বাঁচার অধিকার কেড়ে নিয়ে বিদ্যুতের সুখ চাইনা । বিদ্যুতও চাই, বেঁচে থাকতেও চাই ।

বিগত ২৯ জুন-এ জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বক্তৃতা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “কেউ কেউ বলছে রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কারণে নাকি সুন্দরবনের পরিবেশের ক্ষতি হবে। তারা কী কারণে এ কথা বলছে সেটা বুঝতে পারছি না।”
তিনি বলেন, “কয়লা দিয়েতো পানি ফিল্টার করা হয়। পানি ফিল্টার করার সময়তো পরিবেশ নষ্ট হয় না। রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে পরিবেশ নষ্ট হবে কেন?”
যারা বলছেন যে, রামপালে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারণে সুন্দরবনের পরিবেশের ক্ষতি হবে তাদের উদ্দেশ্য কি তাও জানতে চান প্রধানমন্ত্রী।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী-
আপনি ভালো রান্না করতে জানেন বলেই গনমাধ্যমের সুবাদে আমরা জানি। আপনি তো অবশ্যই জানেন দুধও অধিক সময় চুলায় রাখলে পুড়ে কয়লা ও কার্বন এ রুপান্তরিত হয়। কয়লাতে যেমন কার্বন আছে। হীরা ও গ্রাফাইট কার্বনের আরো ২টি ভিন্ন রুপ। কার্বন থাকলেও হীরা আর কয়লা এক বস্তু নয়। দুই বস্তুর পরিবেশে প্রভাব এক নয়। কিন্তু দুই বস্তুর মুলেই কার্বন। অর্থাৎ আপনি কোন কার্বন কি কাজে, কিভাবে কাজে ব্যবহার করছেন তার ওপর ভিত্তি করে পরিবেশের ওপর প্রভাব বদলে যায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পানির ফিল্টারের ব্যবহৃত কয়লা , শিল্প কারখানার কয়লা, বিদ্যুত উৎপাদনের জ্বালানী কয়লার প্রভাব একই নয়। এক নয় বলেই সরকারের পরিবেশ অধিদপ্তর ইট ভাঁটা, শিল্প কারখানায় বর্জ্য নিয়ন্ত্রনের আইন প্রয়োগ করে ( যদিও যথাযথ ভাবে করেনা)। কারখানার কয়লার ব্যবহার রান্নাঘর বা পানির ফিল্টারের কয়লার ব্যবহারের সাথে তুলনা হয়না মাননীয়।

সংবিধানের ২য় ভাগের ১৩ (ক)অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিকানা আপনার ও সরকারের যতটা , বাংলাদেশের নাগরিক সবারও ততটাই। আপনার বাড়তি ক্ষমতা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি আপনার কর্তব্য ও দায়িত্ব। সংবিধানের ২য় ভাগের ১৪ অনুচ্ছেদে কৃষক স্রমিকের শোষণ মুক্তির কথা, ১৬ অনুচ্ছেদে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লবের আওতায় বিদ্যুতায়নের কথা, ১৮ অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষন ও উন্নয়নের কথা লেখা আছে। আমাদের সবার ভুমি, সবার সম্পদ কারো বিশেষ উদ্দ্যেশ্যের বলি হতে পারেনা। কয়লা ভিত্তিক জ্বালানীর যেকোনো যান্ত্রিক উৎপাদনে পরিবেশ দূষণ হয় বলেই এসব প্রকল্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ প্রতিরোধী ইউনিট স্থাপনের নিয়ম আপনারাই করছেন।

রামপালে দূষণ হবেনা একথা না বলে আমাদের বলুন দূষণ প্রতিরোধে প্রকল্প নির্মাতারা কি ব্যবস্থা নিয়েছেন ? কোনো বিশেষজ্ঞ প্যানেল কি সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব নিশ্চয়তা দিয়েছে? বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিকল্প জায়গা সুন্দরবনের আশেপাশের জেলা সমুহের বাইরে নেওয়া কি যায়না? কয়লার বদলে নবায়ন যোগ্য জ্বালানী, ভূগর্ভস্থ লাভা ও সৌরতাপ ব্যবহার করার জন্য আপনার বিশেষজ্ঞদের নীতিগত নির্দেশ দিলে বিকল্প প্রকল্প তৈরির ক্ষমতা কি তাদের নেই? এসব জানার ও আপনার জবাবদিহিতা বুঝে নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার আমাদের সকলের আছে।

আমাদের অজ্ঞতার সুযোগে মুনাফার লোভে ক্ষমতার অপপ্রয়োগের অধিকার কোন বিশেষ ব্যক্তি গোষ্ঠীর একক মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার কথা সংবিধানে নেই। আমাদের নিযুক্ত ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনকারীরা শুধু মুখে মুখে আশ্বাস দিলেই হবেনা। হাত দেখা গনকের মত বললে হবেনা যে, আপনি আশি বছর বাঁচবেন, না বাঁচলে আমাকে গলা টিপে মেরে যাবেন, টাকা ফেরত নিয়ে যাবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা ভারত রাশিয়ার মত বিশাল দেশ নই। আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাভাবিক ও সামাজিক মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্বল মাত্র দু’বিঘা জমি এই বাংলাদেশ। আমরা চেরনোবিল আর ভুপালের পরিনতি থেকে বাঁচতে চাই। আর আপনি ইতিহাসে কিরুপে থাকতে চান তা আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন।

প্রিয় দেশবাসী-

রানা প্লাজা অনিয়মের সাথে নির্মিত হয়েছিল । ডিজাইন ও বিল্ডিং কোড অনুসৃত হয়নি । রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক তদারকির গাফিলতি ছিল । ক্ষমতাবান ভবন মালিকের দাপটে অসহায় সাইট ইঞ্জিনিয়ার কাজ ছেড়ে দিয়েছিল। নির্মাণ কর্মীরা পেটের দায়ে কাজ করে গেছে । ৪ তালার ডিজাইনে ৭ তলা হয়েছিলো । শপিং মলের বদলে গার্মেন্টস হয়েছিলো যাতে প্রতিটা ফ্লোরে মেশিন ও মানুষ মিলে অচল ভর ও সচল ভর অনেক বেশী বহন করতে হয়েছিলো । এর ওপর ছাদে বিশাল জেনারেটর স্থাপিত হয়েছিল যা চালু হলে তীব্র শব্দ সহ রানা প্লাজা কম্পিত হত। এর পরও দুই বছর টিকে থাকা ভবন প্রথমে ফাটল ধরে সতর্ক করে মানুষকে বাঁচানোর জন্য । প্রকৌশলীরা যায়, মিডিয়া যায় ফাটল ধরা রানা প্লাজায় , উদ্বেগ জানায়, উদ্যোগের আহ্বান করে । রানা উদ্যোগ নেয় । মিলাদ পড়িয়ে একুশের ক্যামেরার সামনে বলে-“ আস্তরে ফাটা , দেওয়ালে কলামে কুনো ছমছ্যা নাইক্যা, মিলাদ পরাইছি , ছব ঠিক আছে।” রাত পেরোতেই জবরদস্তি করে ঢোকানো হাজার স্রমিকদের সাথে নিয়ে জীবন্ত কবরস্থান হয়ে ওঠে রানা প্লাজা।

এই পরিনতির জন্য রাষ্ট্র , সরকার , শাসকগোষ্ঠীর বিবাদমান রাজনৈতিক ক্লাব সমূহ , সামাজিক ভাবে অজ্ঞ, ভীরু , ক্লীব আমরা সম্মিলিত ভাবে সকলে দায়ী । সকলের সম্মিলিত অপরাধের ফসল জীবন্ত লাশের কবর রানা প্লাজা । আমরাই পরে বলেছি রানাকে চোদ্দবার ফাঁসি দিলেও এই ক্ষতি পূরণ হবার নয় ।

এতগুলো কথা বলছি আজ সুন্দরবনের জন্য। অনেক বিকল্প স্থান ও জ্বালানী আছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের । কম বা বেশী খরচের মাধ্যমে অন্য উপায় আছে। ইন্ডিয়া নিজেই কয়লা বাদ দিয়েছে নিজের দেশে তারা সৌর শক্তির প্রয়োগ করছে। আমাদের পুরনো কেন্দ্র গুলো পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকায় সংস্কার করেও দুই বছরের মাঝে রামপালের সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আপনারা প্রশ্ন তুলুন বিশ্বব্যাংক বা পরাশক্তি কাদের ভয়ে এসব করছে না সরকার? অসম চুক্তি করে দেশের আর্থিক ক্ষতি করে কার মুনাফার জন্য অন্য জায়গা বাদ দিয়ে রামপালেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতেই হবে? রামপালের স্থানীয় মানুষেরা কি বাঁশখালী, আড়িয়াল বিলের মত প্রতিরোধ করবেনা? আমাদের সম্মিলিত অজ্ঞতায়, ক্লীবতায় বাংলাদেশের প্রান প্রকৃতি পরিবেশ জিন্দা লাশ হতে দেখছি আমরা ।

আর মুনাফার লোভে যারা আজ রানা প্লাজার মালিকের ভুমিকায় সুন্দরবনে মিলাদ পড়াচ্ছেন, ছব ঠিক আছে কুনো ছমছ্যা নাইক্যা বলছেন , ৫০ থেকে ১০০ বছরের মাঝে ক্রমান্বয়ে যখন সুন্দরবনের মাটি পানি বায়ু মাছ গাছ প্রাণী সহ সব তিলে তিলে বিলুপ্ত হতে থাকবে, আমাদের নিঃশ্বাস নিতে হবে দূষিত বাতাসে, সেদিন রানার মত মাফ চেয়েও আমাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবেন না আপনারা । ইতিমধ্যে ঢাকার বাতাস বিষাক্ত সীসাতে দূষিত হয়েছে আপনাদের অপরিণামদর্শিতায়। এমন অপরাধ করতে লেগেছেন মুনাফা লোভীরা , আমরা যদি সেই অনাগত দিনে আপনাদের চূড়ান্ত শাস্তি দিতে সক্ষম ও হই , তবু ও আমরা আর জিন্দা হতে পারবনা । এতদিন ধরে আপনারা আমাদের আশ্বাস দিয়ে চলেছেন সব সুখ সব কল্যান আমাদের দেবার ক্ষমতা একমাত্র আপনাদেরই আছে। এখন দেখছি আপনাদের দুর্দান্ত ক্ষমতা আছে আমাদের যাবতীয় অনিষ্ট করার।

বাঁচার অধিকার মৌলিক আধিকার। বিদ্যুতের সুবিধা মৌলিক অধিকারের উপাদান মাত্র, বিদ্যুৎ মৌলিক আধিকার নয় । আমৃত্যু সামাজিক ও স্বাভাবিক ভাবে বাঁচার অধিকার কেড়ে নিয়ে বিদ্যুতের সুখ চাইনা । বিদ্যুতও চাই, বেঁচে থাকতেও চাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *