শামসুর রাহমান: বুক তাঁর বাংলাদেশের হৃদয়

রনি রেজা : দেশ, দেশের মানুষ আর স্বাধীনতার কথা বার বার উঠে এসেছে যার কণ্ঠে তিনি নগর কবি শামসুর রাহমান। যদিও কবি মাত্রই নাগরিক। তাই তো নগরের বিবিধ বিষয় আসয় সাবলীলভাবে কবিতায় ধারণ করেছেন বলেই তিনি নাগরিক কবি। তবে তিনি একাধারে প্রেমের কবি, মানবতার কবি এবং স্বাধীনতার কবিও।

তাঁর সমগ্র কাব্যজীবনের মূল সুর, মূলত স্বদেশপ্রেম। শত হৃদয়ের কষ্ট-যন্ত্রণা কবিতার স্বরে বেজে উঠেছে শামসুর রাহমানের কণ্ঠে। বেদনার্ত হৃদয়ের বাহক হয়ে রচনা করেছেন অজস্র কবিতা। শামসুর রাহমানের কবিতায় বেদনা, দুঃখবোধ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। দুর্বোধ্যতার সমস্ত কাঁটাতার ছিন্ন করে তিনি পৌঁছে গেছেন সকল শ্রেণির পাঠকের কাছে। হয়ে উঠেছেন গ্রহণীয় ও প্রিয়।

পঞ্চাশ দশক থেকে বাঙালি জাতির নানা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক জীবনের অসংগতি, বৃটিশ ও পশ্চিমাদের শোষণের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার কণ্ঠ কবিতায় নির্মিত হয় এক অনন্য বাক প্রতিমা। এ জন্য তাঁকে স্বাধীনতার কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা’, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘হরতাল’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘দুঃস্বপ্নে একদিন’-এর মত কবিতাগুলো রচনা করে স্বাধীনতার কবি হিসেবে খ্যতি লাভ করেছেন এই শব্দের ফেরিওয়ালা।

দেশকে নিয়ে এত বেশি কবিতা আধুনিককালে; জীবনানন্দ দাশের পরে বিশেষ করে, আর কেউ লিখেছেন বলে মনে পড়ে না। বাংলা কবিতা সত্যিকার অর্থে পোশাকে ও আশাকে, মেজাজে ও মননে আধুনিক হয়ে ওঠে হাতে গোনা যে ক’জন কবির অক্লান্ত সাধনায়; তাঁদের একজন কবি শামসুর রাহমান । যিনি আপাদমস্তক শুধুই একজন কবি।
তাঁর কবিতায় শুধু স্বাধীনতাই নয়, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা, প্রেম, দ্রোহ ও বিশ্বজনীনতা সবই উঠে এসেছে। যা আজও আমাদের উজ্জীবিত করে। এ কারণে তিনি বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের একজন এবং আমাদের চলার পথের পাথেয়।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন কবি শামসুর রাহমান। তাঁর পৈত্রিক নিবাস বর্তমান নরসিংদী জেলায়। বাবা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মা আমেনা বেগম। পুরনো ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ ১৯৪৫ সালে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন এবং তিন বছর নিয়মিত ক্লাসও করেছিলেন সেখানে।
শেষ পর্যন্ত আর মূল পরীক্ষা দেননি। পাসকোর্সে বিএ পাশ করে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এম এ (প্রিলিমিনারি) পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও শেষ পর্বের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। কবি শামসুর রাহমান ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

এরপর ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। এরপর তিনি আবার ফিরে আসেন তার পুরনো কর্মস্থল দৈনিক মর্নিং নিউজ-এ। তিনি সেখানে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নভেম্বর, ১৯৬৪ থেকে শুরু করে সরকারি দৈনিক পাকিস্তান-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন; ১৯৭৭ এর জানুয়ারি পর্যন্ত (স্বাধীনতা উত্তর দৈনিক বাংলা)। ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৭ সালে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ তে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অতঃপর তিনি অধুনা মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জীবদ্দশায় তাঁর, ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১টি প্রবন্ধগ্রন্থ, ১টি ছড়ার বই ও ৬টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি অর্জন করেছেন, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, জীবনানন্দ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার, মিতসুবিসি পুরস্কার (সাংবাদিতার জন্য), স্বাধীনতা পদক, আনন্দ পুরস্কার। ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান সূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে এই মহান কবিকে।

২০০৬ সালের ১৭ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কবি। নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ঢাকাস্থ বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাধিস্থ করা হয় তাকে। কবি শামসুর রাহমান আমাদের গর্ব; যার বুক আর বাংলাদেশের হৃদয়ে কোনো তফাৎ নেই, থাকতে পারে না!


লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *