বন্ধুত্ব এবং স্মৃতির লুকোচুরি

আমার জন্ম ছোট্ট একটা গ্রামে।আমি যখন ক্লাস ৮-এ পড়ি তখন একবার গ্রামে গিয়েছিলাম গিয়ে তিন মাস ছিলাম।৯০দিন!এখনকার বাব-মা শুনলে রীতিমতো ভয় পেত।একবুক দুঃখ নিয়ে লেখাটা লিখছি,আমি জানি আমার আবেগ অনুভূতি এই যুগের কোন পাঠক কে স্পর্শ করবে না।কারন এই জেনারেশন এতটাই রবোটিক আর অনুভূতিহীন যে একসাথে কোথাও বেড়াতে গেলে সবাই গল্প করে কার গেম ক্লানের অথবা কার জিএফ এর কি অবস্থা।না আমাকে ভুল ভাবতে পারেন।কিন্তু সত্যকে মানতে হবে।যেন এই সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু জানার নেই।আমি তনু মেয়েটার জন্য বিচার চেয়ে ফেসবুকের প্রোফাইল ফটো পরিবর্তন করার পর আমাকে অনেকেই বলেছিল ‘তুমি কেন পিক চেঞ্জ করলে?তোমার কি দরকার এইসব আন্দোলনের’।আমি খুব দুঃখ পেয়ে,একরকম বাধ্য হয়ে ছবিটা চেঞ্জ করলাম।ঠিক মানুষের মনুষ্যত্ববোধ কোথাই গিয়েছে এইটা এখন না বুঝতে পারলে আমারও আর বলার কিছু নাই।আমি বোধহয় একটু বেশীই বলে ফেললাম।আসল শিকড়ে ফিরে যাই,গ্রামে অনেক মজা করলাম।আমার দুটো মামার বিয়ে খেলাম।সে এক অদ্ভুত ব্যাপার।আমার নানারা সাত ভাই,চারবোন।আমার নানা বংশের প্রায় সব লোক একসাথে।চারদিকে ধুম ধুম একটা ভাব।বিয়ের ৪-৫ দিন আগে থেকে সবাই নানু বাড়িতে নাইয়র এসে পরছে।আমরা সব মামাতো ভাই-বোন একসাথে,সে একটা অস্থির অনুভূতি।আমার নানু বাড়ির সামনে ছোট একটা নদী আছে।আমার বন্ধু আর ভাইয়েরা মিলে খাড়া দুপুরে নদীতে হুটোপুটি।আর রাতে চাঁদের আলোতে নদীর ব্রিজের পাশে গভীর রাত পর্যন্ত চলতো গল্প-গুজব।গ্রামের গভীর রাত মানে ১০টা।আকাশ ভরা তারার আলো,নদীর স্রোতের শব্দ।যেন একটা মায়াবী কবিতা রচনা করে চলত।নদীর তীরে বসে আমার আর বড় ভাইয়ের গল্প করা সব থেকে বেশী পছন্দ ছিল।অপেক্ষা করতাম,কখন সন্ধ্যা লাগবে আর চাঁদ উঠবে।রাতের খাবার খেয়ে চলে যেতাম,নদীর তীরের ঘাসে শুয়ে শুয়ে তারা গুনতাম আর গল্প করতাম।আমাদের নানা বাড়িতে এক ছেলে গরু দেখাশোনা করত।মানে রাখাল হিসেবে কাজ করত।অসম্ভহব সুন্দর বাঁশি বাজাতো।মাঝে মাঝে ওই ছেলেটা আসত।কি তার সুর একদম আচ্ছন্ন করে ফেলত।আজ সব একরকম আছে,শুধু মানুষগুলো তার শৈশব হারিয়ে ফেলেছে।কখনও যদি অতিতে ফিরে যাবার কোন সুযোগ হয়।তাহলে আমি আমার শৈশবটা ফিরে চাইব।দশম শ্রেণিতে ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতা পরেছিলাম।সেই কবিতার কথা আজ আমি বুঝি।আমি হয়তো একটু বেশী আবেগি হয়ে পরছি।
আমরা সব ভাইবোন শুতাম একসাথে একঘরে মেয়েরা বিছানার উপর আর আমরা সব ভাই,আর ছোট মামা মানে আমরা ছেলেরা সব মাটিতে খেঁড় বিছায়ে শুয়ে পরতাম।মনে আছে আসলে সবাই একসাথে শোওয়া ছিল বাহানা।কারন অনেক রাত পর্যন্ত চলত সবার গল্প।কখনও গানের কলি খেলতাম।রাত বেশী হলে নানু অথবা মামা,বড় যে কেউ এসে বকা দিত।তখনই শুধু চোখে ঘুম এসে যেত সবার।সুখের দিন খুব দ্রুত শেষ হয়।আমার দিন শেষ হল।আমিও চলে আসলাম শহরে।প্রথম দিন স্কুলে যাবার পর আমাকে যথেষ্ট পরিমানে উত্তম-মাধ্যম দেয়া হল।কান ধরে ক্লাসের বাইরে দাড় করে রাখল।রফিকুল স্যার সোজা বলে দিলেন কালকে যেন আমি আমার বাবাকে নিয়ে আসি।খুব ভয় পেলাম।আর এখনকার ছাত্রদের তো মারা দূরে থাক কিছু বলতেই ভয় পান।শেষে না আইনি ঝামেলাতে পরতে হয়।আমি আবার সে বছরেই শহরের নামকরা স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম।কিন্তু এই স্কুল কখনই আমাকে টানেনি।হিরা দামি হতে পারে,কিন্তু একটা শিশুর কাছে হিরা পাথর ছাড়া আর কিছুই না।যাই হোক এই কথাগুলো না হয় তোলা থাক।বাসায় আসার পর আব্বা আমাকে বললেন,লেখাপড়া সবার হয়না কিন্তু খারাপ মানুষ হইয়ো না।মনে খুব আঘাত পেলাম।প্রতিজ্ঞা করলাম ভালো ছাত্র না হতে পারি অন্তত মানুষ হিসেবে সৎ থাকব।
এই কথাগুলোর খুব সরল একটা মর্মার্থ আছে,এখন কার বাচ্চাগুলো সব কেমন যেন।অনেকটা লাল ইটের নিচে চাপা পড়া ঘাসের মতো ম্যাড়মেড়ে।ওরা কখনও কোন গাছের মগডাল দেখেনি,দেখেনি জোছনা রাতে নদীর বুকের স্বর্গীয় অনুভূতি।পড়েনি পৃথিবী জয় করা চেঙ্গিস খান কিংবা ইবনে বতুতার ইতিহাস।আসুন আপনি,আমি, সাহায্য করি সহযোগিতা করি।উন্মোচন করি রহস্যগুলো,উনুমুক্ত করি আগামির প্রজন্মের জন্য।জন্ম দেই তাদের মনে মনুষ্যত্বের,আবেগ-অনুভুতির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *