অধরচন্দ্র অতঃপর লাশের মিছিল

অধরচন্দ্র…
লাশের মিছিল গিয়ে যেখানে জড়ো হয়, স্কুল মাঠ।
শত শত মানুষের আহাজারি, কখন আসবে সেই মিছিলে তার প্রিয় মানুষটি। কখন দেখবে প্রিয় মুখখানি।
সেকেন্ড মিনিট ধরে পার হয়ে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা…
এই বুজি আসলো, আসছে, অপেক্ষা…
সূর্য ওঠে, আবার অস্ত যায়। এখনো আসেনি সেই প্রিয় মানুষটি যার প্রিয় মুখখানি দেখার জন্য অধরচরন্দ্র অধির আগ্রহে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আসবে, আসছে…
মিছিলে মিছিলে আসছে অনেকে, আসছে না একান্ত আপন মানুষটি। যার প্রতিক্ষায় অধরচন্দ্রে…
কখন পেটে পানি পড়েছে মনে নেই, মনে নেই খাবারের কথাও। অপেক্ষা আর প্রতিক্ষা…
লাশের মিছিলের গাড়ী দেখলে আশার আলো জ্বলে ওঠে। পরিশ্রান্ত শরীরে শক্তি উকি দেয়। দৌঁড়ে গিয়ে দেখি, খোজি এক এক করে। চেনার উপায় নেই, নেই বুঝার উপায়। আপন মানুষটিকে যেন আপন করে চিনতে কষ্ট হচ্ছে।

সুন্দর মুখখানি যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে…
গায়ের রং অন্য রং এ মলিন হয়ে গেছে…
মায়াবি মুখখানি যেন ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে…
পরিচিত মুখখানি অপরিচিত হয়ে গেছে…

২৭ এপ্রিল শনিবার সাভার অধরচন্দ্র স্কুল মাঠে এমনই মনে হয়েছে আমার কাছে। চার পাশে মানুষের আত্মচিৎকার আমাকে ব্যকুল করে তুলেছে, করে তুলেছে আমার ভিতরে আবেগঘন পরিবেশ। চোখ গড়িয়ে অশ্রুজ্বল যেন অজানতেই নেমে গেলো।
আমি রিতিমত অবাক। এখানে আমার আপনজন কেউ নেই, নেই তেমন কোনো পরিচিত পরিজন। সবাই আমার কাছে নতুন মুখ, অজানা পথিক।

আমার ভিতরটা হু হু করছে…
রূদপিন্ড যেন নিরব নিথর হয়ে যাচ্ছে…
পা দুটো আরও শক্ত হয়ে আসছে…

সাড়ি সাড়ি লাশ, অগনিত মানুষ। অপেক্ষা শুধু নিজের আপন লোকের খোজে। আর সে আপন লোকটি হোক প্রাণহীন তাও ভালো।
শেষবারের মত তাকে আপন করে দেখা যাবে, স্পর্শ করা যাবে সে হাতে যে হাত দিয়ে আপন আলোয় ভূলিয়ে দিতেন অজান সকল কষ্ট, দুঃখ।
আর এ অপেক্ষা হয়’ত কারো একজনের আবার কারো বহু জনের জন্য। এমনও অপেক্ষায় আছেন, পৃথিবীতে যার আপন জন বলতে একমাত্র তিনিই, সে তার মা…
কারো জীবন সঙ্গীনি, ভালোবাসার বন্ধনের স্ত্রী…
কারো আবার নিজ বাবার অরৌশজাত বোন…
কেউ আবার অপেক্ষায় আছেন নিজ রক্তের ছেলের…

নিরব নিথর হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছে এই বুঝি ফিরে এলো তার একান্ত ভালোবাসার মানুষটি, যাকে সে কথা দিয়েছিলো সামনের মাসে বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে নতুন জীবনে পা রাখার। কাউকে বলতে পারছে না, কারণ আমাদের সভ্য সমাজে গরীবদের ভালোবাসা হচ্ছে অসভ্য। যত সব আশা-ভালোবাসা বড় লোকের জন্য। আমরা কখনই মানুষ হয়ে মানুষের মর্যদা পায়নি হয়’ত ভবিষ্যতেও পাবো না। কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ভালো পোশাক পড়লে বলে এটা চুরির টাকায় কেনা আর বড় লোকেরা চুরির টাকায় কিনলে বলে এটা তার পরিশ্রমের ফসল।
আমি যেন এমনই শুনেছি এক ক্ষুব্ধ প্রেমিকের মুখ থেকে। চোখ মুখ তার লাল হয়ে আছে। ভরাক্রান্ত মন, অপেক্ষার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে লাশের মিছিলের দিকে।

ই বুঝি এলো তার ভালোবাসার মানুষটির লাশ…
এই বুঝি এলো তার আপন মানুষটির লাশ…
এই বুঝি এলো তার পরিচিত মানুষটির লাশ…
এই বুঝি এলো তার সন্তানের লাশ…
এই বুঝি এলো তার মা’র লাশ…
এই বুঝি এলো তার বোনের লাশ…
এই বুঝি এলো আমার লাশ…

১ thought on “অধরচন্দ্র অতঃপর লাশের মিছিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *