জাতীয় শোক দিবসে বেগম জিয়ার ঘটা করে মিথ্যা জন্মদিন পালন

১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস, সরকারী ছুটির দিন। এ দিন আমাদের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কাল রাতে বাঙালী জাতির জনক, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু বিপথগামী সৈনিকদের হাতে সপরিবারে নিহিত হয়েছিলেন। জাতি হারিয়েছিল তার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান।

বঙ্গবন্ধু তাঁর সারাটি জীবন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঙালী জাতিকে দুহাতে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজের জন্য কিছুই করেননি। নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়ও ছিল না তাঁর। বাংলার সাধারন মানুষদের মুখের হাসি এবং ভালবাসাই ছিল তাঁর পুরস্কার, তাঁর প্রাপ্তি। বাঙালী জাতির মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই তিনি আজীবন-আমরণ সংগ্রাম করে গেছেন।

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, যে ১৫ই আগস্ট আমরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছি সেই ১৫ই আগস্ট বিএনপির সভানেত্রী খালেদা জিয়া তার মিথ্যা জন্মদিন পালন করে পুরো বাঙালী জাতির সাথে তামাশা করছেন। এটা নেহায়েতই জাতীয় শোক দিবসকে অবমাননা ও তাচ্ছিল্য করার জন্য নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল মাত্র।

সাবেক হুইপ শহিদুল হক জামালের পরামর্শে ১৯৯১ সাল থেকে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে খালেদা জিয়া জন্মদিন পালন শুরু করেন। ১৪ ই আগস্ট ১৯৯১ সালে রাতে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় প্রথম এই ঘৃণ্য ঘটনার সূচনা করেন। উল্লেখ্য খালেদা জিয়া অতীতে কখনও কোনদিন ঘটা করে কোন জন্মদিন পালন করেন নি। তার জন্মদিন নিয়ে অনেক সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। অনেক তথ্য প্রমাণও রয়েছে।

১. ১৯৯১ সালের ২০শে মার্চ তারিখে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় সরকারী সংবাদ সংস্থা বাসস থেকে পাঠানো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জীবনী প্রকাশ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয় যে, উনার জন্মদিন ১৯৪৫ সালের ১৯শে আগষ্ট।

২. ম্যাট্রিক পরীক্ষার মার্কশীট অনুসারে খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৯৪৬ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর।

৩. বিয়ের কাবিননামা অনুসারে ওনার জন্মদিন ১৯৪৪ সালের ৯ই আগষ্ট।

8. ১৯৯৭ সালের ২২শে আগষ্টে দৈনিক ইত্তেফাকে ও ১৯৯৭ সালের ১৯শে আগষ্টে দৈনিক সংবাদে খালেদা জিয়ার একাধিক জন্মদিন নিয়ে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়।

যাই হোক, যে ১৫ ই আগস্ট পুরো জাতি তার স্থপতি বা জনককে হারানোর শোকে মুহ্যমান থাকে, সেই ১৫ই আগস্ট খালেদা জিয়া ঘটা করে স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেক কেটে বিতর্কিত জন্মদিন পালন করেন। এক কথায় তিনি বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবসের অবমাননা করছেন এবং পুরো জাতির সংগে তামাশা করছেন। অনেক দেরী হয়ে যাওয়ার আগেই বিএনপিকে এসব ঘৃণ্য-নোংরা রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারের উচিত হবে ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবসকে যারা অবমাননা করেন, অসম্মান করেন তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা। জাতীয় শোক দিবসের ভাব-গাম্ভীর্য বজায় রাখার লক্ষ্যে সংসদে বিল পাস করে “জাতির পিতা অবমাননা আইন” নামে একটি আইন করা যেতে পারে। জাতির জনককে অসম্মান করা, অশ্রদ্ধা করা যে এক অর্থে পুরো বাঙালী জাতি এবং তার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেই অস্বীকার করার শামিল। তারপরেও খালেদা জিয়ার যদি সত্যিই মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে থাকে তাহলে তার জন্মদিন আড়ালে লুকিয়ে, গৃহের অভ্যন্তরে পালন করতে পারেন। কিন্তু সারা দেশে বিএনপি-জামায়াত জোটের ঘটা করে, উৎসবমুখর পরিবেশে খালেদা জিয়ার মিথ্যা জন্মদিন পালন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে।

বেগম খালেদা জিয়াকে বিনয়ের সংগে বলছি, আপনি কি ভুলে গেছেন সেইসব দিনের কথা, যখন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আপনি পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার পর জিয়াউর রহমান আপনাকে নিয়ে ঘর-সংসার করতে অসম্মতি জানিয়েছিল। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আপনাকে নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন এবং জিয়াউর রহমানকে বাধ্য করেছিলেন আপনাকে গ্রহন করে নিতে। প্রসঙ্গক্রমে, জিয়াউর রহমানের অভিযোগ ছিল যে, তিনি আপনাকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করলেও আপনি ফিরে আসতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। আপনার চরিত্রের কালিমা পুরো বাঙালি জাতি স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৪ বছর ধরে দেখে আসছে। এ আর নতুন কিছু নয়। কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আপনারও ঠিক সেই অবস্থা!

যাই হোক, মেয়ে হিসেবে বাবার মৃত্যু দিবসে আপনার তথা আপনার পুরো সংগঠনের উচিত মহান জাতির পিতার রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া-মাহফিলের ব্যবস্থা করা, দান হয়রাত করা ইত্যাদি। আপনি তা না করে উল্টো জাতির জনকের মৃত্যু দিবসে, জাতীয় শোক দিবসে প্রতি বছর আনন্দ উল্লাস করে মিথ্যা জন্মদিন পালন করছেন। দয়া করে, সময় থাকতে জন্মদিনের এসব মিথ্যা নাটক বন্ধ করুন। নইলে বাঙালী জাতি আপনাকে এবং আপনার সংগঠন তথা তথাকথিত জোটকে কখনও ক্ষমা করবে না।

খোরশেদ আলম, লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *