গিটারের গেরিলা কবির সুমন : ‘ছেলেবেলার সেই লোকটা চলে গেছে গান শুনিয়ে’

(প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরের মধ্যে আমি শুধু দেখি আজরাইল ফেরেশতার বেশ ধরে কে যেনো আমার শিয়রে বসে। তারপরও কবির সুমনকে নিয়ে লিখলাম, কারণ আমি তার ভক্ত ছিলাম।)


(প্রচণ্ড জ্বর। জ্বরের মধ্যে আমি শুধু দেখি আজরাইল ফেরেশতার বেশ ধরে কে যেনো আমার শিয়রে বসে। তারপরও কবির সুমনকে নিয়ে লিখলাম, কারণ আমি তার ভক্ত ছিলাম।)

ও গানওয়াল আর একটা গান গাও
আমার আর কোথাও যাবার নেই
কিচ্ছু করার নেই…
ছেলেবেলার সেই , ছেলেবেলার সেই
বেহালা বাজানো লোকটা , চলে গেছে বেহালা নিয়েই
চলে গেছে গান শুনিয়েই
এই পালটানো সময়েই , এই পালটানো সময়েই
সে ফিরবে কি ফিরবে না জানা নেই
ও গানওয়ালা আর একটা গান গাও
আমার আর কোথাও যাবার নেই
কিচ্ছু করার নেই…
কৈশোর শেষ হওয়া , কৈশোর শেষ হওয়া ,
রঙ চঙ্গে স্বপ্নের দিন
চলে গেছে রঙ হারিয়ে , চলে গেছে মুখ ফিরিয়েই
এই ফটাকাবাজির দেশে , এই ফটাকাবাজির দেশে
স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই…

…গানওয়ালা/কবির সুমন

আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের যুগে বড় হয়নি, প্রবল মুক্তবাজার অর্থনীতি আর তৃতীয় বিশ্বের লুটেরা রাজনীতির ককটেলে বুদ হয়ে থাকা একটি সমাজের প্রান্ত থেকে এই রাজধানী ঢাকা শহরে ওঠে এসেছি, মিডিয়া, এনজিও কর্মী কিম্বা আমার মত যেসব বন্ধুরা স্বপ্ন দেখতেন শ্রেণিহীন সমাজের যারা চিত্রা মধুমতি নবগঙ্গার তীরে আজো ফসলের বুকে আঁকে অস্ত্রের ক্যানভাস, যাদেরকে ক্যালানুসের ভুতের মত ‘সাম্যবাদ’ই পৃথিবীর বসরার গোলাপের অধিক মনে হয়-তাদের কাছে সুমন চট্টোপাধ্যায়, সুমন চ্যাটুজে বা কবির সুমন গিটার হাতে একজন গেরিলার নাম, একজন জোশে হোসে মার্তি কিম্বা সিরাজ সিকদার, চারু মজুমদার বা নাম জানা নিহত হাজারো কমরেডদস সম নক্ষত্রের বা ফুলের সমান।

মনে আছে আপনার, একবার গেয়েছিলেন,

‘আমি চাই হিন্দু নেতার সালমা খাতুন পুত্র বধূ
আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু,
আমি চাই বিজেপি নেতার সালমা খাতুন পুত্র বধূ
আমি চাই ধর্ম বলতে মানুষ বুঝবে মানুষ শুধু।’

এরপর যখন আপনি সাবিনাকে বিয়ে করলেন তখন নিজের নামই পাল্টে ফেললেন!!কী আশ্চার্য্য। অথচ দেখুন আমাদের এ বাংলায় আমি এরকম বহু মানুষকে জানি তারা সেটি করেনি। সাবিনা ইয়াসমিনকে বিয়ে করে চট্টোপাধ্যয় থেকে কবির হয়ে গেলেন। চাটুজ্যে বড়লোকের ধর্ম। তা তিনি বাদ দিতেই পারেন, কারণ অন্তরে তার মানুষের বাইরে কিছু দেখিনি অন্তত আমরা যার আড্ডার সাগরেদ নই, আমরা যারা গান দিকে তাকে ধরি-তারা এরকমই ভাবেন। মনে আছে, সেই প্রথম লাল পলাতাকার মিছিলে যাবার সময় সুমনের এই মধ্য বয়সের ধর্ম পরিবর্তন আমাদের বন্ধু কমরেড মহলে বিরাট তর্ক জুড়ে দিয়েছিলো। আজকের মত ইন্টারনেট আর ঘরে বসে আনন্দ বাজার কিম্বা সুমনের ফেসবুক পোস্ট দেখার সুযোগ তখনো হয়নি। ফলে একেকজন একেকরকম ব্যাখ্যা দিয়ে রাতগুলো পার হোত। আমরা, আমাদের বন্ধুরা কখনোই ভালো ছাত্র হতে চাইনি, তবুও তারা কিভাবে কেমন করে যেনো দেশের সব থেকে নামি ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র বনে গিয়েছিলো। এটি সত্যিই এক অবাক বিস্ময়ের। এখন বুঝি ভালো ছাত্র হওয়া স্রেফ ইচ্ছের বিষয়। সেই ইচ্ছেটাই আমাদের ছিলো না। এর থেকে ঢের বেশি গুরুত্ব ছিলো

‘বার বার ফিরে এসেছি আমরা এই পৃথিবীর টানে
কখনো গাঙর, কখনো কো পাই কপোতাক্ষর গানে
গাঙর হয়েছে কখনো কাবেরী, কখনো বা মিসিসিপি
কখনো রাইন কখনো কঙ্গো নদীদের স্বরলিপি’

এরপর সুমন, কবির সুমন প্রবল প্রতাপে শীরদাড়া সোজা করে একাই বলে গেলেন, জঙ্গল মহলে খুন হচ্ছে, মানুষের রক্ত ঝরছে। নকশালরা মরছে সিপিএমের সন্ত্রাসে। আমরা যারা এপার বাংলায়, বাংলাদেশে সিপিএমের ভক্ত ছিলাম না, যাদেরকে নকশালবাদী আন্দোলন ‘সন্ত্রাসবাদী’ আন্দোলন খুব টানতো বা এখনো হয়তো টানে, সুমনের এসব বক্তব্যে তাকে আমাদের সিধু মাঝির মত লাগতো। মনে হোত, কোথা থেকে সিধু ওঠে এসেছে, মাদলের বদলে হাতে গিটার নিয়ে।

পৃথিবীর কোথাও সংগ্রামের সংবাদগুলো আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনতাম। মনে আছে একবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসির সামনে আমরা পেরুর কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান যিনি তিন যুগ কারাগারে রয়েছেন সেই ড. আবেমিয়াল গুজমানের ফেক ট্রাইলের বিরুদ্ধে একটা সমাবেশ করেছিলাম। সেটা ২০০৪ এর দিকে হবে। ভাবুন, কোথায় লাতিন আমেরিকার পেরু, সেখানকার নিভু নিভু শাইনিং পাথের আন্দোলনের নেতার জন্য ঢাকায় বসে আমরা কাঁদছি। সত্যিই, পৃথিবীর কোথাও মানুষ লড়ছে তার আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য এর চেয়ে আনন্দের খবর আমাদের কাছে কিছু নেই। এ কারণে যখনই নেপালে মাওবাদীরা কোন পুলিশ ব্যারাক গুড়িয়ে দিতো মনে হোত, এইতো বিপ্লব এগুচ্ছে, কমরেড চে গুয়েভারা যেনো পৃথিবীর কোনে কোনে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও বাংলাদেশে এইসব আন্দোলন সংগ্রামের দিন শেষ করে দিয়েছে এখানকার শাসকশ্রেণি। বিপ্লবীদেরও ঢের ভুল আছে। সে কারণেই হয়তো অন্যদেশে মুক্তির সংগ্রাম দেখলে আনন্দ হোত, চোখের নিচে কোথা থেকে যেনো আনান্দাশ্র“ ঝরে পড়তো।


এই ক্ষত শুধু ভারতের না, গোটা সভ্যতার

কাশ্মিরে যখন প্লেট গান দিয়ে মানুষকে অন্ধ করছে ভারতের খুনি রাষ্ট্র তখন আমি দেখেছি কলকাতা কিম্বা অন্য রাজ্যগুলোতে মানুষ বামপন্থিদের নেতৃত্বেই মাঠে নেমেছে। আওয়াজ ওঠেছে কাশ্মিরকে স্বাধীন হতে দাও। পৃথিবীতে স্বাধীনতা শব্দটির মত এতো মায়াময় ভালোবাসার শব্দ আর দ্বিতীয়টি নেই। বাংলাদেশে নানান সমস্যা, নানান সঙ্কট কিন্তু এতো সঙ্কট, জঙ্গিবাদ তার ভেতরও কাশ্মিমের স্বাধীনতার জন্য, আজাদি কাশ্মিরের জন্য এখানেও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। কমরেড বদরুদ্দীন উমর, কমরেড ফয়জুল হাকিম লালাদের নেতৃত্বের সংগঠন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের ওই বিক্ষোভ সমাবেশ যত ক্ষুদ্রই হোক-তা হলো ব্যাপ্তি ও চেতনার দিক থেকে আকাশের সমান।

ভারতের মত এ দেশেও বাম আছে হরে দরে। সকাল বিকাল মন্ত্রী হওয়া, গাড়ি, টিভি টক শো, গ্লামার, মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার জন্য ছ্যাবলামি করা, একটা কিছু হোক এর জন্য হাপিত্যিশ করা এইসব বামেরা কিন্তু কাশ্মিরের জন্য রাস্তায় নামেনি। যদিও সমাজ তাদেরকেই লাল পতাকার ধারক বাহক হিসেবেই মান্যি গন্যি ও একইসাথে গালমন্দ করে।

কিন্তু কবির সুমন যিনি একাধারে গিটার হাতে গেরিলা ও দার্শনিক যিনি আমাদেরকে একটি সাম্যবাদী সমাজের জন্য আজও উদাস বানিয়ে দেন। পরিবার, সমাজ সংসার সব কিছু আমাদেরকে কাছে হেমলক মনে হয়, সেই কবির সুমন যখন তৃণমূল কংগ্রেসর নেতা হয়ে ভোটে দাড়ান-শুয়োরের খোয়াড়ে ঢোকার জন্য তৃণমূলের টিকিট নেন; তখন আমরা সব ‘বানচোদ’ বাঞ্চোত বনে যাই। সত্যিই নবারুনের মত মনে হয়,

একদিকে চাষীরা মার খাচ্ছে,
অন্যদিকে ওনারা দাঁত কেলাচ্ছে,
কবিতা পাঠ করছে,
বানচোদগুলো মানুষ না, অ্যামিবা’।

এই মৃত্যু উপাত্যকে নিজের দেশ হিসেবে অনেক আগেই নবারুন অস্বীকার করে গেছেন। আর আমরা সেই দেশের ওপর কত মহত্ব আরোপ করে তাকে দেশমাতৃকা নাম দিচ্ছি, কত কাব্য করছি।

নবারুনের নিজের আবৃত্তি করা কবিতাটি আগ্রহীরা শুনতে পারেন এখান থেকে

‘কোন গানের কথা আজ বলবো না কবির তোমায়’
প্রিয় কবির সুমন, আপনার সব গানই শুনেছি। গানগুলোতো নেহাত গান নয়-একেকটা আয়াত। মানুষের স্বাধীন হবার আয়াত, বিপ্লবের রাস্তায় নেমে একটু বৃষ্টিতে ভেজার মত রোমান্টিক হওয়ার আয়াত। আপনার ‘ঘুমাও বাউন্ডুলে’ কী অদ্ভুত মমতা নিয়ে ঝড় তোলে আমাদের হৃদয়ে।

কিম্বা আপনার ‘অভিবাদন’ গানটি। এ বাংলার অভিমানি কবি শহীদ কাদরির কবিতাটি এমন করে গাইলেন যেনো মনে হলো মৃত্যুর আগে হলেও ‘মানবজনমের’ এই সমাজ আমরা আনবোই।

আপনার ‘তোমাকে চাই’ নিয়ে কথা বলবো না। কারণ একটি গান কিভাবে বৃষ্টির মত, প্লাবনের মত, ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়লো। সে কী মিউজিক! সে কী বন্দনা। এমন গানও হয়। এই গান থাকুক আমার ভেতর গোপন প্রেমের মত, গোপন কস্টের মত-যেমন আপনি ছিলেন গিটারের গেরিলা।

চিটফাণ্ড-নারদ যুগলেও আপনি তৃণমূল!!
এপার বাংলায় বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো রিতিমত হাফিস হয়ে গেছে। এখানে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছে বিগ ব্যবসায়ীরা। এদের কেউ কেউ জেলে। বাংলাদেশের স্বয়ং অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সাগর চুরি হয়েছে।’

আর রুচির দিক থেকে যদি বলেন, সেটির অবস্থা ভয়াবহ। সর্বশেষ কলকাতায় গিয়ে দেখেছি, রাস্তার মোড়ে এমন ফেস্টুন পোস্টার যেখানে দাবি করা হচ্ছে একটি টয়লেট স্থাপনের জন্য মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বই সম্ভব হয়েছে। ভাবুন একবার!!

আপনার পশ্চিমবাংলায় তৃণমূল ক্ষমতায় যাবার পর মতাদর্শিক কোন পরিবর্তন চোখে পড়েনি যতবার গেছি কলকাতা ও পশ্চিমবাংলায়। পরিবর্তন হবারও কথা নয়-কারণ তৃণমূল একটি সংসদীয় ধারার বুর্জোয়া পার্টি তার কাছ থেকে মতাদর্শিক পরিবর্তন আশা করাটা বাতুলতা। তবে চর দখলের মত আপনার দল তৃণমূল যেভাবে জনগনের টাকা পয়সা ঝেড়ে দিয়েছে তাতে দলটি যে অর্থের প্রতি ভয়ানক লোভ সেটি কিন্তু স্পষ্ট ধরা পড়েছে। চিটফাণ্ড সারদা কেলেঙ্কারিতে আপনাদের বাঘা বাঘা নেতারা ধরাশয়ি। এরপরতো দেখা গেলো, নারদের স্ট্রিং অপারেশন।

‘নারদ নিউজ ডট কমে’ প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ইউটিউবে প্রচার করা ভিডিও অনুযায়ী, অর্থ নেয়া মন্ত্রী-নেতা-সাংসদ-মেয়রের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন তৃণমূলের সাবেক রেলমন্ত্রী মুকুল রায়। ভিডিওতে দেখা যায়, ২০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার ব্যাপারে মুকুল রায়ের সঙ্গে গোপন ক্যামেরার পেছনে বসে থাকা কয়েকজনের কথা হচ্ছে। মুকুল রায় টাকা নিজের হাতে নিচ্ছেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এস এম এইচ মির্জার কাছে টাকা পৌঁছে দিতে বলছেন। তারপর মির্জা নিজে টাকা নিচ্ছেন, ভিডিওতে এমন ছবি দেখা যায়। বেশিরভাগ মন্ত্রী-নেতাকে পাঁচ লাখ করে টাকা দেয়া হয়। তাদের মধ্যে আছেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, তৃণমূল সংসদ সদস্য সৌগত রায়, সুলতান আহমেদ, শুভেন্দু অধিকারী, কাকলী ঘোষ দস্তিদার, প্রসূন ব্যানার্জি, ইকবাল আহমেদ, সাবেক পরিবহন মন্ত্রী মদন মিত্র, পৌর ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। কলকাতার মেয়র শোভন চ্যাটার্জিও নেন চার লাখ টাকা।

এই ঘুষ নেওয়ার জন্য প্রধানভাবে যারা দায়ি তাদের একজন হলেন মদন মোহন মিত্র। তিনি এখন জেলে ঘুষ নেওয়ার দায়ে। আপনি সেই ঘুষখোর লোকটির মুক্তি চেয়েছেন। হ্যা, আপনি একই সময় ছত্রধরেরও মুক্তি চেয়েছেন। রাজবন্দিদেরও মুক্তি চেয়েছেন। এই রাজবন্দিরা সবাই মাওবাদি। নিশ্চয় যারা ঘুষ নেওয়ার দায়ে জেলে আছেন তাদেরকে দুনিয়ার কোথাও রাজবন্দির মর্যাদা দিবেন না, তাতে অতিত ও বর্তমানের বিপ্লবী রাজনীতির দায়ে কারাগারে থাকা মানুষদের ওপর ভিষন অন্যায় হবে।

এই রিপোর্টগুলোকে নিশ্চয় অস্বীকার করবেন না?

এরপরও কী একজন গায়ক, একজন গিটারের গেরিলা তৃণমূলের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? এটি স্ট্রাটেজিক মিত্রতা? আমি জানি না। যদি এটা হয়ও তবে ওই মিত্রতার দরকার নেই। জানি বিপ্লব কোন বিশুদ্ধ বায়বীয় বিষয় নয়, তবুও বিপ্লবের জন্য শয়তানের মন্দির বানানোও বিপ্লবীদের কাজ নয়। লুসিফারের মন্দির হিটলার -মুসোলিনের ভক্তরা বানাক। এটা তাদের কাজ।

আলবৎ সিপিএমের সন্ত্রাস গোটা পশ্চিমবাংলাকে লাল রক্তে ভিজিয়েছে। গোটা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সিপিএম তাদের শোধনবাদি লাইনের কারণে পিছিয়ে। বামপন্থাকে সংসদীয় ধারার একটি আপোষকামি বিড়ালে পরিণত করেছে সিপিএম। এ কারণে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে ওপার বাংলার পাশাপাশি এখান থেকে, এই বাংলাদেশ থেকেও সেদিন আমরা কলম ধরেছিলাম। কিন্তু শুধু কি সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীতে শেষ হয়েছে মানুষ? সারদায় কী তারা শেষ হয়নি কবির সুমন?

কবির সুমন, আমরা ভুলিনি আপনার সরকার তৃণমূল সুদীপ্তকে পিটিয়ে হত্যা করেছিলো

এরপর মূখ্যমন্ত্রীর কি বয়ান ছিলো সেটাও আমরা জানি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সিপিএম আমলে কী এর থেকে ভিন্ন আদর্শিক কিছু ছিলো না? মোটেও না। তাহলে একটি দূবৃত্তের শাসন ব্যবস্থাকে হটিয়ে আরো উন্নততর দূবৃত্তের শাসন ব্যবস্থা যখন জনগনের ওপর চেপে বসে তখন কী আমরা দুটোর মধ্যে তুলনা করতে পারি কোনটা কম দূবৃত্ত? বিষয়টি হলো এমন, যখন দু’জন ধর্ষক কোন নারীকে ধর্ষন করলো আর আমরা তুলনা করছি এই দুজনের মধ্যে কোনজনের আচারণ অপেক্ষাকৃত কম খারাপ ছিলো। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষি, এভাবে আমরা ধর্ষকদেরকে মহিয়ান করতে পারবো না। বরং ইতিহাসে ইহাদের নাম ধর্ষক হিসেবেই থাকবে।

এর আগে সিপিএম অভিযোগ করতো মাওবাদীদের সাথে তৃণমূলের সখ্যতা রয়েছে। মাওবাদী তৃণমূল মিলে সিপিএমের কর্মীদের খুন করছে। এখন সেই অভিযোগ তৃণমূল করছে যে সিপিএমের সাথে মাওবাদীদের যোগ রয়েছে। কী দারুণ মঞ্চায়ন তাই কবির সুমন?

এর আগে সিপিএম অভিযোগ করতো মাওবাদীদের সাথে তৃণমূলের সখ্যতা রয়েছে। মাওবাদী তৃণমূল মিলে সিপিএমের কর্মীদের খুন করছে। এখন সেই অভিযোগ তৃণমূল করছে যে সিপিএমের সাথে মাওবাদীদের যোগ রয়েছে। কী দারুণ মঞ্চায়ন তাই কবির সুমন?

যেবার তৃণমূল ক্ষমতায় এলো সেই সেবার আপনারা বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে জঙ্গলমহল লালগড় থেকে আপনারা জরুরী অবস্থা দুর করবেন। কিন্তু কিসের কী? ‘কাউন্টার ইনসারজেন্সি ফোর্স (সিআইএফ) এর সদর দপ্তর খুলতে যাচ্ছে সালবুনিতে। দারুন!মারহাবা!! আরো জানতে পড়তে পারেন চাইলে এখানে গুতান

আপনি অবশ্য নিজেই স্বীকার করেছেন ‘উপলব্দি নেই আপনার ও আপনার দলের। টাকা পয়সা বাড়ানোর বিষয়ে তারা ব্যস্ত।’ পুরোটা অন্যরা শুনতে পারেন মকবুলের সাথে কথোপকথোনে ২ আগস্ট ২০১২। কবির সুমনের নিজের অনলাইনের এই লিংকে যেতে পারেন।

গিটারের গেরিলাকে ভালোবাসিয়াছিলাম, বিদায় গেরিলা :
প্রিয় কবির সুমন, আপনার কী মনে আছে ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি রাজ্জাককে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আপনি কী বলেছিলেন? আপনি বলেছিলেন, ‘আমি না থাকলে মমতা (মমতা বন্দোপাধ্যায়) কোথায় থাকতেন? কলকাতা শহরে আমি আর মহাশ্বেতা না থাকলে, সিঙ্গুর নন্দ্রিগাম লালগড় না থাকলে সিম (মূখ্যমন্ত্রী) হতেন (মমতাকে উদ্দেশ্য করে)?

এ সময় তিনি তৃণমূলের আরেক বিধায়ক ও ঘুষ কেলেঙ্কারির অন্যতম হোত ফিরহাদ হাকিম সম্পর্কে বলেছেন, ‘এরকম কথা (ফিরহাদ হাকিম সুমন সম্পর্কে বলেছিলেন, সুমন হিংসা ছড়িয়ে দিচ্ছে) কেউ সিরিয়াসলি বলেন এবং ভাবেন আমি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি তিনি টেলিভিশনে আমার সঙ্গে বির্তকে আসুন।

এবিপিএন এর পুরো নিউজটি দেখতে ইউটিউবের এই লিংকে যেতে পারেন।

প্রিয় কবির সুমন, মদন মিত্র সম্পর্কিত বক্তব্য নিয়ে আপনি আপনার ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন,

‘এখানে যারা খিস্তিখেউড় করে গেছে, যেসব ফুটোপাত্তর তলাপাত্তর শিরদাঁড়া খিলনাড়ার উইঢিবি, মানবেতিহাসে গু ছোঁড়াছুঁড়ি করা ছাড়া তাদের কোনও অবদান নেই। কেউ তাদের মনে রাখবে না। তাদের কোনকিছুই থাকবে না।

আমার সৃষ্টির দু একটা নমুনা থেকে যাবে। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে সেই দু একট নমুনাও থাকবে।

কিছু সৃষ্টি করে দেখান লালিমা পালদের দল। সত্যিকারের লাল হতে পারবেন না, সেই ক্ষমতা আপনাদের নেই। আপনারা কোটেশ্বর রাও বা আজাদ হতে পারবেন না। আপনারা এখানে ওখানে নিজেদের গু-এ আলতা দিয়ে লাল রঙ করে বড়জোর ছোঁড়াছুঁড়ি করবেন। তার আগে নিজেদের গায়ে মেখে নেবেন। বেচারিরা।

আমার যা বলার যা করার তা আমি করি। কারুর তোয়াক্কা করি না।’

অবশ্যই আপনি তোয়াক্কা করেন না। তোয়াক্কা করবারও দরকার নেই। আমি আমরা আমাদের বন্ধুরা আপনার মত সৃষ্টি করতে পারবে না-কিন্তু তাই বলে যারা স্বপ্ন নিয়ে খেলা করে তাদের সমালোচনাও করতে পারবে না? এমন ফ্যাসিস্ট মনোভাব কেন কবির সুমন?

আমরা আপনার মেধার সমালোচনা করিনি, করার কোন ইচ্ছেও নেই। আপনি যে সব মাধ্যমে সমান পারদর্শী তা বিপ্লব কিম্বা বাণিজ্যিক হোক। সেটি জাতীস্মর সিনেমায় ‘এ তুমি কেমন তুমি’ গানটি কতবার শুনেছি ঠিক মনে নেই। আগ্রহী পাঠক শুনতে পারেন এখান থেকে

আপনি কত গভীর মমতা নিয়ে সব কিছু দেখেন। এই ঢাকায় ২০ জনকে কুপিয়ে হত্যার পর ইশরাত আকন্দকে নিয়ে লিখেছেন। আমাদের এমন মমতায় দেখেন আপনি। এসব আমাদের ভাবায়।

ভূপেন হাজারিকার গান শুনে বড় হয়েছি। ভূপেন বিজিপিতে যোগ দিয়েছে তাই বলে তার গান কী ভুল হয়ে গেলো? মোটেও না। সেসব আজো শুনি। কিন্তু ব্যক্তি ভূপেন আমার কাছে মৃত; গায়ক ভূপেন এখন আমাকে ভাবায়।

বাংলাদেশে দু’জন কবির নাম করবো। একজন আল মাহমুদ অন্যজন ফরহাদ মজহার। বাংলা কবিতা এই দুজন মানুষ সত্যিই অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে আল মাহমুদ এ দেশের কথিত সেক্যুলারদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে জামাতপন্থি হয়েছেন। অন্যজন ফরহাদ মজহার গত দুই দশকে ইসলামি বিপ্লবের দিকে ঝুকেছেন। কিন্তু আল মাহমুদ ও ফরহাদ মজহারকে বাদ দিয়ে বাংলা কবিতা এগুতে পারবে না। আমরা আল মাহমুদ ও ফরহাদ মজহারের কবিতা পড়বো কিন্তু ব্যক্তি কবিকে নিয়ে আমার আমার বন্ধুদের কোন আগ্রহ নেই।

গুড বাই গিটারের গেরিলা
আমরা যারা বাংলাদেশে সিপিএম ও একইসাথে তৃণমূলের সাপোর্টার নই কিন্তু সুমনের গান শুনে তার ভক্ত তাদের কাছে সুমনের এ বক্তব্যটিকে রেটরিক হিসেবে গন্য করে পাশ কাটাতে পারলে শ্বাস নিতে পারতাম। কিন্তু আফসোস শ্বাস নিতে পারছিনা। দম আটকে যাচ্ছে সুমনের এ বক্তব্য। পুরো বক্তব্য শুনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।.

একদা আপনি বলেছিলেন, আপনি ও মহেশ্বেতা না থাকলে মমতা মমতা হোত না। আজ আপনি বলছেন, মমতার নামে মন্দির হবে? তাহলে ইতিহাসে আপনার ও মহেশ্বেতার নামে কী হবে বলতে পারেন সুমন বাবু?

আরো বৃহৎ পরিসরে সুমনকে নিয়ে বাংলার ভক্তকুলদের ভাবতে হবে। শুধু মনে পড়ছে লালগড় জঙ্গলমহলে নিহত হওয়া কমরেডদের স্মিত হাসি ও রক্ত কাদামাখা লাশ। আর কিশানজি বা ছত্রধর বা মাস কাবারে চাল পাওয়া জঙ্গল মহলের মানুষরা কি তখন সুমনের টুপির নিচে শান্তি ও বিপ্লব খুঁজছিলেন?


কবির সুমনের ফেসবুক প্রোফাইল দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

তবুও ভণ্ড অনেকের মত মন খারাপের সময়গুলোতে সুমনের গান আমাকে শান্তনা দিবে। আমরা আপনার গান শুনবো, হয়তো আগের চেয়ে বেশি শুনবো কিন্তু ব্যক্তি কবির সুমনকে নিয়ে আমাদের আগ্রহ থাকবে না হয়তো আর আগের মত। খুটিয়ে খুটিয়ে তার সাক্ষাতকার পড়া, গানের ফাকে তার কথা শোনা, মন্ত্রমুগ্ধের মত সেসব থাকবে না। অন্য দশটি শিল্পির গান যেভাবে শুনি আপনার গানও শুনবো। ভাল থাকবেন সুমন, ভাল থাকবেন গিটারের গেরিলা।

৬ thoughts on “গিটারের গেরিলা কবির সুমন : ‘ছেলেবেলার সেই লোকটা চলে গেছে গান শুনিয়ে’

  1. সকাল থেকে কবির সুমনের একটা
    সকাল থেকে কবির সুমনের একটা ভিডিও বক্তব্য দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেছে। প্রিয় মানুষগুলোর অধঃপতন সহ্য করা একটু কষ্টকর। ইচ্ছে হচ্ছিল প্রচন্ড একটা চিৎকার করে বলি পৃথিবীর পুরোটা এখনো নষ্টদের অধিকারে চলে যায়নি, যেতে পারে না। সারাদিন মনে আপনার এই পোস্টটা পড়ার পর মনে হচ্ছে মনের ক্ষোভ কিছু উগরাতে পেরেছি। গানওয়ালার গানগুলো বেঁচে থাকবে আজীবন, রাতে না ঘুমানোর কষ্টটা হয়ত এখনো লাঘব করার চেষ্টা করব গানওয়ালার গান শুনে। কিন্তু গানওয়ালা মানুষটাকে চির বিদায় জানালাম। যে মানুষটার গান প্রচন্ড হতাশার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার প্রেরণা যোগাতো সে মরে গেছে, তার গানগুলো বেঁচে থাকবে আজীবন। বিদায় হে গানওয়ালা……

    1. হুম। সেটাই। সুমনের একটা গান
      হুম। সেটাই। সুমনের একটা গান আছে, অবিকল নিজের কথা ভেবে লিখেছিলো কিনা জানি না। ‘পাল্টায় মত পাল্টায় বিশ্বাস শ্লোগান পাল্টে হয়ে যায় ফিসফাস’।

  2. কবির সুমন একজন ধান্দাবাজ
    কবির সুমন একজন ধান্দাবাজ মানুষ……টাকার টান পরেছে বলে মমতার স্তূতি গাইছে…আর মদনচোরের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে

  3. বুড়া বয়সে ভীমরতি ধরেছে। পচে
    বুড়া বয়সে ভীমরতি ধরেছে। পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর আগের মত গান বেরোয় না, এটাই তার শাস্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *