেজায় খায়েশ, দুএকজন অতি প্রিয়জনের নাম সম্বলিত একটা রিপোর্ট তাঁরা দেখতে চান। সরকার কি করবেন বোঝা যাচ্ছে না, তবে সমূহ সম্ভাবনা, আবার আসতে পারে সেই চিরাচরিত সমাধান, তিনি আসলে একজন ‘অনুপ্রবেশ’ কারী দেশপ্রেমিক মন্ত্রী।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি প্রবাদ সম্পর্কে আপত্তি তুলেছিলেন, ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’। কারণ অনেকগুলো শাক দিয়ে অনায়াসেই একটি ছোট মাছ ঢাকা সম্ভব। বর্তমান সরকারী দলও সম্ভবতঃ একই মতবাদে বিশ্বাসী, তাই শুরু থেকেই তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল মাছ ঢাকবার। যেখান থেকে যে প্রজাতির শাক পেয়েছেন তাই দিয়ে তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ইদানীং মাছের আকার এতোটাই বেড়েছে, শাকের যোগানে কিঞ্চিৎ টান পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষকরে ‘অনুপ্রবেশ’ শাক দিয়ে মাছগুলো আর খুব বেশী ঢাকা পড়ছে না।
সরকারী দল নতুন কোন জাতের শাকের আমদানি করবেন না পুরনো শাক দিয়েই তাঁদের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে যে গতিতে নতুন সব কাণ্ড কারখানা ঘটছে আর সেসব সামাল দিতে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অচিরেই এই অনুপ্রবেশকারীরাই দলে সংখ্যা গুরু হয়ে যাবেন। তারাই একদিন মুল দলের নীতিনির্ধারকের পদে আসীন হতে চাইবেন। কেউ সেই ইচ্ছায় বাঁধ সাধলে হয়তো দেখা যাবে নতুন একটি দলের উন্মেষ দেখা দিয়েছে, ‘বাংলাদেশ অনুপ্রবেশী লীগ’।

৪ thoughts on “‘বাংলাদেশ অনুপ্রবেশী লীগ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *