গুজব, যুক্তি ও বাঙালি মনস্তত্ব – ২

উপসংহারঃ আমার আগের লেখাটিতে আমি দু’টি বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছিলাম। এক, একটা জাতি যে সব ঘটনায় সবচেয়ে বেশী প্রতিক্রিয়া দেখায় সে সব থেকেই সেই জাতির মনস্তত্ব বোঝা যায়। দুই, দু’টি ঘটনায় এদেশের মানুষের ভিতর চলমান কিছু প্রতিক্রিয়া। দু’টি ঘটনাতেই আমরা দেখেছি যে আমাদের দেশের মানুষগুলো “আরেকজনের বীরত্ব” খুব পছন্দ করে এবং কেউ যদি কোন ভাবে বীর প্রমাণিত হয় তবে মানুষ তাকে মাথায় নিতে এক মুহূর্ত দেরী করে না। করবেই বা কেন ? একজন সাহসী বীরকে কে না পছন্দ করবে ! কিন্তু শুধুই কি বীরত্বই সাহায্য করেছিলো এস পি বাবুল অথবা ফারাজকে নিমেষেই জাতীয় নায়কে পরিণত হতে ? না। অবশ্যই না। আসলে যে জিনিসটা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা হল ওদের ভিতরকার ভালোবাসা। যে ভালোবাসা এস পি বাবুল প্রকাশ করেছেন দেশের জন্যে জীবন বাজি রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। যে ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে ফারাজের বিসর্জনে। এই ভালোবাসাই আসলে এদেশের মানুষের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। জাতি হিসেবে আমরা ভালোবাসার কাঙাল। আর কারো মধ্যে এই ভালোবাসার দেখা পেলেই আমরা তাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় শ্রদ্ধা করতে শুরু করি কোন প্রশ্ন ব্যতিরেকে। আসলে বীরত্ব না, বরং আমরা আরেকজন মানুষের মাঝে ভালোবাসা খুঁজি।

এখন আসি জাতি হিসেবে এতটা ভালোবাসার কাঙাল হওয়ার পিছনের কারন সম্পর্কে। আচ্ছা বলুন তো, আরেকজনের ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা কোন মানুষটা সবচেয়ে বেশী করে ? একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন, ভালোবাসা তারই প্রয়োজন যে আসলে খুব একটা ভালোবাসা পায় না অথবা যার জীবনে কোনভাবে ঐ জিনিসটার অভাব আছে। এখানেও ব্যাপারটা একই। আমরা সবাই জানি যে আমাদের দেশটা সৃষ্টির প্রথম থেকেই খুবই দরিদ্র একটি দেশ। জীবন ধারণ করার জন্যে,একটু ভালো থাকার জন্যে এদেশের প্রতিটা মানুষকে এতটাই সংগ্রাম করতে হয় যে জীবনের অধিকাংশ সময় কেটে যায় নিজেকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই। এদেশের মানুষ ছোটকাল থেকেই নানাভাবে বুঝতে শেখে যে এই দেশটা আসলে খুব একটা সুবিধার জায়গা না। এখানে নিজেকে নিয়ে ভাবতে হয় এবং সবাই তাই ভাবে। এখানে এক টুকরো জমি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে খুনো-খুনি হয়, নিজে ভালো থাকার জন্যে আরেকজনের সম্পত্তি হাসতে হাসতে অন্যায়ভাবে আত্মস্থ করা হয়,সরকার থেকে সাধারণ মানুষ সবাই দুর্নীতিগ্রস্থ, মানুষ ঠকিয়ে দু’পয়সা অর্জন করাটাকে বুদ্ধির পরিচয় হিসেবে দেখা হয়। এ দেশ এতটাই সুযোগ ও সম্পদহীন যে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলো এদেশ ও এদেশের মানুষদের ধর্তব্যের মধ্যেই ফেলে না। যে দেশের অবস্থা এমন সে দেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই যে ভালোবাসাহীনতায় ভুগবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এ ভালোবাসাহীনতাই ফুটে ওঠে সবসময় তাদের আচরণে।

তবে ভালোবাসাহীনতায় ভুগলে কী হবে ? যুগ যুগ ধরে শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই ভাবতে ভাবতে এ জাতি আজ নিজেই ভালোবাসতে ভুলে গেছে। এরা শুধু যে ভালোবাসতেই ভুলে গেছে তাই নয় স্বার্থপরতা এ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এতটাই প্রবেশ করেছে যে যদি আরেকজনের ভিতরে কোন ভাবে ভালোবাসা প্রকাশ পায়ও তবে তারা সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখে, স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। এস পি বাবুল ও ফারাজকে নিয়ে ছড়ানো দ্বিতীয় গুজবদু’টি তারই প্রমাণ।

২ thoughts on “গুজব, যুক্তি ও বাঙালি মনস্তত্ব – ২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *