করেছি পণ, রক্ষা করবো সুন্দরবন

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্‍ প্রকল্প বাস্তবায়ন সমর্থক বিশেষজ্ঞ মহল থেকে বলা হচ্ছে বর্তমানে দেশে মোট উত্পাদিত বিদ্যুতের বড় একটি অংশ আসছে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে। যার উত্পাদন খরচ অনেক বেশি। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উত্পাদন খরচ তেলভিত্তিক উত্পাদন খরচ অপেক্ষাকৃত কম। তাই জ্বালানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্‍ উত্পাদনের গুরুত্ব বাড়ছে বা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্‍ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ চুক্তি হয়েছে। চুক্তির মধ্যে রয়েছে, যৌথ উদ্যোগ চুক্তি, বাস্তবায়ন চুক্তি ও বিদ্যুত্‍ ক্রয় চুক্তি। একপেশে চিন্তা করলে বলা যায় এটি সরকার মহলের ইতিবাচক উদ্যোগ। সরকারের প্রতিটি ইতিবাচক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো প্রতিটি সুনাগরিকের দায়িত্ব। আমাদের সরকার কর্তৃক গৃহীত উন্নয়নের মহাযজ্ঞের একটি হতে পারে এটি। অবশ্যই আমরা উন্নয়নবান্ধব সরকারের এমন উন্নয়নের মহাযজ্ঞ নিঃশ্বর্ত সমর্থন ও স্বাগত জানাতে পারতাম। যেভাবে জানিয়েছি পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল বাস্তবায়ন প্রকল্পকে। কতক হা হুতাশ কেন কিন্তু নিয়ে আমরা রামপাল বিদ্যুত্‍ প্রকল্পকে সাধুবাদ জানাতে পারছিনা! এটি উন্নয়নের ব্যাপার নয়; এটি ঐতিহ্য বিলুপ্তির প্রশ্ন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রশ্ন, প্রাকৃতিক বাস্তবতায় এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। আর টিকে থাকার প্রশ্নে কোনো দল-মতের সাথে আপোষ হতে পারেনা। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সমাজে কিছু ঘটনা ঘটে যাঁ নিয়ে আমরা দলমত ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে অবস্থান করি বা করতে হয়। যেমন, সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকা লাপাত্তা, তনু-মিতু হত্যা ও সর্বশেষ জঙ্গি ইস্যু। এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমরা জননিরাপত্তার প্রশ্নে সকল মতবিরোধের ইতি টেনেছি। একই বলয়ে আবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করেছি, করছি। রামপাল বিদ্যুত্‍ প্রকল্প ইস্যু তেমন-ই একটি। এটি নিয়ে আমরা কোনো দলমত করতে পারিনা। কোনো দ্বিধা-বিভক্তি থাকতে পারেনা। আমাদের উচিত এই আত্মঘাতী বিধ্বংসী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্ব-স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিগুলো সংগঠিত হয়ে বৃহত্তর শক্তির বিভত্স রূপ নেবে। উপনিবেশোত্তর নব্য দেশী-বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যাঁ হবে আমাদের শুভ গণশক্তি। সরকার যদি সত্যিই মনে করে সুন্দরবনের অদূরে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্‍ কেন্দ্র স্থাপন জনকল্যাণ সমৃদ্ধ। তবে তা রামপালে না করে যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি, আমলা-কামলার কাড়ি কাড়ি দুর্নীতির টাকায় গড়ে তোলা প্রত্যন্ত বিলাসবহুল ভবনের অদূরে করা হোক। এতে আংশিক ক্ষতি হলেও অন্তত জাতি একটি সার্বিক ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাবে।
সুন্দরবন ধ্বংসের অসুন্দর পরিকল্পনা যদি আমরা বৃহত্তর গণশক্তি দিয়ে নস্যাত্‍ করতে ব্যর্থ হই; তাহলে অদূর ভবিষ্যত আগামী প্রজন্মকে সুন্দরবন নামের রূপ কথার গল্প শোনাতে হবে। যে গল্পের শুরুটা হবে হারানোর বেদনা ও একটি বুকভরা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে- একদা এক সময় এ দেশে সুন্দরবন…..
তাই আসুন পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার্থে সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে প্রতিধ্বনি করি, “করেছি পণ, রক্ষা করব সুন্দরবন”।

বাস্তবতার আলোকে আগামীর নির্মম সত্য একটি কাল্পনিক গল্প দিয়ে লেখার ইতি টানলাম।
১০০ শত বছর পর কোনো এক অম্ল বৃষ্টির দিনে রামপালে বসে জনৈক নানা-নাতীর কথোপকথন,

নানাঃ জানিস তো একদা এক সময় আমাদের দেশে সুন্দরবন নামে বিশাল একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ছিলো।
নাতীঃ ওখানে কি থাকতো?
নানাঃ গাছ-পালা, লতা-পাতা সাথে বাঘের গর্জন। আহ….! সে কি সবুজে সবুজে প্রকৃতির অভূর্ত সমাহার।
নাতীঃ এখন নেই কেনো?
নানাঃ ঐ যে পাশে কয়লা বিদুত্‍ প্রকল্প হয়েছে দেখছিস না। ওটার জন্য।
নাতীঃ যাঁক বাবা, তাহলে ভালোই হলো। সুন্দরবন বিলুপ্ত হওয়ায় আমরা এখন ফ্রী বিদুত্পাচ্ছি। ওটা থাকলে কিইবা হতো। চারদিকে জঙ্গল সাথে বাঘের গর্জন। হালুম……।
নানাঃ ধুর বোকা…… সুন্দরবন ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। জীববৈচিত্র্য, বনভূমি, কৃষিজমি ও বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয়েছে। বিদুত্‍কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত বর্জ্য ও রাসায়নিক ভয়াবহে বিপর্যস্ত হয়েছে গোটা অঞ্চল। ভম্মীভূত কয়লার ছাই ও উত্পন্ন গ্যাসের কারণে গোটা অঞ্চল হুমকীর মুখে।
নাতীঃ সব কিছু জেনে শোনে পরিবেশ-প্রতিবেশের ও ঐতিহ্যের এতো বড ক্ষতি এড়ানোর কোনো ভূমিকা কি তোমার ছিলো না?
নানাঃ কি যে বলিস…. আমি তো আর দশজনের মতো ভূক্তভোগী নগন্য জনগণ ছিলাম। বিশ্ব মোডলরা করলো তাতে আমার ভূমিকা! কোথায় কে আর কোথায় কি।
নাতীঃ বাক শক্তি ছিলো। কাগজ আর কলম ছিলো। সোস্যাল মিডিয়া ছিলো। তোমার পাশে প্রতিবাদ মঞ্চ ছিলো। পেস্টোন ছিলো। পোস্টার ছিলো।
এই বিধ্বংসী আত্মঘাতী প্রকল্পের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধ্বিক্কার জানিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেয়ার মতো অধিকারও কি তোমার ছিলো না? অন্তত দায় এড়ানোর পথটুকু হলেও খোলা থাকতো। সুন্দরবনের বাঘ তাঁড়িয়ে তুমি সারাবছর আবেগী ক্রিকেটীয় বাঘ নিয়ে মেতেছিলে। তুমি নিজেকে প্রগতিবাদী দাবী করেছিলে অথচ প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সোচ্ছ্বার হওনি। এ ব্যর্থতার মুখ লুকাবে কোথায়?
নানাঃ……………………………………….!

সুন্দরবন থেকে বাস্তবতার বাঘ পালাবে আর সত্য থেকে আমরা। এভাবে আমি আপনি আমরা হয়ে যাচ্ছি আগামী প্রজন্মের কাছে উত্তরহীন প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ। রামপাল বিদুত্‍ প্রকল্পকে না বলে সুন্দরবন বাঁচানো এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সুস্থ-সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব। মানুষের জন্য মানুষের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *