মক্কাবাসীরা কি সত্যিই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল ? পর্ব-২(ইতিহাসের আলোকে)

আগের পর্বে বলা হয়েছে , কেন মুহাম্মদকে জানতে হলে হাদিস বা কোরান নয়, তার সম্পর্কিত ইতিহাস জানা উচিত। এটাও বলা হয়েছে ইবনে ইসহাকই সর্বপ্রথম মুহাম্মদের জীবনি লেখেন, পরবর্তীতে গত ১২০০/১৩০০ বছর ধরে মুহাম্মদ সম্পর্কে যত জীবনি লেখা হয়েছে, তার সূত্র এই ইবনে ইসহাকের সিরাত রাসুলুল্লাহ। এটাও বলা হয়েছে – মক্কায় মুহাম্মদ সুবিধা করতে না পেরে তার কতিপয় সাহাবি মদিনায় প্রেরন করেন , যাতে তারা সেখানে মদিনাবাসীদের কাছে মুহাম্মদ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত কিচ্ছা বলে তাদেরকে দলে ভিড়াতে পারে। এবার দেখা যাক , মুহাম্মদকে সত্যি সত্যিই মক্কাবাসীরা হত্যা করতে চেয়েছিল কি না।

এই ব্লগ পাতায় সরাসরি কোন পিডিএফ ফাইল পোষ্ট করা যায় না বিধায় , ইবনে ইসহাকের কিতাব থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করে সেটা উল্লেখ করা হবে। সেটা এখন বলা হচ্ছে ——————

মদিনায় হিজরত করা মক্কাবাসীদের প্রচারনায় মদিনার কিছু লোক বিশ্বাস করে ও ইসলাম গ্রহন করে, তাদের মধ্যে কিছু সর্দার গোছের লোকও ছিল। তখন মদিনায় হিজরত করা মক্কার লোকজন তাদের কাছে আবেদন জানায় , মদিনাবাসীরা মুহাম্মদকে মক্কায় আশ্রয় দেবে কি না এবং যদি মক্কা দখল করার জন্যে প্রয়োজনে মক্কাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে মদিনাবাসীরা মুহাম্মদকে সাহায্য করবে কি না। মক্কা দখল করা একারনে দরকার ছিল কারন , ইসলামের প্রধান ঘর(মুহাম্মদের দাবী অনুযায়ী) কাবা মক্কাতে ছিল। প্রাথমিকভাবে তারা সাহায্য করতে রাজী হয় কিন্তু তারা দাবী জানায় , এ ব্যপারে তারা সরাসরি মুহাম্মদের সাথে কথা বলতে চায়। তখন সিদ্ধান্ত হয়, সামনের হজ্জ মৌসুমে, মদিনা থেকে কিছু লোক যাবে মক্কাতে , সেখানে মুহাম্মদের সাথে তাদের সরাসরি আলাপ হবে। সেই মোতাবেক মদিনাবাসীরা হজ্জ করার সময় মুহাম্মদের সাথে সাক্ষাত করে , কথা বলে , সিদ্ধান্ত হয় যে , আল আকাবা নামক স্থানে এক রাতে পুরা বিষয়টা নিয়ে মদিনাবাসীদের সাথে বিস্তারিত কথা হবে ও সিদ্ধান্ত হবে।

নির্দিষ্ট দিনে গভীর রাতে ,মক্কার অদুরে আল আকাবা নামক স্থানে ৭২ জন মদিনাবাসী মুহাম্মদের সাথে সভা করার জন্যে অপেক্ষা করছিল। মুহাম্মদের সাথে তার চাচা আব্বাসও ছিল। আব্বাসই প্রথম বলে – “হে খাজরাজ গোত্রের লোক সকল, আমরা মুহাম্মদকে আমাদের গোত্রের মধ্যে সব রকম বিপদ থেকে রক্ষা করি। সে আমাদের মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বাস করে যদিও গোত্রের কিছু লোক তার বিরোধীতা করে। যদি তোমরা মনে কর, তোমরা মুহাম্মদকে তার বিরোধীতাকারীদের থেকে রক্ষা করতে পারবে,তাহলে তার সমস্ত দায় দায়ীত্ব তোমরা মাথা পেতে নাও। আর যদি তার দায় দায়ীত্ব না বহন করতে পার , তাহলে তাকে ছেড়ে দাও , সে আমাদের মধ্যে নিরাপত্তার সাথেই বসবাস করছে।”

তখন উপস্থিৎ মদিনাবাসীদের নেতারা মুহাম্মদের সাথে থাকার প্রতিজ্ঞা করল, এবং বলল- তারা মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুহাম্মদের সাথে থাকবে। এমন সময় মদিনাবাসীদের এক নেতা আবুল হেতাম বিন তাইহাম দাড়িয়ে বলল- “আমরা তো মদিনায় ইহুদিদের সাথে শান্তিপূর্নভাবে বাস করি, যদি আমরা তাদেরকে বাদ দিয়ে আপনারা সাথে যোগ দেই ও যখন আপনি মক্কা দখল করবেন , তখন কি আপনি আমাদেরকে ত্যাগ করে চলে যাবেন ?” তখন মুহাম্মদ বললেন -” না আমি তোমাদেরকে ছেড়ে যাব না, তোমরা যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে , আমিও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব , আর তোমরা যাদের সাথে শান্তিতে থাক , আমিও তাদের সাথে শান্তিতে থাকব।”

অত:পর সেখানে খাজরাজ গোত্র থেকে নয়জন ও আউস গোত্র থেকে তিনজন নেতা নির্বাচন করা হলো যারা মদিনাবাসীদের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেবে।

সভার শেষ দিকে , সলিম বিন আউফ বলল-” তোমরা কি বুঝতে পারছ, যদি তোমরা মুহাম্মদের পক্ষ নিয়ে মক্কাবাসীদের বিপক্ষে যুদ্ধ কর ও যুদ্ধে হেরে যাও , তাহলে তোমাদের জান ও মালের কোন নিরাপত্তা থাকবে না ?” সবাই জানাল , সেটা তারা বুঝতে পারছে আর তাতেই তারা রাজী। কিন্তু সেই সাথে তারা জিজ্ঞেস করল – মুহাম্মদের প্রতি তাদের এই আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে কি পাবে ? মুহাম্মদ বললেন – “তোমাদেরকে বেহেস্ত দেয়া হবে যেখানে আছে অফুরন্ত সুখ ও শান্তি।”

কিন্তু এই খবর দ্রুতই মক্কার কুরাইশরা ভোর বেলা জেনে ফেলল, তারা জানতে পারল মুহাম্মদ মদিনাবাসীদের সাথে পরিকল্পনা করেছে মক্কা আক্রমনের , তখন সাথে সাথেই তারা আল আকাবার দিকে ছুটে গেল আর দুইজনকে তারা ধরে ফেলল, বাকীরা সবাই পালিয়ে গেল। এই ঘটনার পর পরই মক্কার কুরাইশ সর্দাররা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করল, মুহাম্মদের এই প্রচন্ড বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি দিতে হবে , আর তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে হবে।

সূত্র: পৃষ্ঠা- ২০০- ২০৫, সিরাত রাসুলুল্লাহ- ইবনে ইসহাক(https://archive.org/details/TheLifeOfMohammedGuillaume)

উপরের বর্ননায় পরিস্কার মুহাম্মদের চাচা আব্বাস বলছে – মুহাম্মদ তাদের মধ্যে কিছু লোকের বিরোধিতা সত্ত্বেও সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে বাস করছিলেন। কিছু লোক যে বিরোধীতা করত , সেটা আর কিছু না , সেটা হলো তিনি কুরাইশদের ধর্মকে অবমাননা করতেন, তাদের মন্দির কাবা ঘরে জোর করে ঢুকে তাদের ধর্মের অবমাননা করতেন , আর তার সৃষ্ট ইসলাম প্রচার করতেন- কিন্তু কুরাইশরা সেটা করতে তাকে নিষেধ করত, এটাই ছিল মূল বিরোধিতা। অত:পর কুরাইশদের বিরুদ্ধে এখন মুহাম্মদ মদিনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করছেন মক্কা আক্রমনের , কিন্তু কি কারনে ? কারন তারা ইসলাম গ্রহন করে নি। উক্ত সভায় কিন্তু কোথাও কেউ বা মুহাম্মদ নিজেও বলেন নি যে, মক্কাবাসীরা মুহাম্মদকে অত্যাচার করত , বা তার লোকদের অত্যাচার করত , একারনে মুহাম্মদ মদিনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করছেন, বরং তার চাচা আব্বাস নিজেই বলছেন ,মুহাম্মদ তাদের মধ্যে সম্মান ও নিরাপত্তার সাথেই বাস করত। আর এভাবেই মুহাম্মদ বিগত তেরটা বছর বাস করেছেন , যদিও কুরাইশরা তার ধর্মকে গ্রহন করে নি ,কিন্তু তাই বলে , তারা মুহাম্মদকে অত্যাচার করে নি।তাকে হত্যা করার কথা তো তারা কল্পনাও করে নি।

কিন্তু তার পরিবর্তে মুহাম্মদ কি ষড়যন্ত্র করছেন ? তিনি মদিনাবাসীদেরকে বেহেস্তের লোভ দেখিয়ে মক্কাবাসীদেরকে আক্রমন করার পায়তারা করছেন , আর যখন সেটা মক্কাবাসীরা জেনে ফেলে বিশ্বাসঘাতক মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যে পরিকল্পনা করল , তখন সব দোষ হয়ে গেল কুরাইশদের। সেই গত বার/তেরশ বছর ধরে , আমরা শুনে আসছি , কুরাইশরা মুহাম্মদকে এমন অত্যাচার করত যার কোন সীমা ছিল না , তারপর তাকে তারা হত্যা করতে গেছিল কিন্তু আল্লাহর কুদরতে তিনি বেঁচে গেছেন। ইসলামের কোন কিতাবে আজ পর্যন্ত কোথাও লেখা নেই যে , মুহাম্মদ আসলে ছিলেন সীমাহীন বিশ্বাসঘাতক। কুরাইশরা তাকে সম্মান ও নিরাপত্তা দিয়েছিল যদিও মুহাম্মদ তাদের ধর্মকে অপমান করতেন ,কিন্তু তার প্রতিদান স্বরূপ মুহাম্মদ বিশ্বাসঘাতকতা করে বাইরের লোকদের সাথে আঁতাত করে সেই কুরাইশদেরকে আক্রমন করে হত্যা করে , মক্কা দখলের পায়তারা করেন।

এই যখন অবস্থা , তখন কুরাইশরা কি মুহাম্মদকে ধরে মাথায় তুলে নাচবে ? বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি কি হওয়া উচিত?

এখানে আর একটা বিষয় খেয়াল করতে হবে। মদিনাবাসীদেরকে যখন বলা হয়, যদি মুহাম্মদ হেরে যায় , তাহলে তাদের জান মালের কোন নিরাপত্তা থাকবে না। তাতেও কেন মদিনাবাসীরা রাজী হয় ? খুবই সোজা। আসলে মদিনাবাসীরা মক্কা আক্রমন করে হেরে গেলেও তাতে তাদের জান মালের কোনই অসুবিধা হবে না এটা তারা জানত। কিভাবে ? যদি কেউ মক্কা মদিনার ভৌগলিক অবস্থান দেখেন , তাহলে সহজেই সেটা বুঝতে পারার কথা। মক্কার লোকদের জীবন তখন নির্ভর করত সিরিয়ার সাথে যে বানিজ্য ছিল তার ওপর। তো মক্কা থেকে সিরিয়া যেতে গেলে মদিনার পাশ দিয়েই যেতে হতো। কারন মদিনার অবস্থান হলো মক্কা ও সিরিয়ার মাঝখানে। আর কোন সহজ বানিজ্য পথ তখন ছিল না। তাই মক্কাবাসীদেরকে টিকে থাকতে গেলে সর্বদাই মদিনাবাসীদের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হতো। না হলে মদিনাবাসীরা ইচ্ছা করলেই মক্কাবাসীদের বানিজ্য বন্দ করে দিতে পারত। মুহাম্মদ যখন প্রান বাঁচানোর জন্যে মদিনায় পালিয়ে যান, তখন এই কৌশলটাই অবলম্বন করে মক্কাবাসীদেরকে কাবু করে ফেলেন। তিনি একটা দল গঠন করে , প্রায় নিয়মিত মক্কার বানিজ্য কাফেলার ওপর আক্রমন করতেন ,বনিকদেরকে হত্যা করতেন , তাদের মালামাল কেড়ে নিতেন । এটা ছিল আসলে স্রেফ ডাকাতি। যদিও কোরান ও হাদিসে বলা হয়েছে এটা হলো জিহাদ , যুদ্ধ ইত্যাদি। কিন্তু আতর্কিতে বানিজ্য কাফেলায় আক্রমন করে বনিকদেরকে হত্যা করা ও তাদের মালামাল লুটপাট করাকে কি যুদ্ধ বা জিহাদ বলে ?

এছাড়া মদিনাবাসীদের কেন মক্কা দখলের ইচ্ছা ছিল ? সেটাও অত্যন্ত সোজা বোঝার জন্যে। মদিনাবাসীরা ছিল গরিব , কৃষিজীবি।পক্ষান্তরে মক্কার লোকজন কাবা ঘর কেন্দ্রিক হজ্জ বানিজ্য থেকে অনেক মুনাফা করত যা তাদের জীবনকে স্বাচ্ছল্য এনে দিত। তাই মদিনাবাসীদের সব সময় স্বপ্ন ছিল মক্কা দখল করতে পারলে তারা সেই মুনাফার অংশীদার হবে।

যখন মুমিনদেরকে এই ডাকাতির কথা জিজ্ঞেস করা হয়, আচ্ছা নবী মুহাম্মদ কিভাবে ডাকাতি করতে পারেন ? তখন মুমিনেরা কিছুামাত্র চিন্তাভাবনা না করেই উত্তর দেয়- মক্কাবাসীরা মুহাম্মদ ও তার দলবলকে মক্কা থেকে তাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল , মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল , তারই প্রতিশোধ স্বরূপ , মুহাম্মদের এই ডাকাতি বৈধ। কিন্তু এখন সার্বিক ইতিহাস জানা গেল। সেখানে কি মক্কাবাসীরা মুহাম্মদকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল ? অথবা তারা কি আসলেই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল ? নাকি মুহাম্মদই তার বিশ্বাসঘাতকতার কারনে নিজের বিপদ ডেকে এনেছিলেন ? আর অত:পর গত বার তেরশ বছর ধরে , মুহাম্মদের সেই বিশ্বাসঘাতকতাকে গোপন করে , সব দোষ কুরাইশদের ওপর চাপান হয়।

তাহলে কি দেখা যাচ্ছে ? ইসলাম কি ১০০%ই মিথ্যাচারের ওপর দাড়িয়ে আছে ?

মক্কাবাসীরা কি সত্যিই মুহাম্মদকে হত্যা করতে চেয়েছিল ?- পর্ব-১(ইতিহাসের ভিত্তিতে) – See more at: http://istishon.blog/?q=node/21778#sthash.Td1LBQnH.dpuf

চলবে—————————————————————–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *