মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলেছেন যিনি


আওয়ামী লীগের লোকজন মুক্তিযুদ্ধে বাম দলগুলোর বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অপপ্রচার চালায় যে বামরা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলেছিল। জামাতের মতন মিথ্যাচার ও নোংরামিতে আওয়ামী লীগ কখনোই পিছিয়ে ছিল না। বামপন্থীদের ত্যাগের ইতিহাস মানুষের মন থেকে মুছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তারা এসব মিথ্যাচার করে। তাই সময় এসেছে এসব মিথ্যাবাদী দুর্নীতিবাজ আওয়ামী লীগদের মিথ্যাচারের জবাব দেওয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থীরা ৮-৯ ভাগে ভাগ হয়। শুধু একটি মাত্র দল আব্দুল হকের দল মুক্তিযুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে রাখে। বাকি দলগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের ভেতরে থাকা বামপন্থীরাই পরবর্তীতে বের হয়ে জাসদ গঠন করে। আওয়ামী লীগ এমন পর্যায় গেছে যে শুধু বামপন্থীরাই নয়, তাজউদ্দীনের মতন দেশ প্রেমিকরাও আওয়াম লীগ ত্যাগ করে। আব্দুল হকের উক্তিকেই এমন সকল বামপন্থীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

পারিবারিক পরিচিতি:
দেশ-জাতি ও জনগণের কাছে শোষণমুক্তির দিক নির্দেশনা এবং সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ ও মুৎসুদ্দীন পুঁজিবিরোধী আপোসহীন নেতৃত্বের এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ জননেতা আব্দুল হক ১৯২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর যশোর জেলার সদর থানার খড়কী গ্রামের প্রতাবশালী সামন্ত জোতদার পরিবার ও পীরবংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাহ মোহাম্মদ আবুল খায়ের রহমতুল্লাহ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অব যশোর জেলার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

শিক্ষাজীবন:
কমরেড আব্দুল হক ১৯৩৬ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজে ভর্তি হন। অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্র ১৯৪১ সালে অর্থনীতিতে (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। পার্টির সার্বক্ষণিক কাজের জন্য তিনি শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম. এ চুড়ান্ত পর্বের পরীক্ষার আগেই তিনি ও গৌর মজুমদার যৌথভাবে বনগাঁ মহাকুমার হাট-বাজারের টোল আদায় বন্ধে পার্টির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

রাজনৈতিক জীবন:
পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আব্দুল হক ছাত্রজীবন থেকেই অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং শ্রমিক শ্রেণীর আদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ গ্রহণ করে বিল্পবী কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪১ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ লাভ করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একজন কমিউনিস্ট হিসেবে শ্রমিক শ্রেণীর মহান আদর্শ ও রাজনীতিকে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে আপোষহীন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। শিক্ষাজীবনে ছাত্র রাজনীতির দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে ১৯৪৪ থেকে ৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গ সংগঠন- ছাত্র ফেডারেশনের প্রাদেশিক কমিটির সভাপতি ছিলেন। পার্টির সিদ্ধান্তে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার দায়িত্ব পেয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির নেতৃত্বে পরিচালিত যশোর জেলা কমিটির সভ্য হিসেবে সংগঠন সংগ্রাম গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম স্থপতি কমরেড মুজাফফর আহমদসহ আরও অনেক প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতাদের সংস্পর্শে আসেন কমরেড আব্দুল হক। ১৯৪১ সালে বনগাঁতে যশোর জেলা তৃতীয় কৃষক সম্মেলনে হাজী দানেশের সভাপতিত্বে তিনি মূল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনে ১৯৩৯ সালে ইংরেজ শাসকদের অপকীর্তির নমুনা হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙ্গার স্মরণীয় ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বসহ ১৯৪৩ সালের মহামন্তরে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো, ১৯৪৪ সালে হাটতোলা বিরোধী আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে তে-ভাগা আন্দোলন ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর প্রেক্ষাপটে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির যশোর জেলা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরের বছর ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ কলকাতার ওয়েলিংটন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। তিনি নেতৃত্ব দিয়ে এ পার্টিকে অগ্রসর করার সূচনালগ্নে গ্রেফতার হন। দীর্ঘ সময় কারা ভোগ করার পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার রাজবন্দীদের মুক্তি দিলে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা মুক্তি পায়। কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় ঔপনিবেশিক কারাকানুনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গঠন করেন যা ১৯৫০ সালের রাজশাহী জেলের ‘খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন’ নামে ইতিহাসখ্যাত হয়েছে। ৫২ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে খাপড়া ওয়ার্ডের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। ১৯৫৭-৫৮ সালে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের গণসংগঠন গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া হলে তিনি ১৯৫৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সভাপতি ছিলেন মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পার্টি সশস্ত্র সংগ্রামের লাইন গ্রহণ করার পর আত্মগোপনে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

ষাটের দশকে কমরেড আব্দুল হক বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে সোভিয়েত রাশিয়ার ক্রুশ্চেভের সংশোধনবাদীর নীতির বিরোধিতা করেন এবং তৃতীয় বিশ্বতত্ত্বসহ সকল ধরনের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেনিনবাদী পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা, মুৎসুদ্দী শ্রেণীর শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইকে অগ্রসর করে সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তিনি পশ্চিম বাংলার কমরেড চারু মজুমদারের লাইনকে সমর্থন করেন। কমরেড শরনিন্দু, দস্তিদার, অজয় ভট্টাচার্য, কমরেড সুখেন দস্তিদের (বসির ভাই), কমরেড উমর প্রমুখদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন ও শ্রেণী সংগ্রামের পথে শ্রেণী শত্রু খতমের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এক সময় হক-তোয়াহার মুক্ত অঞ্চল গড়ার আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছে। কমরেড তোয়াহার নেতৃত্বে নোয়াখালীর বিরাট এলাকা ও কমরেড আব্দুল হকের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া, ভেড়ামারা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনাসহ গোটা দক্ষিণ বাংলা মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। ওদিকে পাবনার আত্রাই এলাকায় কমরেড মতিন, কমরেড আলাউদ্দিনের, টিপু বিশ্বাস, ওহিদুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্ত এলাকা ঘোষণা দেয়া হয়। কমরেড সিরাজ শিকদার বরিশালের পেয়ারা বাগানে মুক্ত এলাকা ঘোষণা দেয়। কাজী জাফর তাঁর এলাকা হিসেবে ঘোষণা দেন টুঙ্গির শ্রমিক এলাকা। কমরেড দেবেন ও কমরেড আবুল বাশার তাঁদের এলাকা থেকে বিপ্লবের ডাক দেন। হক-তোয়াহা, মতিন-আলাউদ্দিন, দেবেন-বাশার, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, জাফর, মেনন, সিরাজ সিকদার অর্থাৎ সবার ওপরে মাওলানা ভাসানীর ঘেরাও আন্দোলন, হাজী দানেশের কৃষক আন্দোলন সব মিলিয়ে একটি সাজ সাজ রব পড়ে যায় সর্বত্র।

তখনই ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ফারল্যান্ডের নীলনকশায় সমাজ বিপ্লবের আন্দোলনকে ভিন্ন পথে পরিচালনা করার জন্য তাদের তল্পীবাহক শেখ মুজিবকে দিয়ে লাহোরে ইউসুফ হারুনের বাড়ীতে বসে কট্টর জাতীয়তাবাদী ৬ দফা কাকের ডিম ভেঙ্গে ধূম্রজাল সৃষ্টি করে সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনকে গলা টিপে ইন্দোনেশিয়ার মতো হত্যা করে। মিঃ ফারল্যন্ড এর পূর্বে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি দশ লাখ ইন্দোনেশিয়ানকে হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে আসেন। পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্বপাকিস্তানের আন্দোলনকে চীন সেজন্য সমর্থন দেয়নি। কমরেড আব্দুল হক এ আন্দোলনকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ Dog’s Fight আখ্যায়িত করে বলেন যে, “এ আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানুষের কোন পরিবর্তন বয়ে আনবে না। অবাঙ্গালী ২২ পরিবারের বদলে ২২ শত পরিবার সৃষ্টি হবে। কৃষক ও শ্রমিক আরও বেশি করে শোষিত হবে। সত্যিকার শ্রেণী সংগ্রাম ছাড়া শোষিত মানুষের মুক্তি আসবে না।”

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর কমরেড তোয়াহা-শান্তি সেন প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে এসে “বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল: নাম দিয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেন ও ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে তাদের অতীতের কর্মকান্ডের (শ্রেণী খতম, জোতদার খতম আন্দোলন) জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং এ ধারা যে ভুল ছিল তা বলে ঘোষণা দেন। মতিন-আলাউদ্দিন, মেনন-জাফর, দেবেন-বাশার সবাই প্রকাশ্যে রাজনীতিতে চলে আসেন। সিরাজ সিকদার শেখ মুজিব কর্তৃক এক বানোয়াট ঘটনায় নিহত হন। সংসদে শেখ মুজিব হুংকার দেন, “কোথায় আজ সিরাজ সিকদার”। কমরেড অধ্যাপক আসাবউদ্দীন, ডাঃ সাইফ-উদ-দাহার, বদরুদ্দীন উমরসহ সবাই মুক্ত রাজনীতিতে ফিরে আসেন। কিন্তু কমরেড আব্দুল হক ও কমরেড সুখেন দস্তিদার (বশির ভাই) মুক্ত রাজনীতিতে ফিরে আসেননি মৃত্যুর পরদিন পর্যন্ত। তাঁরা এদেশের শাসক শ্রেণীকে জনগণের শত্রু মনে করে তিন শত্রু সামন্তবাদ ও আমলা মুৎসুদ্দী পূঁজির শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির বিপ্লবী পথ পরিত্যাগ করেননি। শেষের দিকে কমরেড আব্দুল হক একাই পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি পরিত্যাগ করে পূর্বের লাইনকে সঠিক লাইন ঘোষণা দিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন। এ অবস্থায় তাঁর দলের বহু কর্মী হত্যা ও অন্যান্য উপদলের সাথে (সর্বহারা পার্টি ও অন্যান্য) অন্তর্দ্বন্দ্বে ও শাসক দল কর্তৃক নিহত হন।

কমরেড আব্দুল হক ও তাঁর পার্টি মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলে আখ্যায়িত করে। আওয়ামী লীগকে সমপ্রসারণবাদী ভারতের সেবাদাস হিসেবে চিহ্নিত করে অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন করার জন্য সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পার্টি জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়। তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে প্রগতিশীল পূর্ব বাংলা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। সর্বহারা পার্টি ৪৮টি গ্রামে মুক্তাঞ্চল গঠনের দাবী ঘোষণা করে। সমস্ত গোপন দলগুলো লড়াইয়ের মাধ্যমে সশস্ত্র পন্থায় বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের কর্মসূচী মুক্তাঞ্চল গঠনের দাবী ঘোষণা করে।

শ্রমিক-কৃষক জনগণের শত্রু সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-মুৎসুদ্দি পূঁজিবিরোধী গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার জন্য কমরেড আব্দুল হক ও তাঁর পার্টি ১৯৭১-এ যেমন বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তেমনি বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও বিপ্লবী যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। এটা করতে গিয়ে উগ্র বাঙ্গালী ও পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদী যেসব ত্রুটি ঘটেছে তা কাটিয়ে তুলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আলোকে আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মহান কর্তব্যকে অগ্রসর করেন আব্দুল হক।

বাংলাদেশের শোষকগোষ্ঠী ও তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন রুশ-ভারতপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ও সংশোধনবাদী রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলরা অদ্যাবধি তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে কমরেড আব্দুল হক ও তাঁর পার্টি বাংলাদেশের বিপস্নবী কমিউনিস্ট পার্টির (এম.এল) এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিপ্লবী আন্দোলনকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। এই প্রেক্ষিতে তারা মিথ্যা বানোয়াট বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, আব্দুল হক পাকিস্তানের ভুট্টো সরকারের কাছে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার জন্য অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এটা সহজে বোঝা যায় যে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি অবিচল কোন নেতা বা পার্টি কখনোই এ ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে না। কাজেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম.এল) এর কেন্দ্রীয় কমিটি এবং কমরেড আব্দুল হকের নামে অলীক কাহিনী তৈরি সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের অপপ্রচার জীবনের শেষ সময়েও উত্থাপিত এই প্রশ্নের জবাবে তিনি তা যথাযথ নয় বলে জানান।

কমরেড আব্দুল হক ও তৎকালনি সমস্ত গোপন দলগুলো লড়াইয়ের মাধ্যমে সশস্ত্রপন্থায় ক্ষমতা বিপ্লবের মাধ্যমে দখলের কর্মসূচী গ্রহণ করলেও “বিপ্লবের স্তর” ‘রাজনৈতিক চিন্তাধারা’ আদর্শ ও পন্থা ভিন্ন ভিন্ন ছিল। ফলে তত্তগত হেরফের মতাদর্শগত ভিন্নতায় একে অপরের প্রতিবিপ্লবী দালাল বলে পরষ্পরকে আখ্যায়িত করতে থাকে। ফলে তাদের মধ্যে কোন ঐক্য গড়ে উঠতে পারেনি। তাদের মতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাথে পূর্ব পাকিস্তানের শোষকদের একচেটিয়া শোষণের ক্ষেত্র। পূর্ব পাকিস্তানে উঠতি শোষকদের প্রতিযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানি বাঙ্গালী পূঁজিবাদী গোষ্ঠীরা পেরে না উঠায় সম্প্রসারণবাদী ও আধিপত্যবাদী ভারতের সহায়তায় নয়াবাজার সৃষ্টির ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরেও আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন অংশটি তখনও দেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার না করে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত দলের নামের আগে “পূর্ব পাকিস্তান” ব্যবহার করতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জানুয়ারী মাসে দীর্ঘ আলোচনার পর পার্টির পাকিস্তান নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশের বিপ্লবী” কমিউনিস্ট পার্টি নাম গ্রহণ করে। তাদের মূল আদর্শ ছিল মাওসেতুং এর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন করা। ১৯৮৬ সালের কংগ্রেসে দলটি মাওসেতুংকে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী এবং মাওবাদকে সংশোধনবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট নেতা এমভার হোজ্জাকে মহান মার্কসবাদী-লেনিনবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে। শ্রেণী শত্রু খতমের লাইন থেকে তারা সেসময় সরে এসে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা এবং যশোর জেলার খড়কী এলাকার বহু লোককে খতম ও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। বহু বাড়ী দখল, জমি দখল, চাঁদা আদায় ও বন্দুক লুটের ঘটনা ঘটাতো। একটি অংশ সন্ত্রাসী চক্র হিসেবে পার্টির নাম ভাঙ্গিয়ে লুটতরাজ, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মাধ্যমে এলাকার লাখ লাখ মানুষকে জিম্মি করে ফেলে। পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টি (হক গ্রুপ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (এম. এল), পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, বালাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (বিসিপি) বা জিয়া গ্রুপ, সাম্যবাদী দল (মোস্তা), সর্বহারা পার্টি (জোহা), সর্বহারা পার্টি (কামরুল), সর্বহারা পার্টি (সালাম), সর্বহারা পার্টি (শিবু)সহ সর্বহারা পার্টির কিছু ব্রাকেট বন্দী উপদল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করে। এরা সবাই শ্রেণী শত্রু খতম এর সাথে সাথে মতাদর্শক শত্রু নিধন করতে থাকে। ফলে তারা বহু খন্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। বন্দুকযুদ্ধ ও জবাই করে হত্যা ছাড়াও এ-গ্রুপ ও-গ্রুপের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি ও পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির স্বাক্ষরিত একটি অনাক্রমণ চুক্তি লংঘনের সাথে সাথে সংঘাত শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারী বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে এক ইস্তেহারে ব্যক্তি সন্ত্রাসবাদ ও প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী পারস্পরিক হানাহানি বন্ধ করে ইস্যু ও সামা্রজ্যবাদ বিরোধী কর্মসূচীর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়। ঐ বছরে জুলাই মাসে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় আঞ্চলিক পর্যায়ে কোন সমস্যার সৃষ্টি হলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে। এর আগে ১৯৯২ সালের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় কর্মীদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নেয়ার। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পরও আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণ চলতে থাকে। ১৯৯২ সালের ১৫ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা থানার কুতুবপুর ইউনিয়নের রতন মন্ডল ও তার বড় ছেলেকে প্রকাশ্য দিবালোকে মাঠের মধ্যে জবাই করে হত্যা করে প্রথমবারের মত চুক্তি লংঘন করে। ১৯৯২ সালে প্রতিপক্ষের হাতে ৪৩ জন কর্মী ও সমর্থক খুন হয়। এ অবস্থায় বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি তার কর্মীদের হাতে আবার অস্ত্র তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যশোর অভয়নগর থানার ভবানীপুর, নড়াইল সদরের মহর্তা গ্রামের ৫ জন সর্বহারা কর্মীকে হত্যার দায়দায়িত্ব দল স্বীকার করে এবং বলে যে, আত্মরক্ষার জন্য এই হত্যা করা হয়। ১৯ মে খুলনার ডুমুরিয়া থানার আল্লাদিপুর গ্রামে খুন হয় ভবতোষ রায় ভক্ত ও পঞ্চানন মন্ডল। পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নজরুল গ্রুপকে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির বরুণ গ্রুপের ভবতোষ রায় ভক্তকে খুন করে। সুখী নদীর পাড়ে ভক্তকে খুন করার সময় মন্ডলখালী ইউনিয়নের চৌকিদার পঞ্চানন মন্ডল দেখে ফেলায় তাকেও খুন করা হয়। ৪ মে চুয়াডাঙ্গা সদরের ঘামপাড়া গ্রামে আপন দুই ভাই মিঠু ও ইউসুফকে ধান মাড়ানো অবস্থায় খুন করে। ৩ মে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে জাসদ (রব) এর আলী বক্সকে টিভি দেখা অবস্থায় ধরে নিয়ে গিয়ে বাড়ী থেকে ৩ মাইল দূরে বলরামপুর গ্রামে জবাই করে হত্যা করে। ২৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের আসাননগরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মঞ্জুকে পুলিশের দালাল অভিযোগে খুন করা হয়। এভাবে পুলিশের দালাল, প্রতিবিপ্লবী, জনগণের শত্রু ইত্যাদি অভিযোগে ঘোষণার মাধ্যমে মানুষ খুন চলতে থাকে। মৃতদেহের উপরে লেখা থাকতো “জনগণের শত্রুকে খুন করা হলো”। মৃত্যুদন্ড মাথায় নিয়ে গ্রামবাসী ভয়ে পুলিশকে কোন তথ্য দিতো না। ঝিনাইদহ জেলার আতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফার বাড়াবাড়ির জন্য কমিউনিস্ট পার্টি তাকে মৃত্যুদন্ড প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়। ১২ এপ্রিলে প্রকাশিত বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি একটি প্রচারপত্রে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ধর্ষণের অভিযোগ আনে। পূর্ব বাংলা কর্মীদের দ্বারা পান্থাপাড়ার ২২টি ভূমিহীন পরিবারকে খাস জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ আনা হয় এবং ইস্তহারে বলা হয়, স্থানীয় গেরিলা স্কোয়াডের স্বাধীনভাবে শ্রেণীশত্রু নির্ধারণ ও খতমের অধিকার রয়েছে।

আজকে চীনকে সামনে রেখে চীন, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া ও কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক দেশ আখ্যায়িত করে সংশোধনবাদী যে ধারা প্রবাহমান তার বিরুদ্ধে কমরেড আব্দুল হক ও তাঁর পার্টি আদর্শগত ও রাজনীতিগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন। কমরেড আব্দুল হক ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ-গরবাচেভ মার্কা, তিন বিশ্বতত্ত্ব, মাওসেতুং চিন্তাধারা ও মাওবাদমার্কা সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আদর্শগত সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সকল রূপের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দৃভাবে সংগ্রাম চালিয়ে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের কমরেড স্টালিন বিরোধী অভিযানের সাথে সম্পর্কিত সংশোধনবাদীদের দক্ষিণপন্থী অবস্থান থেকে এবং বাম হঠকারী ট্রটস্কিপন্থী অবস্থান থেকে কমরেড স্টালিনকে আক্রমণ করার বিরুদ্ধে কমরেড আব্দুল হক রুখে দাঁড়ান এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ক্ষেত্রে কমরেড স্টালিনের অবদানসমূহকে রক্ষা করেন, ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে তিনি তত্ত্বগত সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়ার ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে সাম্রাজ্যবাদীরা, প্রতিক্রিয়াশীলরা, সংশোধনবাদীরা সমাজতন্ত্র ব্যর্থ বলে বিশ্বব্যাপী যে প্রচারাভিযান চালায় এবং প্রতিবিপ্লনবী ঝড় তোলে তার বিরুদ্ধে আপোষহীন ও অবিচলভাবে দৃঢ়তার সাথে আদর্শগত, রাজনীতিগত সংগ্রাম পরিচালনা করেন কমরেড আবদুল হক ও তাঁর পার্টি। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চেভ চক্রের ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার পূঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোও পূঁজিবাদের পথ ধরে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত পূঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ও উলঙ্গ প্রকাশ হচ্ছে ১৯৯০-৯১ এর পূর্ব ইউরোপ রাশিয়ার ঘটনাবলী। এটা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তথা সমাজতন্ত্রের মূলনীতি অনুসরণের ফল নয় বরং তার থেকে বিচ্যুত হয়ে পূঁজিবাদের পথ ধরার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এভাবে তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের নাম নিশানা মুছে ফেলার প্রতিবিপ্লবী ঝড়ের বিরুদ্ধে হিমালয়ের মত অটল থেকে বিপ্লবী দৃঢ়তা ও আশাবাদ নিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে রক্ষা করা এবং বিপ্লবী অনুশীলন চালানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।

বিশ্বে আজ কোথাও সমাজতন্ত্রের দেশ নেই। বিশ্বকমিউনিস্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে সাময়িক বাধা-বিঘ্ন ও বিপর্যয় এসেছে তার কারণ, উৎস ও প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করে শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কমরেড আব্দুল হক ও তাঁর পার্টি প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতা এবং অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা ও সার সংকলন করে সমালোচনা, আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে ভুল-ত্রুটি ব্যর্থতাকে কাটিয়ে তুলে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে অগ্রসর হন। দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাসের এই আঁকাবাঁকা গতিপথে অর্জিত শিক্ষা সামনে রেখে বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী ও তার অংশ হিসাবে এদেশের শ্রমিক শ্রেণীকে অগ্রসর হয়ে নতুন বিজয় অর্জনে দৃঢ় সংকল্প, সাহস ও বিপ্লবের আশাবাদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পথ আঁকাবাঁকা হলেও বিজয় অনিবার্য। কমরেড আব্দুল হক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এই দিক নির্দেশ করেছেন। সেজন্য প্রয়োজন যে শ্রমিক শ্রেণীর বলশেভিক ধরনের পার্টি তা গড়ে তুলে বিপ্লবী সংগ্রামকে অগ্রসর করার ক্ষেত্রে কমরেড আব্দুল হক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

কৃষক সংগঠন গড়ে তুলতে গিয়ে আব্দুল হক প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হন। শ্রেণীগতভাবে ধনী ও পীর বংশের সন্তান হওয়াতে দরিদ্র চাষীরা প্রথম দিকে তাঁকে গ্রহণ করতে পারেনি। এ সব সমস্যা নিরসনে তিনি প্রকৃতভাবেই ভূখা-নাঙ্গা মানুষের ভাগ্যকে নিজের ভাগ্য বলে গ্রহণ, তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তনের কারণ ও সমাধান বের করাই যে তাঁর জীবনের একমাত্র সাধনা তা প্রমাণে তাঁকে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে। ফলে শ্রেণীচ্যুতির কারণে নিজ পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে ছেদ পড়ে। কৃষকদের নিরক্ষতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদতা দূর করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিত উদ্যোগে তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং গ্রামের ক্ষেতমজুর ও গরীব চাষীদের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। একই সঙ্গে কৃষকদেরকে তাদের দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে সংগঠিত করেন এবং শ্রেণীসচেতনাতার শিক্ষা দেন। এক পর্যায়ে ফসল তোলার মওসুমে স্থানীয় গরীব কৃষকদের নিয়ে জোতদার পিতার জমি দখল ও ধানের গোলা দখল করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন।

ভারত বিভক্ত হবার পর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্টদের উপর দমন-পীড়ন অভিযান শুরু করে। এ সময়ে বহু কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে জনাব আব্দুল হকেকে গ্রেফতার করা হয়। সরকারের কমিউনিস্ট নিধন নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের খাপড়া ওয়ার্ডের রাজবন্দীদের অনশন ভাঙ্গানোর অছিলায় বিল্পবী কমিউনিস্টদের পুলিশী গুলি চালানোর মাধ্যমে। এ ঘটনায় ৭ জন নিহত হন এবং জনাব আব্দুল হক গুরুতর আহত হন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগেই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকারের গ্রেফতারী পরোয়ানা থাকার জন্য জনাব আব্দুল হক আমৃত্যু আত্মগোপন করে জীবন কাটাতে বাধ্য হন। আত্মগোপনকালীন সময়েও আব্দুল হক এদেশের ভূখা-নাঙ্গা মানুষের কাছ থেকে আত্মগোপন করেননি। তিনি সার্বক্ষণিকভাবে দেশের গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের মাঝে তাঁদের অনুপ্রেরণা দীপশিখা হিসাবে নিজেকে প্রজ্জ্বলিত রেখেছেন। তিনি জীবনের বিনিময়ে এ দেশের শ্রমজীবী মানুষের, ভাগ্যবঞ্চিত কৃষকদের মুক্তির সংগ্রামে প্রেরণা সঙ্গীত গেয়ে গেছেন। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আপোসহীন লড়াই, সংসদীয় ভোটের রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশে সশস্ত্র সংগ্রামে বিকল্প বিপ্লবীধারা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আব্দুল হকের অবদান অনন্য।

আব্দুল হক রূপার চামচ মুখে দিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর গোটা জীবনই ছিল কঠোর আদর্শে মোড়া। জীবনে কোন সুবিধাবাদ তো দূরের কথা, ব্যক্তিজীবনেও কোনদিন ভোগ কি জিনিষ তা উপভোগ করতে পারেননি। আদর্শের পথে কৃচ্ছ্রতা পালন করে গেছেন চিরদিন। তাঁর মত মেধা নিয়ে খুব কম ব্যক্তিই তাঁর সমসাময়িক সময়ে এদেশের রাজনীতিতে এসেছেন।

প্রণীত গ্রন্থাবলী:
এদেশের মানুষের মুক্তির পথনির্দেশনার জন্য কমরেড আব্দুল হক তাঁর চিন্তা ও চেতনার পাশাপাশি লেখনীকেও বেগবান রাখেন। তাঁর প্রণীত অন্যান্য গ্রন্থাবলী হচ্ছে ‘ইতিহাসের রায়-সমাজতন্ত্র’, ‘ক্ষুধা হইতে মুক্তির পথ’, ‘যত রক্ত তত ডলার’, ‘পূর্ববাংলা আধা ঔপনিবেশিক আধা সামান্তবাদী’, ‘মার্কসীয় দর্শন’, ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ-১, ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ-২, ‘বাংলাদেশের সামপ্রতিক অর্থনীতি’, ‘মাও সে তুং এর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে’।

পরলোক গমন:
আব্দুর হকের স্ত্রী তাঁর কঠোর জীবনকে সাথী করে নিতে পারেননি। আব্দুল হকের একটি ছেলে রয়েছে। তিনিও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেননি। ১৯৯৫ সালের ২২ ডিসেম্বর শুক্রবার রাত ১০টা ০৫ মিনিটে জননেতা আব্দুল হক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কমরেড আব্দুল হকের চেতনা ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন এদশের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল, আছে ও থাকবে।

তথ্য সূত্র :
জাগরণ বাষিকী ৯৮
যশোর জিলা স্কুল।
সংগ্রহ : প্রফেসর মোঃ নূরুজ্জামান

আব্দুল হকের জীবনী
সংগ্রহ :
হাবিব ইবনের মোস্তফা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *