পলাশের জীবন

অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে ধাতব কিছু একটা খুঁজে পেল পলাশ। সবে জ্ঞান ফিরেছে ওর। দেহে শক্তি সামান্যই অবশিষ্ট আছে। সেটাও বলতে গেলে রাখল না সে। হ্যাঁচকা টানে ধাতব জিনিসটা সরিয়ে আনল সে। বুঝতে পারলো, ওটা জানালা ছিল। কারণ, বাইরে আবছা আলো দেখা যাচ্ছে, মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। সামান্য পরিমাণ বাতাসও নেই এখানে। ভ্যাঁপসা গরম। ধীরে ধীরে সব অন্ধকার হয়ে আসছে। অথচ কেউই ভাবেনি এমন হবে।

******

ঢাকার অদূরে, এক এলাকার এক বসতি। শহরবাসীর কাছে পরিচিত বস্তি নামে। অনেকগুলো ঘুপচি ঘর একে অপরের গা ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে। ঘরগুলোর ভেতরে যে দোঁপেয়ে জীবগুলো বাস করে, তাদের কাছে এই ঘুপচি কোন অংশে প্রাসাদের চেয়ে কম নয়। কারণ এখানেই তাদের দুনিয়া। এখানেই তারা মাথা গোজার ঠাই তো পেয়েছে। শহরের সভ্য সমাজ তাদের ঠাই দেয়নি। কারণ, মানুষের (!) সভ্য সমাজে থাকার মতন অসভ্য তারা এখনো হতে পারেনি। তবে চেষ্টার কমতি নেই। তবে চেষ্টাটা আপাতত টিকে থাকার।

বস্তিবাসীর জীবিকা অর্জনের চিত্ররূপ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হলেও একদিক দিয়ে সবাই এক। সবাইকে পরিশ্রম করতে হয়। দুবেলার আহার আর পড়নের কাপড় জোটাতে হলে পরিশ্রম করতেই হবে। পরিশ্রম না করলে এগুলো কেউ আকাশ থেকে দিয়ে যাবে না, মাটিতেও গজাবে না, বানের জলেও ভেসে আসবে না।

এদেরই একজন পলাশ। একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক সে। মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে তিন হাজার টাকা। ঘরে আছে তার স্ত্রী, দুই সন্তান আর পোষা কুকুর ভোলা। ঘরে সে একমাত্র উপার্জনকারী বান্দা। ভোলাকে খাবার কাপড়ের কথা ভাবতে হয় না। এদিক দিয়ে সে মুক্ত। মানুষ না হয়ে বেঁচে গেছে। কিন্তু বাকিরা তো আর তা পারে না। মাঝে মাঝে পলাশের ভীষণ রাগ হয়,

“হালা কুত্তা হয়া জন্মাইলেই তো বালা আসিল। খাওন পড়ন লয়া এত চিন্তা করন লাগত না। কোন হালারে পাত্তাও দিতাম না, গায়ে পইড়া রক্ত চুষতেও দিতাম না।“

পরক্ষনেই সে ভাবে, রাগলে সব বদলে যাবে না। কাজ তাকে ঠিকই করতে হবে। প্রতিদিন ভোরে কাজে রওনা হয় সে। কিন্তু আজকের দিনটা কেন জানি তার কাছে বিশেষ সুবিধার মনে হচ্ছে না। কাজে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু উপায় নেই। কাজে না গেলে, বেতন না পেলে, মাসের শেষে বাতাস খেয়ে থাকতে হবে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজে ছুটল সে।
কারখানার সামনে গিয়ে সে দেখে হুলস্থূল বেধে আছে। কিছু বুঝতে না পেরে একপাশে দাড়িয়ে রইল। এমন সময় তার সহকর্মী রহমত দৌড়ে এল।

– মালিক আইসে!!
– কইসে তোমারে।
– আরে হ।

পলাশ বুঝল, কেস সিরিয়াস। মালিক সাধারণত আসে না। সে গত পাঁচ বছর যাবত কাজ করছে। আজ পর্যন্ত মালিক কে দেখেনি। সামনে যাওয়ার পর শুনল ঘটনা। কে নাকি খবর ছড়িয়েছে যে, দালানে ফাটল ধরেছে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। একথা শুনে কেউ ভেতরে যেতে চাচ্ছে না। কিন্তু সুপারভাইজাররা মরিয়া। তাদের কাজ করতেই হবে। নইলে সময়মত অর্ডার ডেলিভারি দেওয়া যাবে না। বিদেশিরা দালানের ফাটল বুঝে না। তাদের সময়মত অর্ডার ডেলিভারি পেলেই হয়।

মালিক এসেছে মস্ত এক গাড়িতে চড়ে। এগুলোকে নাকি পাজেরো বলে। গাড়ির ঝা চকচকে সাদা রঙ দেখেই বুঝা যাচ্ছিল যে গাড়িটা অনেক দামি। গাড়ির চাকাগুলো বেশ মোটা আর চওড়া। পলাশের মনে হল, তাদের পরিশ্রমের ফলে গাড়ির চাকা মোটা হয়েছে, গাড়ি বড় হয়েছে, মালিকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বটে , কিন্তু তারা যা ছিল তাই রয়ে গেছে। মালিক কে দেখে রীতিমত হাসি পেল পলাশের। ছিপছিপে, শীর্ণ দেহ, মনে হয় যেন বহুকাল রোগভোগের পর মুক্তি পেয়েছে। মাথার বেশিরভাগ চুল ঝরে গেছে। হাতে সোনার ব্রেসলেট। সোনার ঘড়ি। এই গরমেও গায়ে মোটা কোট আর জিন্স, পায়ে সাদা জুতা। সে ভাবল,

“ সারাজীবন হুনলাম টেকাওয়ালারা ভালো খায় ভালো পিন্দে, এই হালায় কি খায়না নি? এত হুগ্না মানুষ হয়? “

মালিক এসেই রীতিমত হুঙ্কার ছাড়ল,

“ছোটলোকের দল! মাস শেষে টাকা নিবি, না পেলে রাস্তায় নেমে সার্কাস দেখাবি, কিন্তু কাজ করবি না? কাজে না গেলে সবকটাকে বের করে দিয়ে আমি নতুন শ্রমিক নেব।“

সবাই চুপ হয়ে গেল। কেউ কাজ হারাতে চায় না। তারা হার মানল। পিঁপড়ের মত পিলপিল করে যে যার যার সেকশনে গিয়ে কাজ শুরু করল। পলাশের সেকশন ৫ তলায়। বিল্ডিং মোট ১০ তলা।

দুপুরের খাবারের বিরতি পড়ল। দেড় ঘন্টা মতন বিরতি। খাবার খেতে যাওয়া লাগে বাইরে। মালিক খাওয়াবে? সময়মত বেতন যে দেয় এইত বেশি। পলাশ আর রহমত একসাথে বেরিয়ে এল। সাথে এল সালাম আর বুলু। ওরা একই সেকশনে কাজ করে। খাবার ফাকে তাদের আলাপ জমে উঠল।

সালাম – এই মাসের বেতনডা অগ্রিম তুইলা নিমু।
পলাশ – ক্যান? তাইলে পরে ক্যামনে কি করবা?
সালাম – পরেরটা পরে। মাইয়াডারে ইস্কুলে দিসি। হের একটা নয়া জামা তো কিনন লাগব। এহন জামা ত আর মাগ্না আইব না।

রহমত হঠাৎ হেসে উঠলো।

সালাম – কিরে হাশস ক্যা? মজার কথা কইলাম মনে হয়?
রহমত – মজার কথাই তো। সারা দুনিয়ার মাইনশের কাপড় আমরা বানাই, আর আমাগো নিজেরই কাপড় নাই। হা হা হা।

বুলু এতক্ষণ চুপ ছিল। সে হঠাৎ বলে উঠলো, একটা কতা হুনসনি ?

পলাশ – কি?
বুলু – কোন এক মউলানা বলে কইসে, গার্মেন্টসে মহিলা পুরুষ একলগে কাম করে, এর লাইগা বলে আমগো উপড়ে গজব পড়ব।

পলাশ – গরিবের ঘরে গরিব হয়া জন্মাইসি। গরিব হয়া বাইচা আসি। গরিব হয়াই মরুম। এর চাইতে বড় গজব আর আসে দুনিয়ায়? নতুন কইরা আর কি পড়ব?

বুলু – তা হাসা কইস।

বিরতি শেষে সবাই কাজে ফিরে যায়। ঘন্টা দুয়েক পরের কথা। বিদ্যুৎ চলে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গম গম শব্দ তুলে জেনারেটর চালু হল। সবাই আবার কাজ শুরু করল। খানিক বাদেই, বুলু বলে উঠলো, অই! বিল্ডিংডা মনে অয় লরতাসে! পলাশ কাজ ফেলে ঘুরে তাকালো। কাঁপুনিটা সেও টের পেয়েছে। রহমত ও সম্মতিসূচক দৃষ্টি দিল। কাঁপুনিটা বেড়েই চলেছে। সালাম বলতে চাইল জেনারে—-
তার আগেই তার উপর ছাদের একটা অংশ ভেঙে পড়ল। গোটা বিল্ডিং একপাশে হেলে পড়তে শুরু করেছে। হুলস্থূল, চেচামেচি। বাইরে যাবার রাস্তাও ধ্বসে পড়েছে। পলাশের মনে হল, মহাপ্রলয় উপস্থিত। হঠাৎ একটা পিলার ভেঙে পড়ল, একেবারে বুলুর মাথার উপর। চিৎকার করারও সময় পায়নি সে। একেবারে থেতলে গেছে। তাদের পায়ের নিচের মেঝেতেও ফাটল ধরছে। সেটা ক্রমশ বড় হচ্ছে। সেটাও যখন ভেঙে পড়ে তখন পলাশ আর রহমত হতবিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে। পলাশের মনে হচ্ছিল সে অনন্তকাল যাবত নিচে পড়ছে। পাতালের দুয়ার খুলে গেছে। হা করে সবকিছু গ্রাস করে নিবে। এভাবে কতক্ষণ ছিল তার খেয়াল নেই। জ্ঞান ফিরতেই দেখল তারা একটা বড় দেয়ালের নিচে পড়ে আছে। সামান্য জায়গা আছে নড়াচড়া করার, কিন্তু উপায় নেই যে সে রহমতের কাছে যাবে। রহমত বেঁচে আছে কিনা তা বুঝারও জো নেই। কারণ মাঝখানে একজন কে জানি পড়ে আছে। মৃত নিশ্চিত। ভ্যাঁপসা গরম আর অন্ধকার।

******

কতক্ষণ না কয়দিন কেটে গেছে বলার উপায় নেই। পাশের লাশটা গলতে শুরু করেছে। রহমতও মারা গেছে, পলাশ বুঝতে পারল, কারণ তার দেহেও পচন ধরেছে। হঠাৎ ভেতরে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। পলাশ খানিকটা অবাকও হল। সে বহু কষ্টে চোখ মেলে দেখতে পেল যে, তার অপর পাশে দেয়ালে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সেখানে কিছু লোক দেখা যাচ্ছে। পলাশ দেহের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে চিৎকার করল। ভাই কেউ আমারে নিয়া যান! ওপাশ থেকে কেউ একজন শুনতে পেয়ে বলল, এখানে একজন আছে।

চারঘন্টা পরের কথা। ধ্বংসস্তূপ থেকে পলাশকে যখন বের করা হল, তখন সে অর্ধমৃত। তারপরও তার কাছে মনে হল সে নতুন জীবন পেয়েছে। কিন্তু নতুনজীবনের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। হাসপাতালে যাওয়ার পর ডাক্তার জানালেন যে তার দুটো পা, চাপা পড়ে থাকার কারনে অকেজো হয়ে গেছে। ঘরে ফিরে সে জানতে পারল যে, সালাম বাঁচেনি। তার মেয়েটারও স্কুলে যাওয়া হয়নি। নতুন জামাও কেনা হয়নি। বুলুর মউলানার গজবও আসার সময় পায়নি। তার আগেই বিল্ডিং ধ্বসে পড়েছে।

পরদিন বিকালে সে ঘরে শুয়েছিল। একজন এসে বলল, ‘ কাকা, তমাগ বলে ৫ হাজার আর যারা মরসে তাগরে ২০ হাজার টেকা কইরা দিব। ‘ পলাশ কিছু বলল না। আর কি ইবা বলবে, তার জীবনের পাত্তা কেউ দিল না, খালি পায়ের দাম , কারো হাতের দাম ৫ হাজার এর লেবেল এ দিয়ে দিল । এমন সময় ঘরে ঢুকল ভোলা।তার মুখে একটা হাড়। কুড়িয়ে এনেছে হয়ত । পলাশ তখন বলে উঠল, ‘ভোলারে, তুইই বালা আসস, তর জিবন্ডা যদি পাইতাম রে! অন্তত কেউ ৫ আর ২০ হাজারের লেবেল তো লাগাইত না! মানুষ হইয়া কিছুই পাইলাম না।’

২ thoughts on “পলাশের জীবন

  1. কী রে, তোর গল্প লেখার হাত যে
    কী রে, তোর গল্প লেখার হাত যে এত ভালো তা তো জানা ছিল না! হ্যাটস অফ দোস্ত :salute:

    এখন দুইটা টিপস দিই:
    ১. বানানের ব্যাপারটা, বিশেষ করে শব্দে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার (যেমন ভ্যাঁপসা, দোঁপেয়ে, ঝা চকচকে) খেয়াল রাখিস।
    ২. বেশি বড় বাক্য ব্যবহার করবি না। তুই এখানে প্রায় সবগুলা বাক্যই লিখছিস ছোট/মাঝারী আর সরল, এইটা ঠিক আছে।

    Keep calm and carry on! :রকঅন:

  2. “গরিবের ঘরে গরিব হয়া

    “গরিবের ঘরে গরিব হয়া জন্মাইসি। গরিব হয়া বাইচা আসি। গরিব হয়াই মরুম। এর চাইতে বড় গজব আর আসে দুনিয়ায়? নতুন কইরা আর কি পড়ব?”

    এর চেয়ে বড় গজব আর নেই। তার প্রমান আজ উজ্জ্বল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *