এ এক ত্রাসের দেশ : বাংলাদেশ

ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে বাংলাদেশে। ধর্মান্ধ জঙ্গিরা রীতিমতো বলে কয়ে খুন করছে আমাদের। ঠিক একাত্তরে যেমন করেছিলো। তফাত হল একাত্তরে এদের পৃষ্টপোষক ছিলো পাকিস্থানী হানাদার বাহিনি। আর এখন পৃষ্ঠপোষক হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গঠিত সরকার। একাত্তরে লিস্ট করেছিলো নিজামী, মুজাহিদ, কামরুজ্জামানরা। আর এখন লিস্ট করছে বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ। একাত্তরে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিলা পাকিস্থানি মিলিটারি। আর এখন,‘এই আমরা চোখ বন্ধ করলাম,তোমরা যা খুশি করার করে নাও’বলে সহায়তা করছে আওয়ামী সরকার ও তার প্রশাসন। তার উপর, খুনিদের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে এই সরকার আমরা আবাল জবগনকে বকেও দিচ্ছে, স্বাধীন দেশে কেন নিজের ভাবনাগুলো লেখো?

তবে হ্যা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঈদগাঁহ ময়দানের কাছে নারকীয় জঙ্গি হামলার পর সরকার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। শাসকদলের পক্ষ থেকে রাজধানীতে জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটাতে এই সমাবেশ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। পর পর দুটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হামলার পরও দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যে ভূমিকা পালন করা দরকার ছিল দুঃখজনক হলেও সত্যি, তার ছিটে-ফোঁটাও দেখা যায়নি। এমন পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে মানুষকে সংঘবদ্ধ করা, সচেতন করা, রাজপথে এসে এই অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদ জানানো, মানুষের মনের ভয় কাটানো, জঙ্গিদের কাছে আর বাড়াবাড়ি না-করার মেসেজ পৌঁছে দেওয়ার কাজটি আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো করতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। জঙ্গিবাদের ঔদ্ধত্যের বিপরীতে এই চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সাহসী মানুষের ঐক্য এবং সোচ্চার ভূমিকা আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর মানুষকে সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্বটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের ওপরই বর্তায়।

পুলিশ প্রধান জানিয়েছেন, জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠন করা হচ্ছে। ওদিকে জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা আসামীদের জামিনের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বিচারপতিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

আর এখানেই মনে পড়ছে ৫৭ ধারার কথা,ব্লগার হত্যাকান্ড চলাকালে এন্টি টেররিজম সেল গঠন করা হয়নি, কিন্তু, ব্লগের উপর নজরদারির জন্য বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। যেন কেউ লেখা-লিখি করে সরকারকে বিব্রত করতে না পারে। প্রিয় ওলামালীগের অনুভুতিতে খোচা দিতে না পারে-তাই আইসিটি ৫৭ ধারার মত বর্বর, হীন একটা আইনকে শক্তিশালী করে মানুষের কন্ঠোরোধের আয়োজন সুসম্পন্ন করা হয়েছে। চাপাতির কোপে ধড় না পড়লেও, ৫৭ ধারায় ঠিকই ধরা খেতে হবে।

সে সময় সরকারের নীরবতাধন্য আনসারুল্লাহ-শফি হুজুররা আমাদের মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করেছে। আর আমরা মাথাচাড়া দিয়ে ঊঠা মৌলবাদ এর অন্ধকারের বিরূদ্ধে সোচ্চার হবার সংগ্রামে হাতে কীবোড নিয়েছি, ২০১৩ এপ্রিলে গণজাগরণ মগণজাগরণ মঞ্চকে ভেঙ্গে দেওয়া হল, হেফাজত আন্দোলনের সাথে ব্যালেন্স করার জন্য। শাপলা চত্বরের ঘটনায় মন খারাপ হলেও, হেফাজতিরা পরে খুশি হয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চকে ভেঙ্গে দেওয়ার ফলে, তবে তারা কৌশল বদলিয়ে চলছে। সরকার থেকে নানান ধর্ম ভিত্তিক দলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলার চেষ্টা করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রগতিশীল দলগুলোকে ওভার লুক করা হয়। বলা হয় নানাভাবে, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন একাধিকবার, ‘ধর্মের নামে কটুক্তি করা যাবে না’- সেটা ভাল কথা; তবে, অনেকে যুক্তিসঙ্গত আলোচনাকে যে বুঝতে চান না, বরং মনে করেন এটা ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা হলো। অনেক দেশে নাস্তিকতাবাদের ওপর অনেকে উচ্চ ডিগ্রী অর্জন করেন, ডক্টরেট, পোষ্ট ডক্টোরাল ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁরা ধর্মের ওপর নানা ভাবে গবেষণা করে দেখেন বিশ^কে, রাজনীতিকে, ধর্মকে। ইউরোপের অনেক দেশের নামকরা বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সাব্জেক্ট এর মত ‘নাস্তিকতাবাদ’ নামক একটি সাব্জেকেট পড়ানো হয় নানান উপায়ে, ‘ধর্ম’ও পড়ানো হয়। তাহলে, সেই নাস্তিকতাবাদ পড়ানো কি বন্ধ করবে ঐ বিশ^বিদ্যালয়গুলো? জঙ্গিদের চাপে নাস্তিকতাবাদ পড়ানো বন্ধ করলে, সেই বিশ^বিদ্যালয় নিশ্চয় ‘ধর্ম পড়ানো বন্ধ করবে। ধর্মও ওখানে একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। তাই, আপনি চাপ প্রয়োগ করে এসব বদলাতে পারবেন না, উচিৎও হবে না। উন্নত বিশে^ জ্ঞান বিজ্ঞান যে কোন শাখার জন্য খোলা, তা পৃথিবীর পাতাল থেকে মহাজগৎ পর্যন্ত, ইতিহাসের আদি থেকে অনন্ত পর্যন্ত কোনটিই বন্ধ নেই। তাই গবেষণা ও শিক্ষার জন্য কি করা উচিৎ, সেটি সেই বিশ^বিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব বিষয়। তাই যাঁরা খোলামেলা ভাবনার মানুষ, সেই ভাবনার মানুষকে নাস্তিক বলাও ঠিক না। আবার ঐ নৃশংসভাবে বিরোধিতা করাও ঠিক না। আমরা যদি পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, তাহলে কি দেখবো, যেখানে ধর্মকে কেন্দ্র করে ভারত বর্ষের বিভক্তি হয়েছিল ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের থিম নিয়ে; ২৪ বছরের পাকিস্তানি শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশর জন্ম হয় ১৯৭১ সালে। সেদিন মানুষ বুঝেছিল পাকিস্তান ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানে বাংলাদেশকে ধরে রাখতে পারেনি। সেই দেশকে স্বাধীন করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়েই স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনেন, মুক্ত চিন্তার দল, মত ও মানুষকে সঙ্গে নিয়েই। সংবিধান রচনা হয়েছিল মুক্তচিন্তা, মানব কল্যাণ, সমতার চিন্তায়। তখন তিনি ইসলামিক চিন্তা মাথায় পোষণ করে আরেকটি পাকিস্তান করার কোনই স্বপ্ন দেখেননি। অথচ, শেখ হাসিনাকে অনেক ভেবে দেখতে হবে, প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলো কখনই সহায়ক শক্তি হবে না। এখন বিএনপিসহ তারা সকলেই চেষ্টা করছে সরকারকে কত দ্রুত গদি থেকে নামানো যায়, সে জন্য তারা ভীষণ ব্যস্ত। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যে কোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক হিং¯্র, গত ২০১৩-২০১৪ তে তারা যে তান্ডব লীলা চালায়, তা মানুষ ভোলেনি। মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ বাংলাদেশে বেড়াতে এসে সন্ত্রাসী বা জঙ্গিদের হাতে টিএসসি এলাকায় রাজু চত্বরে নিহত হয়েছেন, তাঁর স্ত্রীর সামনেই চাপাতির আঘাতে। গণজাগরণ মে র রাজীবকে হত্যা করা হয় তাঁর বাসার সামনেই, হালকা অন্ধকার আবেশে; হুমায়ূন আজাদ স্যারকে ফুলার রোডে জামায়াত শিবির ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মারে, শাহাদৎ হোসেন মুক্ত চিন্তার ছাত্র রাজনীতি করত- তাঁর শিবির রুমমেট ধারালো ছুরি দিয়ে রুমে মেরে ফেলে। কুড়িগ্রামে নবম শ্রেণির নিরাপরাধি ছাত্র রেজাউল করিম নতুনকে মিছিলকারি জামায়েত-শিবিরের লোকেরা নৃশংসভাবে মেরে ফেলে। এসকল হত্যাকান্ডের সঠিকভাবে কারোরই বিচার হয়নি! এমনিভাবে অনেক শিক্ষক, ছাত্র, প্রগতিশীল নানা সংগঠনের লোকদেরর কৌশলে আজো মেরে ফেলা হয়। কিন্তু, সরকার রাজনীতি ও রাজনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে তাদের সঠিক সময়ে সঠিকভাবে বিচার বিলম্বিত করেছে, কখনও কখনও সম্পন্নও করতে পারেননি। এটি শুধু একটি সরকারের বেলা নয়, সকল সরকারের বেলায় দেখা যায়। কিন্তু যখন এ ধরনের হত্যাকান্ড হয় নিয়মিত হতেই থাকে, তখন যে বদনাম হয়, তা দেশের ভিতরেই থাকে না বরং গোটা বিশে^ ছড়িয়ে যায় বৈকি। তাই, জাতীয় স্বার্থ সবার আগেই ভাবা উচিৎ, আর এ দায়িত্ব দেশের প্রত্যেক নাগরিকের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *